অরণ্যের নীল তৃষ্ণা
রাত তখন দুইটা। আহির তার স্টাডি রুমে বসে একটা পুরনো ব্লু-প্রিন্ট দেখছিল। ঘরের আলো নেভানো, শুধু টেবিল ল্যাম্পের ম্লান আলোয় তার চোয়ালের রেখাগুলো তীব্র দেখাচ্ছে। আহির শহরের একজন নামকরা আর্কিটেক্ট, কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনটা একটা ধূসর মরুভূমি।
হঠাৎ দরজায় হালকা টোকা পড়ল। আহির ঘাড় ফিরিয়ে দেখল তার স্ত্রী তানিয়া দাঁড়িয়ে আছে। তানিয়ার পরনে পাতলা সিল্কের নাইটগাউন, চুলগুলো কাঁধের ওপর অগোছালোভাবে ছড়িয়ে আছে। তাদের বিয়ের বয়স সাত বছর, কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তাদের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে।
"এত রাতেও কাজ করছ?" তানিয়ার কণ্ঠে এক ধরণের অভিমান মেশানো আকর্ষণ। আহির ল্যাপটপ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "একটা ডেডলাইন আছে তