Story Blog
← Back to Stories

নীল দিগন্তের ছোঁয়া

Romantic
নীল দিগন্তের ছোঁয়া

আকাশের মুখ আজ দুপুর থেকেই ভার ছিল। ঘন কালো মেঘেরা দলা পাকিয়ে দিগন্তের এক কোণে ভিড় করছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে আহিয়ানের সিলভার কালার পাজেরো গাড়িটি দ্রুতগতিতে ছুটছিল। আহিয়ান চৌধুরী, দেশের একজন নামকরা স্থপতি, গত তিন রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। একটা বিশাল প্রজেক্টের সাইট ভিজিট শেষ করে সে যখন ঢাকার দিকে রওনা হলো, তখন ঘড়িতে বিকেল চারটে।

হঠাৎ বিকট শব্দে একটা বাজ পড়ল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। সামনের রাস্তা প্রায় অদৃশ্য হয়ে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে গাড়ির ইঞ্জিনটা দুবার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে থেমে গেল। আহিয়ান বিরক্তি নিয়ে স্টিয়ারিং হুইলে একটা থাপ্পড় মারল। জনশূন্য হাইওয়ের এই নির্জন জায়গায় গাড়ি নষ্ট হওয়া মানে এক বিশাল বিপত্তি।

সে গাড়ি থেকে নেমে বনবন করে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বোনট খুলল। না, আজ আর গাড়ি স্টার্ট নেবে না। মোবাইলের নেটওয়ার্কও কাজ করছে না। ঠিক সেই সময় দূরে একটি টিমটিমে আলো তার নজরে এল। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে ওয়ালেট আর ফোনটা সামলে সে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে সেই আলোর দিকে হাঁটতে শুরু করল।

সামনে একটা পুরনো আমলের কাঠের গেট। গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল একটা বিশাল বাগানওয়ালা বাড়ি। বুনো লতা আর আগাছায় ঘেরা বাড়িটি যেন কোনো এক পুরনো স্মৃতির মতো দাঁড়িয়ে আছে। আহিয়ান কলিং বেল খুঁজে না পেয়ে দরজায় কড়া নাড়ল।

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে আহিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেল। হাতে একটা হ্যারিকেন। তার আলোয় যে মুখটি ভেসে উঠল, তাতে কোনো মেকি প্রসাধন নেই, আছে এক অদ্ভূত স্নিগ্ধতা। বড় বড় দুটি চোখ, কপালে লেপ্টে থাকা ভেজা চুল। মেয়েটির পরনে একটি সাদা সুতি শাড়ি।

"কে আপনি?" মেয়েটির কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের মাঝেও এক অপার্থিব সুরের মতো বাজল।

আহিয়ান গলা পরিষ্কার করে বলল, "আমার গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি কমলে আমি চলে যাব। যদি একটু বারান্দায় আশ্রয় দিতেন..."

মেয়েটি কিছুক্ষণ আহিয়ানের আগাপাশতলা দেখল। তারপর ধীর স্বরে বলল, "ভেতরে আসুন। বাইরে অনেক ঠান্ডা।"

আহিয়ান ভেতরে ঢুকল। বসার ঘরে পুরনো আমলের আসবাবপত্র। ধূপের একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে এল। মেয়েটি একটি শুকনো তোয়ালে আর এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। আহিয়ান তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল, "আপনার নাম?"

মেয়েটি জানালার ওপারে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, "নীলাঞ্জনা।"

নীলাঞ্জনা যখন রান্নাঘরে চা বানাতে গেল, আহিয়ান বসার ঘরের চারপাশটা ভালো করে দেখল। দেয়ালজুড়ে অনেক পুরনো বাঁধানো ছবি। এক কোণে একটা ছোট টেবিল, যাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু বই আর একটি নীল মলাটের ডায়েরি। আহিয়ানের অদম্য কৌতূহল হলো। সে ডায়েরিটা হাতে নিল।

প্রথম পাতায় ছোট করে লেখা— "কিছু মানুষ আসে শুধু বৃষ্টির সাথে মিশে যেতে, তারা রোদে শুকিয়ে যাওয়ার জন্য নয়।"

আহিয়ান চমকে উঠল। এই গভীর ভাবনার অধিকারিণী এই সাধারণ মেয়েটি? ঠিক সেই সময় নীলাঞ্জনা চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকল। আহিয়ান অপ্রস্তুত হয়ে ডায়েরিটা নামিয়ে রাখল।

"চা নিন," নীলাঞ্জনা বলল। "বাবা একটু পরেই আসবেন। তিনি পাশের গ্রামের মক্তবে পড়াতে গিয়েছেন।"

আহিয়ান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দেখল চায়ের স্বাদটা একদম অন্যরকম। আদা আর এলাচের কড়া গন্ধ। সে বলল, "আপনি কি সব সময় এখানেই থাকেন?"

নীলাঞ্জনা জানালার পাশে গিয়ে বসল। "হ্যাঁ। এই বাড়ি, এই গাছপালা আর এই বৃষ্টি—এটাই আমার জগত। শহরের ধুলোবালিতে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।"

আহিয়ান অবাক হলো। আজকের যুগেও এমন কেউ আছে যে শহরকে ভয় পায়? সে তার আইফোনটা বের করল, কিন্তু সেখানে এখনো কোনো সিগন্যাল নেই। সে দেখল নীলাঞ্জনা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

"শহরের যন্ত্রগুলো এখানে কাজ করে না আহিয়ান সাহেব। এখানে শুধু মন কাজ করে," নীলাঞ্জনা ধীর গলায় বলল।

আহিয়ান নিজের নাম বলেনি, কিন্তু নীলাঞ্জনা তাকে নাম ধরে ডাকল। সে থমকে গেল। নীলাঞ্জনা হাসল, "আপনার গাড়ির কাঁচের ভেতরে একটা ফাইল রাখা ছিল, তাতে বড় করে লেখা ছিল স্থপতি আহিয়ান চৌধুরী। আমি গাড়িটা গেটের সামনে দেখেছিলাম।"

আহিয়ান মুগ্ধ হয়ে গেল মেয়েটির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দেখে। বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ছে। চারপাশটা যেন এক মায়াবী কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। আহিয়ান বুঝতে পারল, আজ রাতে তার আর ফেরা হবে না। এই নিঝুম রাতে, এক অচেনা বাড়িতে, এক রহস্যময়ী মেয়ের সাথে তার গল্পের শুরু হতে যাচ্ছে।

মোস্তাফিজ সাহেব যখন ফিরলেন, তখন রাত প্রায় আটটা। ছাতাটা একপাশে রেখে তিনি আহিয়ানের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। নীলাঞ্জনা পরিচয় করিয়ে দিতেই তিনি সহৃদয় হাসলেন।

"শহরের মানুষেরা তো বিপদে না পড়লে গ্রামে আসে না। আজ যখন এসেছেন, তখন আমাদের এই গরিবের বাড়িতেই রাতের আহার সেরে নিন," মোস্তাফিজ সাহেবের আন্তরিকতা আহিয়ানকে মুগ্ধ করল।

রাতের খাবার ছিল খুব সাধারণ—গরম ভাত, ঘন ডাল আর উঠানের লাউশাক ভাজি। কিন্তু আহিয়ানের কাছে মনে হলো, ফাইভ স্টার হোটেলের খাবারের চেয়েও এর স্বাদ অনেক বেশি। খাওয়ার সময় নীলাঞ্জনা খুব একটা কথা বলছিল না, শুধু নিপুণভাবে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল। তার হাতের নীল কাঁচের চুড়িগুলো প্লেটের সাথে ধাক্কা লেগে টুংটাং শব্দ করছিল।

খাবার পর আহিয়ান বারান্দার ইজিচেয়ারে গিয়ে বসল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাটির সোঁদা গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে আছে। নীলাঞ্জনা এক বাটি পান নিয়ে এল।

"শহরে তো আপনারা এসব খান না, তাই না?" নীলাঞ্জনা মৃদু হেসে বলল। আহিয়ান পানটা নিয়ে বলল, "মাঝে মাঝে নিয়ম ভাঙতে ভালো লাগে।"

সেদিন রাতে তারা অনেকক্ষণ কথা বলল। নীলাঞ্জনা জানাল, সে আগে মফস্বলের কলেজে পড়ত, কিন্তু বাবার অসুস্থতার কারণে এখন বাড়িতেই থাকে। আহিয়ান তার স্থাপত্য জীবনের ক্লান্তির কথা বলল। কীভাবে ইট-পাথরের দেয়াল গড়তে গিয়ে সে নিজের মনের দেয়ালগুলো হারিয়ে ফেলেছে।

নীলাঞ্জনা হঠাৎ বলল, "আপনি যখন বাড়ি গড়েন, তখন কি সেখানে কোনো বাতায়ন রাখেন যেখান দিয়ে আকাশ দেখা যায়? নাকি শুধু এসি আর পর্দার আড়ালে জীবনটাকে আটকে রাখেন?" আহিয়ান এই প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিল না। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটি সাধারণ হলেও তার চিন্তার গভীরতা অনেক।

পরদিন সকালে আকাশ পরিষ্কার। সোনালি রোদ এসে পড়েছে বাগানের ঘাসে। আহিয়ানের গাড়ি ঠিক করার জন্য রফিক মিস্ত্রিকে নিয়ে আসা হয়েছে। যাওয়ার সময় হয়ে এল।

আহিয়ান ব্যাগটা নিয়ে গাড়ির দিকে এগোচ্ছিল। নীলাঞ্জনা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে আজ হালকা বেগুনি রঙের শাড়ি। "আবার কোনোদিন আসবেন?" নীলাঞ্জনা জিজ্ঞেস করল।

আহিয়ান পকেট থেকে নিজের ভিজিটিং কার্ডটা বের করে নীলাঞ্জনার হাতে দিল। "আমি জানি না আবার কবে আসব, কিন্তু এই চব্বিশ ঘণ্টা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হয়ে থাকবে। আর হ্যাঁ, আপনার সেই নীল ডায়েরির বাকি পাতাগুলো পড়তে আবার আসতে হবে।"

নীলাঞ্জনা হাসল। সে তার আঁচল থেকে একটা ছোট নীল রুমাল বের করে আহিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল। "এটা রাখুন। শহরের ধুলোবালিতে যখন খুব হাঁপিয়ে উঠবেন, তখন এই রুমালের ঘ্রাণে গ্রামের বৃষ্টির কথা মনে পড়বে।"

আহিয়ান রুমালটা নিল। সে অনুভব করল, তার ভেতরে কোনো একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে। সে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। আয়নায় দেখল নীলাঞ্জনা দাঁড়িয়ে আছে, যতক্ষণ না গাড়িটা বাঁকের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ঢাকায় ফেরার পর আহিয়ানের জীবন আবার সেই চেনা ছন্দে ফিরে এল। মিটিং, সাইট ভিজিট, ব্লু-প্রিন্ট চেক করা—সবই চলছে। কিন্তু তার মনে শান্তি নেই। অফিসের ক্যাবিনে বসে সে যখন জানালার কাঁচের ওপারে জ্যাম আর ধোঁয়া দেখে, তখন তার পকেটে রাখা সেই নীল রুমালটার কথা মনে পড়ে।

সে একদিন কাজ করতে করতে নীল ডায়েরির সেই প্রথম পাতাটা মনে করার চেষ্টা করল। সে বুঝতে পারল, সে নীলাঞ্জনার মায়ায় পড়ে গেছে। অথচ তাদের মধ্যে কোনো ফোন নম্বর বিনিময় হয়নি, নেই কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ।

আহিয়ান হঠাৎ ঠিক করল, সে নীলাঞ্জনার গ্রামে আবার যাবে। কিন্তু এবার আর কোনো প্রজেক্টের কাজে নয়, এবার সে যাবে শুধু একটি মানুষের জন্য। সে তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডেকে বলল, "আগামী তিন দিন আমার সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করো। আমি ব্যক্তিগত কাজে একটু বাইরে যাচ্ছি।"

আহিয়ান যখন গাড়ি নিয়ে আবার সেই পরিচিত বাঁকটিতে পৌঁছাল, তখন সূর্য ডুবুডুবু। গতবার এসেছিল অনিচ্ছায়, আর এবার আসছে বুকভরা অস্থিরতা নিয়ে। রাস্তার দুপাশে থাকা চেনা গাছগুলো যেন তাকে স্বাগত জানাচ্ছে।

গেটের সামনে গাড়ি থামিয়ে আহিয়ান একটু দ্বিধায় পড়ল। নীলাঞ্জনা কি তাকে দেখে খুশি হবে? নাকি ভাববে কোনো শহরের মানুষ তাকে বিরক্ত করতে এসেছে? সে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল মোস্তাফিজ সাহেব পুকুরঘাটে ওজু করছেন।

"আরে, আহিয়ান সাহেব যে! আবার কোনো বিপদ হলো নাকি?" মোস্তাফিজ সাহেব হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। "না আঙ্কেল, বিপদে পড়িনি। এবার এসেছি আপনার হাতের সেই চা আর আপনার মেয়ের সাথে একটু গল্প করতে।"

নীলাঞ্জনা তখন তুলসী তলায় প্রদীপ দিচ্ছিল। আহিয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে সে থমকে দাঁড়াল। হ্যারিকেনের কাঁপা আলোয় তার মুখটা আবার ভেসে উঠল। সে কোনো কথা বলল না, শুধু তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমলিন হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিটুকুই যেন আহিয়ানের সব ক্লান্তিকে ধুয়ে দিল।

সেদিন রাতে খাবারের পর তারা আবার সেই পুরনো বারান্দায় বসল। আকাশে মেঘ নেই, আছে রাশি রাশি তারা। বাগানের ঝোপে জোনাকিরা উৎসব করছে।

"আপনি সত্যি সত্যি ফিরে এলেন?" নীলাঞ্জনা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল। "আসতে হলো। ঢাকা গিয়ে আবিষ্কার করলাম, আমার সব নকশা কেমন যেন প্রাণহীন হয়ে গেছে। জীবন থেকে রঙের অভাব বোধ করছিলাম।"

নীলাঞ্জনা নিচের দিকে তাকিয়ে মাটির ওপর আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি করছিল। সে বলল, "শহরের মানুষেরা খুব চপল হয় আহিয়ান সাহেব। আজ যা ভালো লাগে, কাল তা ভুলে যায়। আপনিও কি তাই?"

আহিয়ান নীলাঞ্জনার খুব কাছে গিয়ে বসল। "সবাই এক হয় না নীলা। আমি চাইলেই আপনাকে ভুলতে পারতাম, কিন্তু আপনার দেওয়া সেই নীল রুমালটা আমাকে প্রতি রাতে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, আমার একটা ঠিকানা বাকি রয়ে গেছে।"

নীলাঞ্জনা হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। তার বুকটা ধক করে উঠল। শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ তাকে এভাবে বলবে, তা সে কল্পনাও করেনি। সে ডায়েরিটা হাতে নিয়ে এল। "আপনি কি সত্যি ডায়েরির বাকি পাতাগুলো পড়তে চান?"

আহিয়ান মাথা নাড়ল। নীলাঞ্জনা ডায়েরিটা খুলে পড়তে শুরু করল। সেখানে লেখা ছিল তার একাকীত্ব, তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর এক অজ্ঞাত রাজকুমারের জন্য প্রতীক্ষার কথা। আহিয়ান শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে গেল। তার মনে হলো, এই মেয়েটি কোনো সাধারণ মানুষ নয়, সে যেন এক জীবন্ত কবিতা।

পরদিন সকালে আহিয়ান মোস্তাফিজ সাহেবকে একা পেল। সে সরাসরি কাজের কথায় চলে গেল। "আঙ্কেল, আমি নীলাঞ্জনাকে পছন্দ করি। আমি চাই ও আমার পাশে থাকুক। আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে, তবে আমি ওকে সামাজিকভাবে গ্রহণ করতে চাই।"

মোস্তাফিজ সাহেব থমকে গেলেন। তার হাতে থাকা তসবিহটা থেমে গেল। "বাবা, আপনি অনেক বড় মানুষ। আমরা সাধারণ চাষাভুষো। এই অসম সম্পর্ক কি টিকবে? আপনার পরিবার কি মেনে নেবে?"

আহিয়ান খুব দৃঢ়ভাবে বলল, "আমার বাবা-মা প্রগতিশীল। আর যদি তারা আপত্তিও করেন, তবুও আমি নীলাঞ্জনাকে ছাড়ব না। ও আমার অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে।"

মোস্তাফিজ সাহেব জানতেন, তার মেয়েটির কপালে অনেক দুঃখ জমা আছে। নীলাঞ্জনার মা নেই, তাকে একা বড় করেছেন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "নীলার মতামত জানুন। ও যদি রাজি থাকে, তবে আমার কোনো আপত্তি নেই।"

আহিয়ান নীলাঞ্জনার কাছে গেল। নীলাঞ্জনা তখন শিউলি ফুল কুড়াচ্ছিল। আহিয়ান তার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। "নীলা, আমার সাথে ঢাকা চলবেন? আজীবনের জন্য?"

নীলাঞ্জনার হাতের সাজি থেকে ফুলগুলো ঝরঝর করে পড়ে গেল। তার চোখে জল। সে জানত না ভালোবাসা এত দ্রুত জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সে ফিসফিস করে বলল, "আমি খুব ভয় পাচ্ছি আহিয়ান সাহেব। আমি কি আপনার শহরের যোগ্য?"

আহিয়ান তার হাতটা ধরল। "যোগ্যতা আমি জানি না নীলা, আমি শুধু জানি আপনাকে ছাড়া আমার ঘর হবে না।"

মোস্তাফিজ সাহেব রাজি হওয়ার পর আর দেরি করতে চায়নি আহিয়ান। সে তার বড় বোন আর দুলাভাইকে গ্রামে নিয়ে এল। তার বাবা-মা শুরুতে একটু অবাক হলেও, নীলাঞ্জনাকে সামনাসামনি দেখার পর তাদের সব অভিযোগ যেন ধুয়ে গেল। নীলাঞ্জনার চোখের স্বচ্ছতা আর কথা বলার ধরনে এক অদ্ভুত আভিজাত্য ছিল, যা কোনো দামী মেকআপ বা পোশাক দিয়ে কেনা যায় না।

গ্রামের মসজিদে খুব সাধারণভাবে তাদের আকদ হয়ে গেল। নীলাঞ্জনার পরনে ছিল লাল পাড়ওয়ালা একটি সাদা জামদানি শাড়ি। কোনো গোল্ডের ভারী গয়না নেই, শুধু কপালে একটা বড় লাল টিপ আর দুহাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। আহিয়ান যখন তার হাতে আংটি পরিয়ে দিচ্ছিল, নীলাঞ্জনা অনুভব করল তার সারা শরীর যেন এক অজানিত শিহরণে কেঁপে উঠল।

পরদিন বিদায়ের পালা। মোস্তাফিজ সাহেব গেটের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। নীলাঞ্জনা তার বাবার পা ছুঁয়ে সালাম করল। "বাবা, নিজের খেয়াল রেখো। নিয়মিত ওষুধ খেও," নীলাঞ্জনার গলা বুজে এল। আহিয়ান তার শ্বশুরের হাত ধরে কথা দিল, "আঙ্কেল, নীলাকে আমি আমার চোখের মণি করে রাখব। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।"

গাড়ি যখন গ্রামের ধুলোমাখা রাস্তা ছেড়ে হাইওয়েতে উঠল, নীলাঞ্জনা জানালার কাঁচ দিয়ে পেছনে তাকাচ্ছিল যতক্ষণ না তার প্রিয় বাড়িটা ঝাপসা হয়ে গেল। আহিয়ান তার বাম হাত দিয়ে নীলাঞ্জনার কাঁপা হাতটা শক্ত করে ধরল।

ঢাকার গুলশানে আহিয়ানের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে যখন তারা পৌঁছাল, তখন রাত গভীর। পুরো ঘর আলোকসজ্জায় সাজানো। নীলাঞ্জনা ড্রয়িংরুমে ঢুকেই থমকে গেল। মেঝেতে দামী কার্পেট, দেয়ালে বিমূর্ত ছবি আর বড় বড় কাঁচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে শহরের নিয়ন আলোর ঝিলিক।

"পছন্দ হয়েছে নীলা?" আহিয়ান তার ব্যাগটা সোফায় রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল। নীলাঞ্জনা ধীরপায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। "খুব সুন্দর আহিয়ান সাহেব। কিন্তু এখানে কি জোছনা দেখা যায়? নাকি এই বৈদ্যুতিক আলোগুলো আকাশটাকে ঢেকে রাখে?"

আহিয়ান হাসল। সে পেছন থেকে নীলাঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরল। "এখানে জোছনা দেখার জন্য ছাদে যেতে হয়। তবে আজ রাতে আমরা এই কাঁচের ওপারেই আমাদের নতুন গল্প শুরু করব।"

প্রথম কয়েকদিন স্বপ্নের মতো কাটল। আহিয়ান নীলাঞ্জনাকে নিয়ে শহরের সেরা সব জায়গায় ঘুরল। কিন্তু নীলাঞ্জনা খুব একটা সহজ হতে পারছিল না। রেস্তোরাঁর কাঁটা-চামচ আর মানুষের কৃত্রিম হাসি তাকে খুব পীড়া দিত। সে অনুভব করল, এই শহরটা বড় বেশি যান্ত্রিক, যেখানে হৃদয়ের চেয়ে বৈভবকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

নীলাঞ্জনার জীবনে প্রথম কাঁটা হয়ে দেখা দিল শায়লা। শায়লা আহিয়ানের বাল্যবন্ধু এবং একসময় তাদের বিয়ের কথা উঠেছিল। কিন্তু আহিয়ান ক্যারিয়ারের খাতিরে তখন পিছিয়ে গিয়েছিল। শায়লা এখন একজন নামকরা ইন্টেরিয়র ডিজাইনার এবং আহিয়ানের অফিসের সব কাজ সে-ই দেখাশোনা করে।

একদিন সন্ধ্যায় আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা একটা পার্টিতে গেল। সেখানে শায়লার সাথে দেখা। শায়লা ওপর-ওপর খুব ভালো ব্যবহার করলেও তার চোখের দৃষ্টি ছিল সাপের মতো তীক্ষ্ণ। সে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, "আহিয়ান, তোমার চয়েস তো দারুণ! একদম গ্রামের সেই ফ্রেশ মাটির গন্ধ। কিন্তু এই মেয়েটি কি আমাদের এই হাই-প্রোফাইল লাইফে মানিয়ে নিতে পারবে?"

আহিয়ান শক্ত গলায় বলল, "মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই শায়লা। আমি নীলাঞ্জনাকে বদলাতে চাই না, বরং এই শহরটাকেই ওর মতো স্নিগ্ধ দেখতে চাই।"

শায়লা চুপ করে গেল ঠিকই, কিন্তু মনে মনে সে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের ছক আঁকতে শুরু করল। সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না যে একটা সাধারণ গ্রামের মেয়ে তার কাছ থেকে আহিয়ানকে কেড়ে নেবে।

পার্টি থেকে ফেরার পর নীলাঞ্জনা খুব মনমরা হয়ে রইল। শায়লার কথাগুলো তার বুকে তীরের মতো বিঁধেছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাধারণ চেহারাটা দেখছিল। "আহিয়ান সাহেব, আপনি কি সত্যি আমাকে নিয়ে লজ্জিত নন?" নীলাঞ্জনা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

আহিয়ান তখন ল্যাপটপে কাজ করছিল। সে কাজ থামিয়ে নীলাঞ্জনার কাছে এল। "এসব কী বলছ নীলা? তুমি জানো না তুমি আমার কাছে কী? তুমি এই মরুভূমির মতো জীবনে এক পশলা বৃষ্টি।"

কিন্তু নীলাঞ্জনার মন শান্ত হলো না। সে দেখল আহিয়ানের ফোনের স্ক্রিনে বারবার শায়লার মেসেজ আসছে। "আহিয়ান, কালকের মিটিংয়ের ফাইলটা দেখে নিও", "আহিয়ান, ডিনার করেছ?"

নীলাঞ্জনা কিছু বলল না, কিন্তু তার বুকের ভেতর এক গভীর সন্দেহের বীজ জন্ম নিতে শুরু করল। বিশ্বাসের যে খুঁটিটা সে গ্রামে শক্ত ভেবেছিল, শহরের এই হাওয়ায় তা যেন একটু নড়বড়ে মনে হতে লাগল।

পরদিন সকালে আহিয়ানকে খুব ভোরেই বেরিয়ে যেতে হলো। অফিসের এক জরুরি মিটমাট করার জন্য তাকে যেতে হবে শহরের বাইরে। যাওয়ার সময় সে নীলাঞ্জনার কপালে একটি চুমু খেয়ে বলল, "চিন্তা কোরো না নীলা, আমি সন্ধ্যায় ফিরে আসব। আজ আমরা বাইরে ডিনার করব।"

নীলাঞ্জনা কৃত্রিম হাসি হাসল। আহিয়ান চলে যাওয়ার পর বিশাল এই অ্যাপার্টমেন্টটা তার কাছে খাঁচার মতো মনে হতে লাগল। সে ঘর গোছাতে গিয়ে আহিয়ানের একটি পুরনো ডায়েরি খুঁজে পেল। কৌতূহলবশত পাতা উল্টাতেই দেখল সেখানে শায়লার সাথে আহিয়ানের পুরনো কিছু ছবি। প্রতিটি ছবির নিচে শায়লার হাতে লেখা— "চিরকাল তোমারই থাকব।"

নীলাঞ্জনার হাত কাঁপতে শুরু করল। ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখল শায়লা দাঁড়িয়ে আছে। পরনে দামী ওয়েস্টার্ন ড্রেস, চোখে সানগ্লাস।

"ভেতরে আসতে পারি নীলাঞ্জনা?" শায়লা কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ভেতরে ঢুকে পড়ল। সে সোফায় আয়েশ করে বসে বলল, "জানো নীলাঞ্জনা, আহিয়ানের রুচি খুব অদ্ভুত। ও মাঝে মাঝে একঘেয়েমি কাটাতে গ্রাম্য জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু দিনশেষে ও আমার কাছেই ফিরে আসে। এই ফ্ল্যাটের ডেকোরেশন থেকে শুরু করে আহিয়ানের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমার হাত দিয়েই হয়।"

নীলাঞ্জনা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে শান্ত গলায় বলল, "আহিয়ান সাহেব এখন বাড়িতে নেই। আপনি পরে আসুন।"

শায়লা হাসল। "আমি জানি ও নেই। আমি শুধু তোমাকে একটা সত্যি দেখাতে এসেছি।" সে তার ফোন থেকে একটি অডিও রেকর্ডিং প্লে করল। সেখানে আহিয়ানের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল— "শায়লা, নীলা খুব সহজ-সরল। ওকে বিয়ে করাটা হয়তো আমার একটা আবেগ ছিল, কিন্তু প্রফেশনালি আমি তোমাকে ছাড়া অচল।"

রেকর্ডিংটা শুনে নীলাঞ্জনার পৃথিবীটা দুলে উঠল। সে জানত না এটি শায়লার এডিট করা একটি অডিও। তার মনে হলো, মফস্বলের সেই বৃষ্টিভেজা রাতটা কি তবে শুধুই একটা মায়া ছিল?

শায়লা চলে যাওয়ার পর নীলাঞ্জনা ঘরের কোণে বসে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার মনে পড়ল বাবার কথা। বাবা বলেছিলেন— "বড় মানুষের সাথে ঘর করা কঠিন রে মা।" আজ মনে হচ্ছে বাবা কত ঠিক ছিলেন।

সেদিন বিকেলে আহিয়ান যখন ফিরল, তার হাতে একগুচ্ছ নীল অপরাজিতা। সে খুব উৎসাহ নিয়ে ডাকল, "নীলা! দেখ তোমার জন্য কী এনেছি!"

নীলাঞ্জনা কোনো উত্তর দিল না। সে রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত থাকার ভান করল। আহিয়ান পেছনে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে সে ছিটকে সরে এল। "আমাকে স্পর্শ করবেন না আহিয়ান সাহেব," নীলাঞ্জনার কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল।

আহিয়ান হতভম্ব হয়ে গেল। "কী হয়েছে নীলা? আমি কী করেছি?"

"আপনি যা করেছেন তা আপনি নিজেই ভালো জানেন। আমার মতো এক সাধারণ গ্রাম্য মেয়েকে নিয়ে আর কতদিন এই নাটক চালিয়ে যাবেন? শায়লাই যদি আপনার সব হয়, তবে আমাকে কেন এই আলোকোজ্জ্বল জেলখানায় নিয়ে এলেন?"

আহিয়ান বুঝতে পারল না কেন নীলাঞ্জনা এসব বলছে। সে রাগ করে বলল, "শায়লা আমার শুধু কলিগ। তুমি যদি সারাদিন ঘরে বসে উল্টোপাল্টা ভাবো, তবে আমি কী করব? শহরের জীবন এমনই, এখানে সবাইকে নিয়ে চলতে হয়।"

সেই রাতে তাদের মাঝখানে এক বিশাল দেয়াল তৈরি হলো। একই বিছানায় শুয়েও তারা দুজন যেন দুই মেরুর বাসিন্দা। নীলাঞ্জনা সারা রাত জানালার ওপারে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ আকাশে কোনো তারা নেই, শুধু গাঢ় অন্ধকার।

পরদিন সকালে নীলাঞ্জনার গ্রামের এক প্রতিবেশীর ফোন এল। মোস্তাফিজ সাহেবের স্ট্রোক হয়েছে, তিনি হাসপাতালে। খবরটা শুনেই নীলাঞ্জনা পাগলের মতো হয়ে গেল। সে আহিয়ানকে কিছু না জানিয়েই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

সে যখন স্টেশনে পৌঁছাল, তখন ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তার কাছে পর্যাপ্ত টাকাও নেই। সে স্টেশনের এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। ঠিক তখনই তার কাঁধে একটি পরিচিত হাত পড়ল।

আহিয়ান তার অফিসের কাজ ফেলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে। সে নীলাঞ্জনার হাতটা শক্ত করে ধরল। "তুমি কি ভেবেছ আমাকে ছাড়া তুমি কোথাও যেতে পারবে? আমি সব শুনেছি। চলো, আমার গাড়িতে চলো। আমিই তোমাকে বাবার কাছে নিয়ে যাব।"

নীলাঞ্জনা তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু আহিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে সে দমে গেল। সেই চোখে রাগের চেয়ে উদ্বেগ বেশি ছিল।

পুরো পথ তারা কেউ কোনো কথা বলল না। গাড়ির ওয়াইপার বৃষ্টির জল সরিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু তাদের মনের গুমোট মেঘ সরানোর কোনো উপায় ছিল না। নীলাঞ্জনা শুধু মনে মনে প্রার্থনা করছিল— "বাবা, তুমি ভালো হয়ে যাও। আমি আর তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।"

আহিয়ান স্টিয়ারিং ধরে ভাবছিল— "কোথায় ভুল হচ্ছে? কেন বিশ্বাসটা কাঁচের মতো ভেঙে পড়ছে?" সে সিদ্ধান্ত নিল, বাবার চিকিৎসার জন্য সে যা দরকার সব করবে, কিন্তু নীলাঞ্জনাকে হারাবে না।

মফস্বলের সেই ছোট সরকারি হাসপাতাল। সাদা দেয়ালগুলো নোনা ধরে কালচে হয়ে গেছে, আর বাতাসে কার্বলিক অ্যাসিডের কটু গন্ধ। মোস্তাফিজ সাহেবকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। নীলাঞ্জনা বাবার ফ্যাকাশে হাতটা ধরে পাশে বসে আছে। তার চোখের জল থামছে না।

আহিয়ান বাইরে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলছিল। হাসপাতালের এই অব্যবস্থাপনা দেখে সে বিরক্ত। সে চেয়েছিল বাবাকে ঢাকা নিয়ে যেতে, কিন্তু ডাক্তার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই অবস্থায় নড়াচড়া করা বিপজ্জনক।

রাত তখন দুটো। হাসপাতালের করিডোরে একটা টিমটিমে বাল্ব জ্বলছে। আহিয়ান ফ্লাস্কে করে চা নিয়ে নীলাঞ্জনার পাশে এসে বসল। "নীলা, কিছু খেয়ে নাও। তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লে বাবাকে দেখবে কে?"

নীলাঞ্জনা কোনো উত্তর দিল না। সে আহিয়ানের দিকে তাকালও না। তার এই নীরবতা আহিয়ানকে তিলে তিলে মারছিল। আহিয়ান নিচু স্বরে বলল, "তুমি কি এখনো বিশ্বাস করো আমি তোমাকে নিয়ে নাটক করছি? শায়লা কী বলেছে আমি জানি না, কিন্তু আমার হৃদস্পন্দন শুধু তোমার নামেই চলে নীলা।"

নীলাঞ্জনা এবার মুখ খুলল। "হৃদস্পন্দন যার নামেই চলুক আহিয়ান সাহেব, আপনার জীবনটা শায়লাদের মতো মানুষের জন্য। আমার বাবা আজ এই অবস্থায় কেন জানেন? কারণ আমি তাকে ছেড়ে আপনার ঐ মিথ্যে মায়ার শহরে গিয়েছিলাম। আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না।"

আহিয়ান বুঝতে পারল, নীলাঞ্জনার মনে অপরাধবোধ কাজ করছে। সে আর কথা বাড়াল না। সেই রাতে পাথরের মেঝেতে বসে আহিয়ান অনুভব করল, আভিজাত্য আর টাকা দিয়ে মৃত্যু বা বিচ্ছেদের ভয়কে জয় করা যায় না।

ভোরবেলা মোস্তাফিজ সাহেব চোখ মেললেন। নীলাঞ্জনা চিৎকার করে ডাক্তার ডাকল। ডাক্তার পরীক্ষা করে হাসিমুখে বললেন, "বিপদ কেটে গেছে। ওনার ইচ্ছাশক্তি খুব প্রবল। তবে ওনাকে শান্তিতে রাখতে হবে।"

মোস্তাফিজ সাহেব ইশারায় আহিয়ানকে কাছে ডাকলেন। আহিয়ান তার শিয়রে গিয়ে বসল। বৃদ্ধ মানুষটি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "বাবা আহিয়ান, আমার মা-টাকে দেখে রেখো। ও খুব অবুঝ।"

আহিয়ান মোস্তাফিজ সাহেবের হাতটা নিজের কপালে ঠেকাল। "আঙ্কেল, কথা দিচ্ছি, নীলার চোখের জল আর কোনোদিন পড়তে দেব না।"

নীলাঞ্জনা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিল। তার মনের বরফ কি একটু গলতে শুরু করেছে? আহিয়ান যে গত চব্বিশ ঘণ্টা এক ফোঁটা পানিও স্পর্শ করেনি এবং সারারাত তার বাবার জন্য হন্যে হয়ে ওষুধ জোগাড় করেছে, তা সে অস্বীকার করতে পারল না।

বাবার অবস্থা একটু স্থিতিশীল হলে আহিয়ানকে এক দিনের জন্য ঢাকা যেতে হলো। অফিসের একটা বড় ডিল হাতছাড়া হওয়ার মুখে। যাওয়ার সময় সে নীলাঞ্জনাকে বলে গেল, "আমি কালকেই ফিরে আসব। তুমি সাবধানে থেকো।"

কিন্তু আহিয়ান ঢাকা পৌঁছাতেই শায়লা আবার সক্রিয় হয়ে উঠল। সে জানত আহিয়ান এখন মানসিকভাবে দুর্বল। সে আহিয়ানের ফোনে বারবার ফোন করতে লাগল। এক পর্যায়ে আহিয়ান ফোন রিসিভ করতেই শায়লা কাঁদতে শুরু করল। "আহিয়ান, আমার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। আমি বনানীর রাস্তায় পড়ে আছি। প্লিজ আসো!"

আহিয়ান মানবতার খাতিরে সেখানে গেল। কিন্তু গিয়ে দেখল শায়লা একদম ঠিক আছে, শুধু তার গাড়ির টায়ার পাংচার হয়েছে। সে রেগে গিয়ে যখন ফিরে আসতে চাইল, শায়লা তাকে জোর করে জড়িয়ে ধরল। ঠিক সেই মুহূর্তে শায়লার ভাড়া করা একজন লোক দূর থেকে তাদের ছবি তুলে নিল।

শায়লা মনে মনে হাসল। "এখন দেখো নীলাঞ্জনা, তোমার 'পবিত্র' স্বামী কী করে!"

পরদিন সকালে নীলাঞ্জনার ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কিছু ছবি এল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে আহিয়ান আর শায়লা অন্ধকার রাস্তায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। ছবির নিচের ক্যাপশনে লেখা ছিল— "তোমার অনুপস্থিতিতে আহিয়ান তার পুরনো প্রেম খুঁজে পেয়েছে।"

নীলাঞ্জনার হাতের ফোনটা মেঝেতে পড়ে গেল। তার মনে হলো তার চারপাশের বাতাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে বাবার কেবিনে গিয়ে দেখল বাবা শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। সে ঠিক করল, সে আর কোনোদিন ঐ শহরে ফিরে যাবে না।

আহিয়ান যখন বিকেলে হাসপাতালে এল, তার হাতে নীলাঞ্জনার প্রিয় সেই নীল চুড়ি। সে হাসিমুখে নীলাঞ্জনার কাছে যেতেই নীলাঞ্জনা তাকে সপাটে একটা চড় মারল। পুরো হাসপাতাল চত্বর মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

"বেরিয়ে যান এখান থেকে! আপনার ঐ নোংরা হাত দিয়ে আমাকে ছোঁবেন না!" নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল।

আহিয়ান অবাক হয়ে তার গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল না কী হয়েছে। "নীলা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?"

নীলাঞ্জনা তার ফোনটা তুলে ছবিগুলো আহিয়ানের সামনে ধরল। "এটা কি আপনি নন? এই নোংরামির পর আপনি আমার বাবার সামনে দাঁড়াতে পারেন?"

আহিয়ান ছবিগুলো দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল সে এক ভয়ংকর চক্রান্তের শিকার। কিন্তু এই মুহূর্তে নীলাঞ্জনাকে বোঝানোর কোনো ভাষা তার কাছে ছিল না। প্রমাণের কাছে তার সত্য হেরে গেল।

আহিয়ান ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। প্রযুক্তির এই যুগে একটা স্থির ছবি যে কতটা নিপুণভাবে মিথ্যে বলতে পারে, তা সে আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সে নীলাঞ্জনার হাত ধরতে চাইল, কিন্তু নীলাঞ্জনা ঘৃণায় পিছিয়ে গেল।

"নীলা, একটা মুহূর্তের জন্য আমার কথা শোনো। এটা একটা সাজানো ঘটনা। শায়লা আমাকে বিপদে পড়ার কথা বলে ডেকে নিয়েছিল," আহিয়ানের কণ্ঠে আকুতি ছিল।

নীলাঞ্জনা তপ্ত হাসল। "বিপদে পড়লে কি মানুষ এভাবে জড়িয়ে ধরে আহিয়ান সাহেব? আপনার আভিজাত্যের পৃথিবীতে হয়তো এসব সাধারণ, কিন্তু আমার গ্রামের সহজ-সরল মনে এসবের নাম বিশ্বাসঘাতকতা। আপনি এখনই এখান থেকে চলে যান।"

আহিয়ান দেখল মোস্তাফিজ সাহেব কেবিনের ভেতরে নড়াচড়া করছেন। এই অবস্থায় চিৎকার-চেঁচামেচি হলে বৃদ্ধ মানুষটির হার্ট আবার ব্লক হয়ে যেতে পারে। সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ব্যাগটা তুলে নিল।

"আমি যাচ্ছি নীলা। তবে মনে রেখো, সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না। যেদিন তুমি নিজের ভুল বুঝতে পারবে, সেদিন হয়তো আমি আর তোমার ফেরার অপেক্ষায় থাকব না।"

আহিয়ান ঝড়ের বেগে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সে তার পাজেরো গাড়িটা নিয়ে পাগলের মতো ড্রাইভ করতে লাগল। বৃষ্টির ঝাপটায় সামনের রাস্তা ঝাপসা হয়ে আসছে, ঠিক যেমন ঝাপসা হয়ে গেছে তার সাজানো জীবনটা।

আহিয়ান চলে যাওয়ার পর নীলাঞ্জনা পাথরের মতো স্থির হয়ে বাবার শিয়রে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও পড়ল না। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ যখন তীব্র হয়, তখন মানুষের চোখের জল শুকিয়ে যায়।

বাবার জ্ঞান ফেরার পর নীলাঞ্জনা মিথ্যে হাসল। "বাবা, আহিয়ান সাহেবের অফিসে একটা জরুরি কাজ পড়েছে, তাই ওনাকে ঢাকা যেতে হয়েছে। উনি বলে গেছেন আপনি সুস্থ হলে আমাদের নিতে আসবেন।"

মোস্তাফিজ সাহেব দুর্বলভাবে হাসলেন। "জানি মা, ও খুব ব্যস্ত মানুষ। আমার জন্য ওর অনেক ক্ষতি হলো।"

নীলাঞ্জনা মনে মনে ভাবল, ক্ষতি ওনার হয়নি বাবা, ক্ষতি হয়েছে আমার—যে আমি মরীচিকার পেছনে ছুটে নিজের ঘর হারিয়েছি।

পরের এক সপ্তাহ নীলাঞ্জনা একাই সব সামলাল। বাবার হাসপাতাল থেকে ছুটি হলো। তারা আবার সেই পুরনো বাড়িতে ফিরে এল। বাগানটা আগাছায় ভরে গেছে, বাড়িটা কেমন যেন ভুতুড়ে লাগছে। নীলাঞ্জনা আবার সেই নীল ডায়েরিটা হাতে নিল। কিন্তু এবার সে আর কোনো কবিতা লিখল না। ডায়েরির পাতায় পাতায় সে শুধু আঁকিবুঁকি করল—একজোড়া ভাঙা চুড়ি আর একটা মেঘলা আকাশ।

ঢাকায় ফিরে আহিয়ান দমে গেল না। সে সোজা চলে গেল তার এক বন্ধুর কাছে, যে সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট। সে তাকে সেই ছবিগুলো দেখাল।

"রনি, আমাকে এই ছবিগুলোর পোস্টমর্টেম করে দাও। আমি জানতে চাই এগুলো কোন লেন্স দিয়ে তোলা এবং সেই সময় শায়লার লোকেশন কোথায় ছিল।"

রনি কাজ শুরু করল। এদিকে আহিয়ান অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিল। সে তার ফ্ল্যাটে নিজেকে বন্দি করে রাখল। শায়লা কয়েকবার তাকে ফোন করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আহিয়ান ফোন ধরেনি। সে অপেক্ষা করছিল অকাট্য প্রমাণের জন্য।

তিন দিন পর রনি তাকে কল করল। "আহিয়ান, গুড নিউজ। ছবিগুলো জুম করলে দেখা যায় ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ড আছে, যা সেই রাতে বন্ধ ছিল। আর শায়লার ফোনের জিপিএস বলছে সে তখন মোটেও বিপদে পড়েনি, বরং তার বাড়ির নিচে একজন ফটোগ্রাফারের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলছিল। এই নাও সব ডিজিটাল এভিডেন্স।"

আহিয়ান প্রমাণগুলো হাতে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার বাঘের মতো গর্জে ওঠার পালা।

আহিয়ান সেদিন শায়লাকে তার অফিসে ডেকে পাঠাল। শায়লা খুব সেজেগুজে এসেছে, ভাবছে হয়তো আহিয়ান আবার তার কাছে ফিরে আসবে।

"আহিয়ান, ডাকলে কেন? তুমি তো ফোনই ধরছিলে না," শায়লা মিষ্টি হেসে বলল।

আহিয়ান কোনো ভূমিকা না করে ল্যাপটপটা তার দিকে ঘুরিয়ে দিল। রনির দেওয়া সব এভিডেন্স স্ক্রিনে ভেসে উঠল। শায়লার মুখ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

"শায়লা, আমি তোমাকে বন্ধু ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি একটা পশুর চেয়েও অধম। তুমি আমার সাজানো সংসারটা ভেঙে দিলে? শুধুমাত্র তোমার ইগোর জন্য?"

"আহিয়ান, আমি তোমাকে ভালোবাসি! ওই গ্রামের মেয়েটা তোমার যোগ্য নয়!" শায়লা চিৎকার করে উঠল।

আহিয়ান শান্ত কিন্তু কঠোর গলায় বলল, "যোগ্যতা তুমি কি বোঝো শায়লা? নীলাঞ্জনা পবিত্র, আর তুমি দুর্গন্ধময় আবর্জনা। আজ থেকে আমার অফিসে তোমার কোনো জায়গা নেই। আমি লিগ্যাল অ্যাকশন নিতে পারতাম, কিন্তু তোমার ওপর ঘেন্না হচ্ছে বলে ছাড় দিলাম। বেরিয়ে যাও এখান থেকে!"

শায়লা অপমানে ও রাগে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে গেল। কিন্তু আহিয়ানের মনে কোনো আনন্দ ছিল না। সে জানত, প্রমাণ পেলেও নীলাঞ্জনার ভাঙা বিশ্বাস জোড়া লাগানো এত সহজ নয়।

শায়লার বিদায়ে অফিসের কেবিনটা শান্ত হয়ে এলেও আহিয়ানের বুকের ভেতরটা অশান্ত হয়ে রইল। সে ল্যাপটপ বন্ধ করে ড্রয়িংরুমের কাঁচের দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়াল। তেরোতলার ওপর থেকে ঢাকাকে এখন একটা আলোর সমুদ্র মনে হচ্ছে, কিন্তু এই সমুদ্রে কোনো শান্তির কূল নেই।

তার মনে পড়ল সেই প্রথম বৃষ্টির রাতের কথা। নীলাঞ্জনা যখন হ্যারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন কি আহিয়ান ভেবেছিল এই স্নিগ্ধতা একদিন তার সন্দেহের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে? সে ফোনটা হাতে নিল। নীলাঞ্জনার নম্বরটা বারবার ডায়াল করেও কেটে দিল। সে জানে, এই মুহূর্তে ফোন করলে নীলাঞ্জনা ধরবে না, ধরলেও হয়তো ঘৃণা উগড়ে দেবে।

সেদিন রাতেই আহিয়ান সিদ্ধান্ত নিল, সে আবার সেই মফস্বলে যাবে। তবে এবার সে একা যাবে না। সে শায়লার সেই ভাড়া করা ফটোগ্রাফারকে খুঁজে বের করল। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে লোকটা স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হলো যে পুরো নাটকটি শায়লার নির্দেশে সাজানো হয়েছিল।

পরদিন খুব ভোরে আহিয়ান গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। কুয়াশা ভেজা রাস্তা দিয়ে গাড়িটা যখন গ্রামের পরিচিত মেঠো পথে ঢুকল, তখন সকালের রোদ পাতায় পাতায় ঝিকমিক করছে। বাগানের গেটটা খোলা। মোস্তাফিজ সাহেব বারান্দায় বসে তসবিহ গুনছেন।

আহিয়ানকে দেখে বৃদ্ধ মানুষটি একটু অবাক হলেন। "বাবা, তুমি আবার? নীলা তো গত সাত দিন ধরে তোমার নামও মুখে নেয়নি।"

আহিয়ান নিচু স্বরে বলল, "আঙ্কেল, আমি আজ ক্ষমা চাইতে আসিনি, আমি সত্যটা নিয়ে এসেছি। নীলাঞ্জনা কোথায়?"

"পেছনের দিঘির পাড়ে বসে আছে হয়তো," মোস্তাফিজ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

আহিয়ান দিঘির পাড়ে গিয়ে দেখল নীলাঞ্জনা জলের দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো বসে আছে। তার পায়ের কাছে পড়ে আছে কিছু ভাঙা কাঁচের চুড়ি। আহিয়ান ধীরপায়ে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

"নীলা..."

নীলাঞ্জনা চমকে উঠল না। সে শান্ত গলায় বলল, "আবার কেন এসেছেন? আমার জীবনের সব রং তো আপনি কেড়ে নিয়েছেন। এখন কি শুধু প্রাণটা নিতে এসেছেন?"

আহিয়ান কোনো কথা না বলে তার ফোনটা নীলাঞ্জনার সামনে ধরল। সেখানে সেই ফটোগ্রাফারের ভিডিও স্টেটমেন্ট আর সব ডিজিটাল প্রমাণ বাজতে শুরু করল। নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে ভিডিওটি দেখল। পুরো পৃথিবীটা যেন তার চোখের সামনে আবার বদলে গেল।

ভিডিও শেষ হওয়ার পর আহিয়ান বলল, "তুমি সেদিন আমাকে চড় মেরেছিলে নীলা, কিন্তু তার চেয়ে বড় আঘাত ছিল তোমার অবিশ্বাস। আমি জানি আমি শহরের মানুষ, আমাদের পৃথিবীটা জটিল। কিন্তু আমার ভালোবাসাটা ছিল একদম তোমার গ্রামের মাটির মতো খাঁটি।"

নীলাঞ্জনার চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। সে ডুকরে কেঁদে উঠল। সে বুঝতে পারল, সে রাগের মাথায় এক অমূল্য সম্পদকে অপদস্থ করেছে। সে আহিয়ানের পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাইতে চাইল, কিন্তু আহিয়ান তাকে সরিয়ে দিল।

"না নীলা, সম্পর্কের কাঁচ একবার ভাঙলে তা জোড়া লাগানো যায়, কিন্তু দাগ থেকে যায়। আমি আজ প্রমাণ দিয়ে গেলাম যাতে তুমি নিজেকে অপরাধী না ভাবো। ভালো থেকো।"

আহিয়ান ঘুরে দাঁড়াল। সে হাঁটতে শুরু করল তার গাড়ির দিকে।

আহিয়ান যখন গেটের কাছে পৌঁছেছে, তখন হঠাৎ আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামল। সেই সেই পরিচিত ঝোড়ো হাওয়া। নীলাঞ্জনা দৌড়ে এল তার পেছনে।

"আহিয়ান সাহেব! দাঁড়ান! আমাকে ফেলে যাবেন না!" নীলাঞ্জনা বৃষ্টির মাঝে চিৎকার করে উঠল।

আহিয়ান থামল না। সে গাড়ির দরজা খুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই নীলাঞ্জনা তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। "আমি ভুল করেছি! আমি অবুঝ! আপনার দেওয়া সব শাস্তি আমি মাথা পেতে নেব, কিন্তু দয়া করে আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আমি আপনাকে ছাড়া মরে যাব।"

আহিয়ান অনুভব করল নীলাঞ্জনার চোখের জল আর আকাশের বৃষ্টির জল এক হয়ে তার পিঠ ভিজিয়ে দিচ্ছে। তার সব অভিমান এক নিমেষে ধুয়ে গেল। সে ঘুরে নীলাঞ্জনাকে বুকে টেনে নিল।

"পাগলি মেয়ে, তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমার থাকলে আমি কবেই চলে যেতাম। আমি শুধু চাইতাম তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।"

বৃষ্টির সেই অঝোর ধারায় তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। মোস্তাফিজ সাহেব বারান্দা থেকে এই দৃশ্য দেখে পরম শান্তিতে দুহাত তুলে দোয়া করলেন।

আহিয়ান নীলাঞ্জনার কানে ফিসফিস করে বলল, "শহরে ফিরবে নীলা? তবে এবার আর আলোকোজ্জ্বল খাঁচায় নয়, এবার আমাদের ঘর হবে ভালোবাসার প্রদীপ দিয়ে সাজানো।"

নীলাঞ্জনা তার ভিজে মুখটা আহিয়ানের বুকে লুকিয়ে বলল, "যেখানে আপনি থাকবেন, সেখানেই আমার ঘর।"

বৃষ্টি থামার পর গ্রামের আকাশটা যেন ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে। গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে জল পড়ছে। আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা ঘরে ফিরে এল। মোস্তাফিজ সাহেব দুজনকে দেখে মিটিমিটি হাসছেন। আজ রাতে আর তাদের ঢাকা ফেরা হলো না। আহিয়ান সিদ্ধান্ত নিল, আজ রাতটা সে এই মফস্বলের জীর্ণ কিন্তু মায়াময় ঘরটিতেই কাটাবে।

রাতের বেলা হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় নীলাঞ্জনা ডাল-ভাত আর আলুভর্তা রান্না করল। আহিয়ান যখন পিঁড়িতে বসে খেতে বসল, তার মনে হলো এই সাধারণ খাবারের স্বাদ পৃথিবীর সব নামী রেস্তোরাঁকে হার মানায়।

খাওয়া শেষে তারা দুজনে বারান্দায় গিয়ে বসল। নীলাঞ্জনা বলল, "শহরে ফিরে কি আমাকে আবার সেই শায়লাদের মুখোমুখি হতে হবে?"

আহিয়ান নীলাঞ্জনার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "না নীলা। শায়লা আমার জীবন থেকে তো বটেই, আমার অফিস থেকেও চিরতরে বিদায় নিয়েছে। আর আমি চাই না তুমি ঘরে বসে শুধু আমার অপেক্ষা করো। আমি চাই তুমি নিজের একটা পরিচয় তৈরি করো।"

নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে তাকাল। "আমার পরিচয়? আমি তো শুধু বিএ পাশ করেছি, আমি কী করতে পারি?"

আহিয়ান হাসল। "তোমার ভেতর একটা অদ্ভূত সৃজনশীলতা আছে। তুমি লেখালেখি করতে পারো, কিংবা শিশুদের জন্য কিছু করতে পারো। আমি তোমাকে সাহায্য করব।”

ঢাকায় ফিরে আসার পর নীলাঞ্জনা লক্ষ্য করল আহিয়ান অনেকটা বদলে গেছে। সে এখন অফিস থেকে আগের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে। ছুটির দিনগুলোতে তারা দুজনে মিলে বারান্দায় ছোট ছোট ফুলের টব সাজায়। নীলাঞ্জনা তার সেই নীল ডায়েরিতে আবার লিখতে শুরু করেছে, তবে এবার আর বিরহের কবিতা নয়, এবার সেখানে ঠাঁই পাচ্ছে আগামীর রঙিন স্বপ্ন।

এরই মধ্যে একদিন নীলাঞ্জনা অনুভব করল তার শরীরে এক অদ্ভূত পরিবর্তন। সারাদিন তার মাথা ঘোরে, কোনো খাবারের গন্ধ সহ্য করতে পারে না। আহিয়ান তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল।

ডাক্তার রিপোর্ট দেখে হাসিমুখে বললেন, "অভিনন্দন মিস্টার চৌধুরী! আপনি বাবা হতে চলেছেন।"

আহিয়ান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর সে সবার সামনেই নীলাঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরল। নীলাঞ্জনার চোখে খুশির অশ্রু। সে বুঝতে পারল, তাদের এই ভাঙা-গড়ার সম্পর্কের মাঝে ঈশ্বর এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছেন, যা তাদের চিরদিনের জন্য এক সুতোয় বেঁধে দেবে।

খবরটা শোনার পর আহিয়ানের মা, রেহানা বেগম অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি আগে নীলাঞ্জনাকে কিছুটা অবহেলা করলেও, নিজের নাতি বা নাতনির খবর পেয়ে সব অভিমান ভুলে গেলেন। তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে তাদের ফ্ল্যাটে চলে এলেন।

"নীলা মা, তুমি এখন থেকে একদম ভারী কাজ করবে না। আমি এই কয়েক মাস তোমার সাথেই থাকব," রেহানা বেগম নীলাঞ্জনার মাথায় হাত রেখে বললেন।

নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে দেখল, যে মানুষটি তাকে এক সময় 'গ্রাম্য মেয়ে' বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, আজ তিনিই তার সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। মাতৃত্বের এই সম্মান নীলাঞ্জনাকে এক অন্যরকম শক্তি দিল।

আহিয়ান এখন আরও বেশি যত্নশীল। সে অফিসের ফাইল বাড়িতে নিয়ে আসে। নীলাঞ্জনা যখন রাতে ঘুমাতে পারে না, আহিয়ান তাকে গল্প শোনায়, তার পায়ের পাতায় মালিশ করে দেয়। তাদের সেই শহরের জৌলুসপূর্ণ ফ্ল্যাটটি এখন সত্যিকারের একটি 'ঘর' হয়ে উঠেছে।

সবকিছু ঠিকঠাক চললেও শায়লা শান্ত ছিল না। সে প্রতিশোধ নেওয়ার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। সে জানত নীলাঞ্জনা গর্ভবতী। সে এমন কিছু করার পরিকল্পনা করল যাতে আহিয়ানকে মানসিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া যায়।

একদিন আহিয়ান যখন অফিসে ছিল, তখন নীলাঞ্জনার নামে একটি পার্সেল এল। সেখানে একটি উড়ো চিঠি আর কিছু পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং ছিল, যাতে আহিয়ানের পরিবারের কিছু অতীত কেলেঙ্কারির কথা লেখা ছিল। চিঠিতে লেখা ছিল— "আহিয়ান তোমাকে সব সত্যি বলেনি। তোমার সন্তানের রক্তে কলঙ্ক আছে।"

নীলাঞ্জনা চিঠিটা পড়ে বিচলিত হয়ে পড়ল। ঠিক তখনই তার পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হলো। সে ফোনের কাছে যাওয়ার আগেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ভাগ্যক্রমে রেহানা বেগম তখন ড্রয়িংরুমে ছিলেন। তিনি চিৎকার করে কাজের লোক ডাকলেন এবং নীলাঞ্জনাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।

আহিয়ান খবর পেয়ে পাগলের মতো হাসপাতালে ছুটে এল। সে করিডোরে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিল— "ঈশ্বর, আমার ভুলগুলোর শাস্তি যেন আমার সন্তান না পায়।"

দীর্ঘ তিন ঘণ্টা পর ডাক্তার অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এলেন। তার মুখ গম্ভীর। আহিয়ান থরথর করে কাঁপছিল।

"আপনার স্ত্রী এখন শঙ্কামুক্ত," ডাক্তার বললেন। "কিন্তু বাচ্চাটা খুব প্রিম্যাচিউর। ওকে আমরা নিওন্যাটাল আইসিইউ-তে রেখেছি। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।"

আহিয়ান দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে কেঁদে ফেলল। সে বুঝতে পারল, তার অতীতের কোনো ছায়া এখনো তার পিছু ছাড়েনি।

আইসিইউ-র বাইরে নীল রঙের প্লাস্টিকের চেয়ারে আহিয়ান বসে আছে। তার দুচোখে গত চব্বিশ ঘণ্টায় এক ফোঁটা ঘুম নামেনি। কাঁচের ওপারে অসংখ্য নল আর যন্ত্রপাতির মাঝে শুয়ে আছে তার স্বপ্নের পৃথিবী—তার সদ্যোজাত মেয়ে। শিশুটি এতই ছোট যে আহিয়ানের হাতের তালুর সমান। ডাক্তাররা নাম দিয়েছেন ‘বেবি অব নীলাঞ্জনা’।

নীলাঞ্জনার জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। চোখ খুলেই সে অস্ফুট স্বরে বলল, "আহিয়ান সাহেব, আমার বৃষ্টি কোথায়?" আহিয়ান তার শিয়রে বসে মাথায় হাত রাখল। সে নিজের কান্না চেপে হাসার চেষ্টা করল। "ও ভালো আছে নীলা। আমাদের মেয়ে একদম তোমার মতো হয়েছে। ডাক্তাররা ওকে একটু বিশ্রামে রেখেছেন।"

নীলাঞ্জনা মায়ের মন দিয়ে সব বুঝে নিল। সে আহিয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "আমি জানি ও যুদ্ধ করছে। ও তো আপনার মেয়ে, ও হার মানবে না।"

সাত দিন পর যখন শিশুটির অবস্থা একটু স্থিতিশীল হলো, ডাক্তার প্রথমবারের মতো নীলাঞ্জনাকে অনুমতি দিলেন মেয়েকে কোলে নিতে। নার্স যখন ছোট্ট তুলোর মতো শিশুটিকে নীলাঞ্জনার বুকে রাখল, নীলাঞ্জনার মনে হলো তার সারা জীবনের সব দুঃখ এক নিমেষে ধুয়ে গেল।

"ওর নাম আমরা 'বৃষ্টি' রাখব," নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বলল। "কারণ বৃষ্টির রাতেই আমাদের শুরু হয়েছিল, আর আজ এই বৃষ্টির মতোই ও আমাদের জীবনটা ভিজিয়ে দিল।" আহিয়ান পাশ থেকে দেখছিল এই স্বর্গীয় দৃশ্য। সে মনে মনে অঙ্গীকার করল, যে শায়লা এই বিপত্তি ঘটিয়েছে, তাকে সে আর পৃথিবীর আলো দেখতে দেবে না—আইনগতভাবে।

আহিয়ান দয়া দেখানোর পাত্র নয়। সে এবার তার সব ক্ষমতা ব্যবহার করল। শায়লার পাঠানো সেই পার্সেল, হুমকির চিঠি এবং আগের সব ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নিয়ে সে সাইবার ক্রাইম বিভাগ ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করল।

পুলিশ যখন শায়লার বাড়িতে হানা দিল, সে তখন পরবর্তী চাল চালার পরিকল্পনা করছিল। হ্যান্ডকাফ পড়ার সময় শায়লার সেই দাম্ভিকতা ধুলোয় মিশে গেল। "আহিয়ান, তুমি এটা করতে পারো না! আমি তোমাকে ভালোবেসেছি!" শায়লা চিৎকার করে বলছিল। আহিয়ান শান্ত গলায় বলল, "তুমি কাউকে ভালোবাসনি শায়লা, তুমি শুধু নিজেকে ভালোবেসেছ। তোমার জায়গা এখন চার দেয়ালের ওপারে।"

শায়লার কারাদণ্ড হলো। আহিয়ানের জীবন থেকে এক বিষাক্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

এক মাস পর বৃষ্টিকে নিয়ে তারা বাড়িতে ফিরল। পুরো ফ্ল্যাটটি এখন ফুলে ফুলে সাজানো। রেহানা বেগম সারাক্ষণ নাতনিকে নিয়ে ব্যস্ত। আহিয়ান অফিস থেকে ফিরেই ল্যাপটপ ব্যাগ একপাশে ফেলে সরাসরি বৃষ্টির দোলনার কাছে চলে যায়।

তবে এর মাঝেও নীলাঞ্জনা একটা শূন্যতা অনুভব করছিল। সে একদিন আহিয়ানকে বলল, "আহিয়ান সাহেব, আমরা তো সুখে আছি। কিন্তু আমার সেই গ্রাম, সেই মেঠো পথ... ওখানকার শিশুদের জন্য আমার কিছু করার খুব ইচ্ছে।"

আহিয়ান নীলাঞ্জনার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এই মেয়েটি শুধু নিজের সুখে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো নয়। সে বলল, "তুমি যা করতে চাও করো নীলা। আমি তোমার পেছনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকব।"

নীলাঞ্জনা ঠিক করল সে তার বাবার দেওয়া সেই জমিতে একটি স্কুল তৈরি করবে। যেখানে গ্রামের মেয়েরা আধুনিক শিক্ষা পাবে, কিন্তু তাদের শিকড়কে ভুলে যাবে না। সে নিজের গয়না বিক্রি করতে চাইল, কিন্তু আহিয়ান তাকে থামিয়ে দিল।

"গয়না কেন? আমি এই প্রজেক্টের আর্কিটেক্ট হবো, আর আমার কোম্পানিই এর ফান্ডিং করবে। এটার নাম হবে 'নীলাঞ্জনা বিদ্যাপীঠ'।"

নীলাঞ্জনা আর আহিয়ান মিলে গ্রামের বাড়িতে গেল। মোস্তাফিজ সাহেব নাতনিকে কোলে নিয়ে খুশিতে আত্মহারা। গ্রামের মানুষ যখন শুনল এখানে স্কুল হবে, তারা স্বেচ্ছায় শ্রম দিতে রাজি হলো। কিন্তু সমস্যা তৈরি করল গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বররা। তারা চাইল না গ্রামের মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে তাদের অধিকার বুঝে নিক।

শুরু হলো এক নতুন যুদ্ধ। একদিকে আহিয়ানের আধুনিক চিন্তা ও নীলাঞ্জনার জেদ, অন্যদিকে রক্ষণশীল সমাজের অন্ধকার দেয়াল।

গ্রামের মাতব্বর হাশেম শিকদার কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না যে, তার এলাকায় একজন নারী স্কুল চালাবে। তিনি গ্রামের বাজারে রটিয়ে দিলেন, "শহরের মেম সাহেব এসে আমাদের মেয়েদের গোল্লায় নিয়ে যাবে।" স্কুলের কাজ শুরু হতেই রাতের অন্ধকারে ইটের স্তূপ সরিয়ে ফেলা হলো, কাজ করতে আসা রাজমিস্ত্রিদের হুমকি দেওয়া হলো।

নীলাঞ্জনা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে পরদিন সকালেই হাশেম শিকদারের বাড়ির উঠানে গিয়ে দাঁড়াল। আহিয়ান পাশে থাকতে চাইলেও নীলাঞ্জনা বলল, "না আহিয়ান সাহেব, এই লড়াইটা আমার মাটির। আমাকে একাই লড়তে দিন।"

নীলাঞ্জনা দৃঢ় কণ্ঠে হাশেম শিকদারকে বলল, "চাচা, আমি আপনাদের সন্তানদের হাতে বই তুলে দিতে চাই, অস্ত্র নয়। আপনার নাতনি যদি কাল ডাক্তার হয়ে আপনার চিকিৎসা করে, তাতে কি আপনার সম্মান বাড়বে না কমবে?" নীলাঞ্জনার যুক্তির সামনে মাতব্বরের অহংকার কিছুটা নড়ে উঠল। গ্রামবাসী আড়ালে দাঁড়িয়ে এক সাহসী নারীর প্রতিবাদ দেখল।

বাধা কাটতে শুরু করল। আহিয়ান নিজেই নকশা করল এমন এক স্কুলের, যা দেখতে একদম মফস্বলের বাড়ির মতো—যাতে শিশুরা ভয় না পায়। চারদিকে বড় বড় বারান্দা আর বসার জায়গা। বৃষ্টির বয়স এখন ছয় মাস। সে যখন তার বাবার কোলে বসে প্রথমবার খিলখিল করে হেসে উঠল, তখন মনে হলো পুরো স্কুলে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।

আহিয়ান অফিস আর গ্রামের প্রজেক্ট—এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, কিন্তু নীলাঞ্জনার হাসিমুখ দেখলে তার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। এরই মধ্যে স্কুলের প্রথম ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হলো। নীলাঞ্জনা নিজ হাতে প্রথম ইট গেঁথেছিল, আর আহিয়ান সেই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করে রাখল।

স্কুল তৈরির কাজ চলার মাঝেই আহিয়ানের ওপর ঢাকা থেকে প্রচণ্ড চাপ আসতে লাগল। তার কোম্পানি একটি আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট পেয়েছে, যার জন্য তাকে তিন মাসের জন্য দেশের বাইরে যেতে হতে পারে। আহিয়ান দোটানায় পড়ে গেল। একদিকে তার ক্যারিয়ারের সেরা সুযোগ, অন্যদিকে নীলাঞ্জনা আর সদ্যজাত বৃষ্টি।

নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল আহিয়ানের মনের অবস্থা। সে রাতে ছাদে বসে আহিয়ানের হাত ধরে বলল, "আপনি যান আহিয়ান সাহেব। আপনি তো আমার আকাশ, আপনাকে ডানা মেলতে বাধা দিলে আমারই কষ্ট হবে। বৃষ্টির আর আমার দায়িত্ব বাবা আর গ্রামবাসী নেবে।"

আহিয়ানের চোখে জল এল। সে বুঝতে পারল, সে এমন একজন জীবনসঙ্গিনী পেয়েছে যে শুধু ভালোবাসা নয়, ত্যাগের মাহাত্ম্যও বোঝে।

আহিয়ান চলে যাওয়ার দিনটি ছিল খুব মেঘলা। বৃষ্টির কান্না যেন থামছিলই না। এয়ারপোর্টে বিদায় জানানোর সময় আহিয়ান শুধু একটা কথা বলল, "নীলা, এই তিন মাস আমার জীবনের সবচেয়ে লম্বা সময় হতে চলেছে। নিজের খেয়াল রেখো।"

আহিয়ান যাওয়ার পর নীলাঞ্জনা এক অদ্ভূত একাকীত্বে ডুবে গেল। বিশাল বাড়িটা তাকে গিলে খেতে আসত। কিন্তু সে ভেঙে পড়ল না। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সে স্কুলের তদারকি করত, আর রাতে বৃষ্টিকে বুকে নিয়ে আহিয়ানের পুরনো শার্টের ঘ্রাণ নিত। সে ডায়েরিতে লিখতে শুরু করল এক নতুন অধ্যায়— ‘অপেক্ষার কাব্য’।

আহিয়ান বিদেশে থাকার সুযোগে শায়লার কিছু পুরনো লোক আবার সক্রিয় হয়ে উঠল। একদিন নীলাঞ্জনার কাছে একটি বেনামী চিঠি এল। তাতে লেখা ছিল, "আহিয়ান বিদেশে একা নেই, তার সাথে নতুন কেউ আছে। তুমি এখানে মাটি কামড়ে পড়ে আছ, আর সে ওখানে জীবন উপভোগ করছে।"

নীলাঞ্জনা চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলল। সে জানে বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না, কিন্তু তাদের বিশ্বাসের ভিত এখন অনেক মজবুত। তবুও গভীর রাতে যখন বৃষ্টি ঘুমিয়ে পড়ে, নীলাঞ্জনার মনে হতো— এই আধুনিক পৃথিবী কি সত্যিই অনেক নিষ্ঠুর? সে আহিয়ানকে ফোন করল না, বরং নিজের কাজের গতি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল।

নীলাঞ্জনা চিঠির কথা কাউকে জানাল না, এমনকি আহিয়ানকেও নয়। সে জানত, আহিয়ান এখন দেশের বাইরে একটা বড় প্রজেক্টে লড়ছে; তাকে এই বিষাক্ত খবরে অস্থির করা ঠিক হবে না। কিন্তু রাতের নির্জনতায় শায়লার সেই পুরনো স্মৃতিগুলো যেন দেয়ালের ছায়া হয়ে তাকে তাড়া করত।

পরদিন সকালেই নীলাঞ্জনা দ্বিগুণ উৎসাহে স্কুলের কাজে নেমে পড়ল। গ্রামের মহিলারা এখন তাকে 'বড় আপা' বলে ডাকে। তারা দেখল, তাদের মতো এক সাধারণ মেয়ে হয়েও নীলাঞ্জনা কী অসাধ্য সাধন করছে। নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সেরা প্রতিশোধ হলো নিজের সাফল্যে অটল থাকা।

বিদেশের ব্যস্ততার মাঝেও আহিয়ান প্রতিদিন নিয়ম করে ভিডিও কলে বৃষ্টিকে দেখে। কিন্তু নীলাঞ্জনা লক্ষ্য করল, আহিয়ানের চোখেমুখে ক্লান্তি। একদিন হুট করেই নীলাঞ্জনার ঠিকানায় একটা কুরিয়ার এল। কোনো ডিজিটাল মেসেজ নয়, হাতে লেখা একটা দীর্ঘ চিঠি।

আহিয়ান লিখেছে— "নীলা, এখানে কাঁচের দেয়াল ঘেরা বিশাল অট্টালিকা আছে, কিন্তু তোমার মতো স্নিগ্ধতা নেই। আমি জানি তোমাকে একা ফেলে আসাটা আমার অন্যায় হয়েছে, কিন্তু আমি শুধু আমাদের বৃষ্টির জন্য একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চাই। বিশ্বাস রেখো, আমার প্রতিটি নিশ্বাসে শুধু তোমার আর বৃষ্টির নাম লেখা।"

নীলাঞ্জনা চিঠিটা বুকের কাছে জাপটে ধরল। বেনামী চিঠির সেই কালো মেঘ মুহূর্তেই কেটে গেল।

তিন মাস পর আহিয়ান যেদিন ফিরল, সেদিনই ছিল স্কুলের উদ্বোধন। পুরো গ্রাম উৎসবের সাজে সেজেছে। হাশেম শিকদার নিজেই গেটে তোরণ বানিয়েছেন। আহিয়ান গাড়ি থেকে নামতেই বৃষ্টি 'বাবা বাবা' বলে আধো বুলিতে চিৎকার করে উঠল। আহিয়ান মেয়েকে কোলে নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল।

ফিতা কাটার সময় আহিয়ান কাঁচিটা নীলাঞ্জনার হাতে দিল। "এই স্বপ্ন তোমার নীলা, সম্মানটাও তোমার হওয়া উচিত।" নীলাঞ্জনা ফিতা কাটল, আর সাথে সাথে শত শত গ্রাম্য শিশুর করতালিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হলো। সেই মুহূর্তে নীলাঞ্জনা অনুভব করল, তার জীবনের সার্থকতা কোনো দামী ফ্ল্যাটে নয়, বরং এই ছোট ছোট শিশুদের হাসিতে।

স্কুলটি দারুণভাবে চলতে শুরু করল। কিন্তু নীলাঞ্জনার এই সাফল্য অনেকের চোখে বালি হয়ে দাঁড়াল। শহরের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি চাইল স্কুলের জমিটা দখল করে সেখানে রিসোর্ট বানাতে। তারা আহিয়ানের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করল।

একদিন রাতে একদল লোক এসে স্কুলের জানালায় ঢিল ছুঁড়ে কাঁচ ভেঙে দিয়ে গেল। দেওয়ালে কুরুচিপূর্ণ কথা লিখে রাখা হলো। নীলাঞ্জনা সকালে স্কুলে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। আহিয়ান শক্ত হয়ে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, এবার তাকে স্থপতির কলম ছেড়ে আইনি লড়াইয়ের তলোয়ার ধরতে হবে।

গ্রামের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে আহিয়ান সিদ্ধান্ত নিল সে আর ঢাকা ফিরবে না। সে তার আর্কিটেকচারাল ফার্মের একটা শাখা এই গ্রামেই খুলবে। "নীলা, শহর আমাদের অনেক দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে শান্তি। আমি ঠিক করেছি আমরা এখানেই থাকব। আমি এই গ্রামকে একটা মডেল গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলব।"

নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে আহিয়ানের দিকে তাকাল। একজন প্রতিষ্ঠিত স্থপতি সব ছেড়ে গ্রামে চলে আসবে? আহিয়ান হাসল। "যেখানে আমার শিকড় আর আমার ভালোবাসা আছে, সেখানেই আমার সাম্রাজ্য।"

সেদিন রাতে দিঘির পাড়ে বসে তারা দুজন নতুন জীবনের পরিকল্পনা করল। বৃষ্টি তখন ঘাসের ওপর ছোট ছোট পায়ে হাঁটার চেষ্টা করছে। জীবনের এক থেকে পঁয়তাল্লিশ অধ্যায়ের পথ চলায় তারা শিখেছে— ভালোবাসা মানে শুধু একে অপরকে পাওয়া নয়, ভালোবাসা মানে একসাথে মিলে অন্যের জন্য কিছু করা।

আহিয়ানের সিদ্ধান্তে সবাই চমকে গেলেও নীলাঞ্জনার চোখে ছিল কৃতজ্ঞতার জল। গ্রামের বাড়িতে এখন লোক সমাগম লেগেই থাকে। বৃষ্টির বয়স এখন তিন বছর। সে তার ছোট ছোট পায়ে পুরো স্কুল প্রাঙ্গণ মাতিয়ে রাখে। আহিয়ান তার অফিসের জন্য পুরনো আমলের কাছারি ঘরটাকেই বেছে নিয়েছে। সে এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিদেশের কাজগুলো গ্রাম থেকেই তদারকি করে।

একদিন সকালে বৃষ্টি তার বাবার ড্রয়িং করা ম্যাপের ওপর রং পেন্সিল দিয়ে হিজিবিজি এঁকে দিল। আহিয়ান রেগে যাওয়ার বদলে হেসে বলল, "দেখো নীলা, আমাদের মেয়ে ছোটবেলা থেকেই আর্কিটেক্ট হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে!" নীলাঞ্জনা পাশ থেকে হেসে বলল, "ও আর্কিটেক্ট হোক আর না হোক, মানুষ যেন আপনার মতো দয়ালু হয়।"

গ্রামের জীবন যতটা শান্ত মনে হয়েছিল, বাস্তবতা ছিল তার চেয়ে কঠিন। স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব করার সিদ্ধান্ত নিল নীলাঞ্জনা। কিন্তু গ্রামের অভিভাবকরা ভয় পেলেন, "ইন্টারনেট পেয়ে ছেলেমেয়েরা বিগড়ে যাবে না তো?"

আহিয়ানকে এবার শিক্ষক হতে হলো। সে বড় প্রজেক্টর লাগিয়ে গ্রামবাসীকে দেখাল কীভাবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কৃষি কাজ এবং পড়াশোনায় উন্নতি করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে গ্রামের মাটির মেলবন্ধন ঘটানোই ছিল তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, শুধু বিল্ডিং বানালেই স্কুল হয় না, মানুষের মনের অন্ধকার দূর করাটাই আসল কাজ।

সবকিছু যখন ছন্দময় চলছিল, ঠিক তখনই বৃষ্টির খুব জ্বর এল। গ্রামে কোনো বড় হাসপাতাল নেই। মধ্যরাতে বৃষ্টির শরীর যখন আগুনের মতো পুড়ছে এবং সে জ্ঞান হারাল, আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা দিশেহারা হয়ে পড়ল। সেই মেঘলা অন্ধকার রাতে আহিয়ান গাড়ি নিয়ে শহরের দিকে ছুটল।

পেছনের সিটে নীলাঞ্জনা বৃষ্টিকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। "আহিয়ান সাহেব, দ্রুত চালান! আমার বৃষ্টির কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচব না।" আহিয়ান তখন বুঝতে পারল, গ্রামে থাকার সিদ্ধান্তটা যতটা রোমান্টিক ছিল, বাস্তবতায় সেটা ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। সেই রাতেই তারা দুজনে এক নতুন সংকল্প করল—গ্রামে শুধু স্কুল নয়, একটি ছোট হেলথ কমপ্লেক্সও গড়ে তুলতে হবে।

বৃষ্টি সুস্থ হয়ে ফেরার পর আহিয়ান তার শহরের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করল। সে তার জমানো টাকার একটা বড় অংশ এবং তার স্থপতি বন্ধুদের সহায়তায় গ্রামের জন্য একটি আধুনিক 'ম্যাটারনিটি ও চাইল্ড কেয়ার সেন্টার' গড়ার ঘোষণা দিল।

গ্রামের মানুষগুলো যারা আগে নীলাঞ্জনাকে শুধু 'বউমা' হিসেবে দেখত, তারা এখন তাকে 'মা' বলে ডাকতে শুরু করল। নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, মাতৃত্ব শুধু নিজের সন্তানের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য মমতা বিলিয়ে দেওয়ার নাম।

রাত তখন পৌনে তিনটা। বৃষ্টির জ্বর এবং একনাগাড়ে কান্নায় নীলাঞ্জনা বিধ্বস্ত। আহিয়ানের পরের দিন বড় মিটিং। ক্লান্তি আর বিরক্তি থেকে দুজনের মধ্যে প্রচণ্ড কথা কাটাকাটি হলো। নীলাঞ্জনা কাঁদছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আহিয়ানই মেয়েকে কোলে নিল, গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াল। ভোরের আলোয় আহিয়ান যখন নীলাঞ্জনার গায়ে পশমী চাদর জড়িয়ে দিল, তখন তাদের মান-অভিমান সব ধুয়ে গেল। তারা বুঝল, সন্তান লালন-পালন কোনো একক দায়িত্ব নয়, এটি দুজনের ধৈর্যের এক কঠিন পরীক্ষা।

সময় দ্রুত গড়িয়ে যায়। আজ বৃষ্টির জীবনের একটি বিশেষ দিন। সে আজ তারই মায়ের গড়া স্কুলে প্রথমবার ছাত্রী হিসেবে যাচ্ছে। নীলাঞ্জনা তার মেয়ের হাতে নতুন বই আর পেন্সিল বক্স তুলে দিল। আহিয়ান বৃষ্টির জন্য একটা ছোট নীল স্কুল ব্যাগ কিনে এনেছে।

স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি যখন তার ছোট্ট হাত নেড়ে বিদায় নিল, নীলাঞ্জনার মনে হলো তার জীবনের একটি বৃত্ত পূর্ণ হলো। সে আহিয়ানের হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, "মনে আছে আহিয়ান সাহেব, আপনি বলেছিলেন এই স্কুল আমার স্বপ্ন? আজ দেখুন, আমাদের মেয়েই সেই স্বপ্নের প্রথম যাত্রী।"

বৃষ্টির স্কুল যাওয়া শুরু হওয়ার পর নীলাঞ্জনা নিজেকে আরও বেশি ব্যস্ত করে তুলল। হেলথ সেন্টারের জন্য সে ঢাকা থেকে বড় ডাক্তারদের আনার ব্যবস্থা করল। অন্যদিকে, আহিয়ানের ‘ভিলেজ আর্কিটেকচার’ মডেলটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেল। ইউরোপের একটি বড় ম্যাগাজিন থেকে তার ইন্টারভিউ নিতে লোক এল এই প্রত্যন্ত গ্রামে।

আহিয়ান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত। তাকে প্রায়ই ভিডিও কনফারেন্স আর মিটিংয়ে ডুবে থাকতে হয়। নীলাঞ্জনা লক্ষ্য করল, তারা একই বাড়িতে থাকলেও আগের মতো দীর্ঘ কথোপকথন আর হয় না। ডিনার টেবিলটাও এখন ল্যাপটপ আর ফোনের দখলে। নীলাঞ্জনার মনে সেই পুরনো ভয়টা আবার উঁকি দিতে লাগল—সাফল্য কি তবে মানুষের মাঝখানের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়?

এক রাতে বৃষ্টির জন্মদিনের আয়োজনে আহিয়ান আসতে অনেক দেরি করল। শহর থেকে ফেরার পথে বৃষ্টি আর জ্যামের অজুহাতে সে যখন বাড়ি পৌঁছাল, তখন বৃষ্টি ঘুমিয়ে পড়েছে। নীলাঞ্জনা অন্ধকার ড্রয়িংরুমে বসে ছিল।

"সরি নীলা, একটা ইম্পর্ট্যান্ট ডিল ছিল," আহিয়ান টাই খুলতে খুলতে বলল। নীলাঞ্জনা শান্ত গলায় বলল, "ডিল তো সব দিনই থাকে আহিয়ান সাহেব। কিন্তু মেয়ের চার বছরের জন্মদিন তো আর ফিরে আসবে না। আপনি কি সত্যিই গ্রামের শান্তির জন্য শহর ছেড়েছিলেন, নাকি শহরটাকে ল্যাপটপে ভরে গ্রামে নিয়ে এসেছেন?"

আহিয়ান কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে বুঝতে পারল, সে আবার সেই যান্ত্রিকতার চক্রে আটকে যাচ্ছে। সে তার পুরনো গ্রাম্য রেকর্ড প্লেয়ারটা বাজাতে চাইল, কিন্তু দেখল সেটা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। ঠিক তাদের সম্পর্কের মতো।

পরদিন দুপুরে যখন স্কুলে ক্লাস চলছিল, হঠাৎ লাইব্রেরির কোণ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেল। শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো স্কুলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। নীলাঞ্জনা পাগলের মতো বাচ্চাদের বের করার চেষ্টা করছিল।

বৃষ্টি তখন দোতলার আর্ট রুমে ছিল। আগুন সিঁড়ির দিকে ছড়িয়ে পড়ায় সে আটকা পড়ে গেল। খবর পেয়ে আহিয়ান অফিস থেকে পাগলের মতো ছুটে এল। সে কাউকে পরোয়া না করে আগুনের লেলিহান শিখার ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

মিনিট দশেক পর আহিয়ান যখন বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে বের হয়ে এল, তার হাত আর পিঠের অনেকটা অংশ পুড়ে গেছে। নীলাঞ্জনা বৃষ্টিকে জাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। সে বুঝল, যে মানুষটি তার সন্তানের জন্য জীবন দিতে পারে, তার প্রতি অভিমান করাটা কত বড় বিলাসিতা।

হাসপাতালে আহিয়ানের চিকিৎসার সময় নীলাঞ্জনা এক মুহূর্তের জন্যও তার পাশ থেকে সরেনি। আহিয়ানের ব্যান্ডেজ করা হাতের ওপর মাথা রেখে নীলাঞ্জনা সারারাত জেগে রইল।

"কেন গেলে ওভাবে? যদি কিছু হয়ে যেত?" নীলাঞ্জনা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আহিয়ান তার অক্ষত হাতটা দিয়ে নীলাঞ্জনার চুল সরিয়ে দিয়ে বলল, "আমার তৈরি ইমারত পুড়ে ছাই হতে পারে নীলা, কিন্তু আমার তৈরি সংসার আমি পুড়তে দিতে পারি না। এই পোড়া দাগগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেবে—কাজ নয়, তোমরাই আমার আসল পৃথিবী।"

স্কুলের একটা অংশ পুড়ে গেলেও গ্রামবাসী এবং আহিয়ানের বন্ধুরা মিলে তা আবার মেরামত করার কাজে নেমে পড়ল। এবার স্কুলটি আরও আধুনিক এবং অগ্নি-নিরাপদভাবে তৈরি করা হলো।

আহিয়ান সুস্থ হওয়ার পর একটা বড় সিদ্ধান্ত নিল। সে তার কোম্পানির প্রধান দায়িত্ব তার ছোট বোনকে বুঝিয়ে দিয়ে নিজে শুধু 'কনসালট্যান্ট' হিসেবে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। সে এখন দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে গ্রামের ছেলেদের স্থাপত্য আর কারিগরি বিদ্যা শেখাতে। সে চায় না আর কোনো বাবার স্বপ্ন আগুনের গ্রাসে হারিয়ে যাক।

সময় কাউকে থামিয়ে রাখে না। দেখতে দেখতে বৃষ্টির বয়স এখন দশ। সে এখন শুধু বাবার আদরের মেয়ে নয়, বরং নীলাঞ্জনার স্কুলের একজন কনিষ্ঠ মেন্টর। সে গ্রামের ছোট ছোট মেয়েদের ছবি আঁকা শেখায়।

বৃষ্টি একদিন তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, "বাবা, মা তো মফস্বলের মেয়ে হয়েও এত বড় কাজ করল। আমি কি পারব মায়ের মতো হতে?" আহিয়ান হাসল। "মা, তুমি তোমার মায়ের মতো নও, তুমি তোমার মতো হবে। তবে মনে রেখো, পা মাটিতে রেখে আকাশ ছোঁয়ার শিক্ষাটা যেন তোমার ভেতরে থাকে।"

বৃষ্টির বয়স এখন তেরো। সে এখন বেশ চটপটে এক কিশোরী। একদিন বৃষ্টির দুপুরে সে বাড়ির পুরনো স্টোর রুমে কিছু একটা খুঁজছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি কাঠের পুরনো সিন্দুক। ধুলোমাখা সেই সিন্দুকটি খুলতেই সে খুঁজে পেল একটি নীল মলাটের ডায়েরি—নীলাঞ্জনার সেই স্মৃতিবিজড়িত ডায়েরি।

বৃষ্টি পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আহিয়ান আর নীলাঞ্জনার সেই প্রথম দেখা, মান-অভিমান আর সংগ্রামের কথা জানতে পারল। সে অবাক হয়ে দেখল, তার বাবা-মায়ের জীবন কোনো সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। সে ডায়েরিটা নিয়ে সরাসরি তার মায়ের কাছে গেল।

"মা, তুমি কি সত্যিই গ্রামের সেই সাধারণ মেয়ে ছিলে, যাকে বাবা বৃষ্টির রাতে খুঁজে পেয়েছিল?" বৃষ্টির প্রশ্নে নীলাঞ্জনা মুচকি হাসল। সে বৃষ্টিকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, "মা, সাধারণ মানুষের জীবনেই সবচেয়ে বড় বড় অসাধারণ গল্প লুকিয়ে থাকে।"

সবকিছু ভালো চললেও গ্রামের সেই পুরনো রাজনৈতিক রেষারেষি আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। হাশেম শিকদারের ছেলে শওকত শহর থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিরেছে। সে চায় স্কুলের পাশে একটা বড় ইটভাটা তৈরি করতে। কিন্তু নীলাঞ্জনা আর আহিয়ান এর ঘোর বিরোধী। কারণ ইটভাটার ধোঁয়া স্কুলের বাচ্চাদের আর গ্রামের পরিবেশের চরম ক্ষতি করবে।

শওকত হুমকি দিয়ে গেল, "চৌধুরী সাহেব, আপনি শহরের মানুষ, শহরেই ফিরে যান। আমাদের ব্যবসায় বাধা দিলে ফল ভালো হবে না।" আহিয়ান শান্তভাবে উত্তর দিল, "আমি এখন আর শহরের মানুষ নই শওকত। এই মাটি আমার, আর এর সুরক্ষার দায়িত্বও আমার।"

শওকত এবার অন্য পথ ধরল। সে স্কুলের জমি সংক্রান্ত কিছু পুরনো ভুয়া কাগজ তৈরি করে আদালতে মামলা করে দিল। স্কুলের কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। গ্রামের কিছু লোক যারা শওকতের কাছে ঋণী, তারা নীলাঞ্জনার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করল।

নীলাঞ্জনা এবার রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করল। সে গ্রামের নারীদের নিয়ে এক সভা ডাকল। "আপনারা কি চান আপনাদের সন্তানদের ফুসফুস কালো ধোঁয়ায় ভরে যাক? নাকি চান তারা খোলা বাতাসে পড়াশোনা করুক?" নীলাঞ্জনার ডাকে সাড়া দিল গ্রামের শত শত নারী। তারা লাঠি আর ঝাড়ু নিয়ে ইটভাটার ট্রাকগুলোকে আটকে দিল। নারী শক্তির এই গণজাগরণ দেখে শওকত পিছু হটতে বাধ্য হলো।

লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন একদিন আহিয়ানের নামে একটি বড় পার্সেল এল। পার্সেলটি পাঠিয়েছে সেন্ট্রাল জেল থেকে। ভেতরে ছিল একটি ছোট চিঠি আর একটি পুরনো সোনার হার। চিঠিটি শায়লার। সে এখন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জেলের হাসপাতালে শেষ দিনগুলো গুনছে।

সে লিখেছে— "আহিয়ান, আমি তোমাদের অনেক ক্ষতি করেছি। কিন্তু আজ মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে সব ঘৃণা মুছে গেছে। এই হারটি আমি বৃষ্টির জন্য পাঠালাম। যদি পারো আমাকে ক্ষমা করে দিও।" আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা একে অপরের দিকে তাকাল। জীবনের এই পর্যায়ে এসে তারা বুঝল, ক্ষমা করার মাঝেই আসল মুক্তি। তারা সিদ্ধান্ত নিল শায়লাকে শেষবারের মতো একবার দেখে আসবে।

আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা যখন জেলে পৌঁছাল, তখন শায়লা প্রায় নিথর। সে অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে আহিয়ানকে দেখে ম্লান হাসল। সে তার হাতটা বাড়িয়ে দিলে নীলাঞ্জনা সেই হাত ধরল। কোনো কথা হলো না, শুধু চোখের জলে সব পুরনো তিক্ততা ধুয়ে গেল।

শহর থেকে ফেরার পথে আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা অনেকক্ষণ চুপ ছিল। তারা বুঝল, ঘৃণা আর হিংসা মানুষকে ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই দেয় না। এই সফরের পর তাদের ভালোবাসা যেন আরও গভীর হলো।

সময় দ্রুত পার হয়ে গেল। বৃষ্টি এখন এইচএসসি পাশ করেছে। সে ঢাকার একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আহিয়ান খুব খুশি, কিন্তু নীলাঞ্জনার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। যে মেয়েকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করেনি, সে এখন এই মায়াময় গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাবে?

যাত্রার দিন সকালে বৃষ্টি তার মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। "মা, আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, আমি পড়াশোনা শেষ করে এই গ্রামেই ফিরে আসব। বাবার মতো আমিও এই মাটির সেবা করব।"

নীলাঞ্জনা কান্না চেপে হাসল। সে তার সেই নীল ডায়েরিটা বৃষ্টির হাতে তুলে দিল। "এটা এখন তোর কাছে রাখ মা। জীবনের পথ চলতে গিয়ে যদি কখনো নিজেকে হারিয়ে ফেলিস, তবে এই পাতাগুলো তোকে দিশা দেখাবে।"

বৃষ্টি চলে যাওয়ার পর বিশাল বাড়িটা যেন এক নিঝুম দ্বীপে পরিণত হলো। আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা আবার সেই আগের মতো একা হয়ে গেল, ঠিক যেমনটা পঁচিশ বছর আগে ছিল। কিন্তু এখন তাদের চুলে পাক ধরেছে, চোখে চশমা উঠেছে।

নীলাঞ্জনা সকালে উঠে অভ্যাসবশত বৃষ্টির ঘরে যায়, জানালটা খুলে দেয়। তারপর মনে পড়ে মেয়ে তো এখন ঢাকার হোস্টেলে। আহিয়ান তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, "নীলা, পাখিরা বড় হলে তো ডানা মেলবেই। আমরা তো চেয়েছিলাম ও আকাশ ছুঁক।"

আহিয়ান এখন আর আগের মতো দৌড়ঝাঁপ করতে পারে না। সে বেশিরভাগ সময় বাগানে কাটায়। নীলাঞ্জনা এখনো স্কুল আর হেলথ সেন্টারের দেখভাল করে। তবে প্রতি শুক্রবারে তারা মোবাইলের স্ক্রিনে বৃষ্টির হাসিমুখ দেখে এক সপ্তাহ বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পায়।

ঢাকায় বৃষ্টির জীবনটা একদম আলাদা। চারদিকে ইট-পাথরের জঙ্গল আর যান্ত্রিকতা। হোস্টেলের ছোট রুমে বসে সে যখন তার মায়ের ডায়েরিটা পড়ে, তখন তার মনে হয় সে যেন সেই বৃষ্টির রাতের ঘ্রাণ পাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃষ্টির পরিচয় হয় আরিয়ান নামের এক সহপাঠীর সাথে। আরিয়ান মেধাবী কিন্তু খুব উদ্ধত। একদিন আর্কিটেকচারাল ডিজাইনের ক্লাসে আরিয়ান বৃষ্টির নকশাকে 'ব্যাকডেটেড' বলে উপহাস করল। "এই গ্রাম্য নকশা দিয়ে আধুনিক শহর চলে না বৃষ্টি," আরিয়ান বলেছিল। বৃষ্টি শান্ত গলায় উত্তর দিল, "শহর মানে শুধু কংক্রিট নয় আরিয়ান, শহর মানে মানুষের বসবাসের যোগ্য এক টুকরো আশ্রয়। যেখানে বাতাস চলাচলের জায়গা নেই, সেখানে প্রাণ থাকে না।"

বৃষ্টির এই দৃঢ়তা দেখে আরিয়ান অবাক হলো। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটি শুধু পড়াশোনা করতে আসেনি, সে একটা দর্শন নিয়ে এসেছে।

গ্রামের শান্ত জীবনে হঠাৎ ঝড় নেমে এল। আহিয়ান একদিন বাগানে কাজ করতে করতে হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ল। হার্ট অ্যাটাক। নীলাঞ্জনা মুহূর্তের জন্য দিশেহারা হয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিল। তার নিজের গড়া হেলথ সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত চলে এল।

খবর পেয়ে বৃষ্টি ঢাকা থেকে ছুটে এল। হাসপাতালের করিডোরে নীলাঞ্জনা আর বৃষ্টি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। ডাক্তার যখন কেবিন থেকে বের হয়ে বললেন, "অপারেশন সাকসেসফুল, তবে ওনাকে এখন খুব সাবধানে রাখতে হবে," তখন তারা শান্ত হলো।

আহিয়ান চোখ মেলে যখন নীলাঞ্জনা আর বৃষ্টিকে পাশে দেখল, সে দুর্বল স্বরে বলল, "আমি ঠিক আছি। তোরা আছিস না আমার পাশে?"

আহিয়ানের অসুস্থতার কারণে বৃষ্টি সিদ্ধান্ত নিল সে আর হোস্টেলে ফিরবে না। সে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাবে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় গ্রাম থেকেই কাজ করবে। আরিয়ান তার সাথে দেখা করতে গ্রামে এল।

গ্রামের পরিবেশ, নীলাঞ্জনার স্কুল আর আহিয়ানের ডিজাইন করা বাড়িগুলো দেখে আরিয়ানের ভুল ভেঙে গেল। সে বুঝতে পারল, আধুনিক স্থাপত্যের আসল সার্থকতা প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকায়। আরিয়ান বৃষ্টির কাছে ক্ষমা চাইল এবং তারা দুজনে মিলে একটি নতুন প্রজেক্টের পরিকল্পনা করল— ‘সবুজ আবাসন’।

আহিয়ান আর নীলাঞ্জনার বিয়ের ২৫ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। বৃষ্টি আর আরিয়ান মিলে এক বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করল। পুরো গ্রামকে দাওয়াত দেওয়া হলো। সেই পুরনো দিঘির পাড় আলোকসজ্জায় সাজানো হলো।

আহিয়ান নীলাঞ্জনার জন্য শহর থেকে একটি দামী নীল শাড়ি আনিয়েছে। সেই শাড়ি পরে নীলাঞ্জনা যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, আহিয়ান তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। "তোমাকে এখনো ঠিক সেই বৃষ্টির রাতের মতোই সুন্দর লাগছে নীলা," আহিয়ান ফিসফিস করে বলল। নীলাঞ্জনা হাসল, "আর আপনিও সেই হারানো পথিকের মতোই এখনো আমার হৃদয়ে পথ খুঁজছেন।"

বৃষ্টি আর আরিয়ানের বিয়ে হলো খুব ছিমছামভাবে। তারা দুজনেই স্থপতি হিসেবে এখন নাম করেছে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা গ্রামেই থাকবে এবং এই পুরো অঞ্চলকে একটি 'ইকো-ভিলেজ' হিসেবে গড়ে তুলবে।

নীলাঞ্জনা এখন স্কুলের প্রধান উপদেষ্টা। সে এখন আর ডায়েরি লেখে না, বরং সে গ্রামের ছোট ছোট মেয়েদের ডায়েরি লিখতে উৎসাহিত করে। সে তাদের বলে, "নিজের জীবনের গল্প নিজেই লিখবে, যাতে কেউ তোমার গল্পের কলম কেড়ে নিতে না পারে।"

বিকেলবেলা। সূর্যটা দিগন্তের ওপারে টুপ করে ডুবে যাচ্ছে। দিঘির পাড়ে ইজিচেয়ারে বসে আছে আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা। সামনে ঘাসের ওপর বৃষ্টির ছোট ছেলে 'নীল' খেলছে।

আহিয়ান নীলাঞ্জনার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। "নীলা, আমাদের এই জার্নিটা যদি আবার শুরু করতে হতো, তুমি কি আবার সেই বৃষ্টির রাতে দরজা খুলতে?" নীলাঞ্জনা আহিয়ানের কাঁধে মাথা রাখল। "আমি হাজারবার সেই দরজা খুলতাম। কারণ ওই বৃষ্টির ওপারেই তো আমার নীল দিগন্ত অপেক্ষা করছিল।"

দূরে কোথাও থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে। পাখির দল নীড়ে ফিরছে। জীবনের সব ঝড়-ঝাপটা, অবিশ্বাস আর ষড়যন্ত্র পেরিয়ে এই বৃদ্ধ দম্পতি এখন এক চরম প্রশান্তির আশ্রয়ে। তাদের গল্প শেষ হয়নি, তাদের গল্প এখন বেঁচে আছে বৃষ্টির নকশায়, নীল-এর হাসিতে আর ওই মাটির স্কুলের প্রতিটি ইটে।

বৃষ্টির ছেলে 'নীল'-এর বয়স এখন পাঁচ বছর। সে পুরো বাড়ি মাথায় করে রাখে। আহিয়ান এখন পুরোপুরি অবসর নিয়েছেন, কিন্তু তার নাতনিকে তিনি স্থপতিবিদ্যার প্রাথমিক পাঠ দেন মাটির ওপর কাঠি দিয়ে নকশা এঁকে। নীল-এর হাতে আহিয়ান একটি ছোট কম্পাস তুলে দেন, ঠিক যেমনটা তিনি এক সময় হাতে ধরতেন।

বৃষ্টি এবং আরিয়ান মিলে গ্রামে একটি বিশাল লাইব্রেরি ও কালচারাল সেন্টার গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। তারা চায় গ্রামের প্রতিটি শিশু যেন বিশ্বসাহিত্যের সাথে পরিচিত হতে পারে। এই প্রজেক্টের নাম দেওয়া হয় ‘নীল দিগন্ত’।

হাশেম শিকদারের ছেলে শওকত, যে এক সময় ক্ষতি করতে চেয়েছিল, সে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নীলাঞ্জনার কাছে আসে। তবে এবার লড়াই করতে নয়, ক্ষমা চাইতে। সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে এবং নিজের সব জমি স্কুলের নামে দান করে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে।

আহিয়ান শুরুতে রাজি না হলেও নীলাঞ্জনা তাকে বোঝায়। তারা শওকতকে ক্ষমা করে দেয় এবং তাকে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে। গ্রামে এক অদ্ভূত সম্প্রীতির আবহাওয়া তৈরি হয়।

আগামী কয়েক বছরে গ্রামটি পুরো দেশের জন্য একটি মডেল গ্রামে পরিণত হয়। বিদেশী পর্যটকরা আসতে শুরু করে এই পরিবেশবান্ধব গ্রামটি দেখতে। নীলাঞ্জনা ও আহিয়ানকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয় তাদের সামাজিক অবদানের জন্য।

একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিতে বৃষ্টিকে লন্ডনে যেতে হয়। এবার আর নীলাঞ্জনা কাঁদেনি, বরং সে গর্বের সাথে মেয়েকে বিদায় জানায়। সে বুঝতে পারে, তার মেয়ে এখন শুধু তার নয়, সে পুরো দেশের সম্পদ।

বৃষ্টি যাওয়ার পর আহিয়ান আবার সেই পুরনো ডায়েরিটা পড়তে শুরু করেন। তিনি ভাবেন, জীবনের চড়াই-উতরাই না থাকলে হয়তো ভালোবাসার এই গভীরতা তিনি কোনোদিন পেতেন না।

আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা এখন অনেকটাই দুর্বল। তারা বিকেলবেলা দিঘির পাড়ে বসে ছোটবেলার গল্প করেন। তারা ঠিক করেন, তাদের মৃত্যুর পর যেন তাদের এই দিঘির পাশেই সমাহিত করা হয়।

নীল এখন স্কুলে যাচ্ছে। সে তার দাদী নীলাঞ্জনার মতোই শান্ত আর দাদীর মতো বুদ্ধিমান। সে তার বাবার ক্যামেরা নিয়ে পুরো গ্রামের ছবি তোলে।

আহিয়ান তার জীবনের শেষ নকশাটি তৈরি করেন—একটি বৃদ্ধাশ্রম নয়, বরং একটি ‘প্রজন্ম কেন্দ্র’ যেখানে বৃদ্ধরা আর শিশুরা একসাথে সময় কাটাবে।

আহিয়ান হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুরো গ্রাম তার জন্য দোয়া করতে শুরু করে। হাসপাতালের বেডে শুয়েও তিনি নীলাঞ্জনার হাত ছাড়েননি। তিনি বলেন, "নীলা, আমার ওপারে যাওয়ার সময় হয়েছে, কিন্তু আমি তোমার ভেতরেই থাকব।"

এক শান্ত ভোরের আলোয় আহিয়ান শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। পুরো গ্রাম স্তব্ধ হয়ে যায়। নীলাঞ্জনা কোনো চিৎকার করে কাঁদেনি, সে শুধু পাথরের মতো আহিয়ানের কপালে একটি শেষ চুমু খেল।

আহিয়ানের মৃত্যুর পর নীলাঞ্জনা ভেঙে পড়েনি। সে জানে আহিয়ানের স্বপ্নগুলো এখন তার কাঁধে। সে বৃষ্টির পাশে দাঁড়িয়ে আরও জোরালোভাবে কাজ শুরু করে।

গল্পের শেষে আমরা দেখি, অনেক বছর পর। নীলাঞ্জনা এখন খুব বৃদ্ধ। সে দিঘির পাড়ে বসে আছে। তার নাতি নীল এখন বড় স্থপতি। সে দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে তার দাদী আকাশের নীল দিগন্তের দিকে তাকিয়ে হাসছেন।

আকাশে তখন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেই প্রথম রাতের মতো সোঁদা মাটির গন্ধ। নীলাঞ্জনা চোখ বুজলেন। তার মনে হলো, আহিয়ান ওপাশে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে। বৃষ্টির শব্দে মিশে গেল একটি সার্থক জীবনের গল্প।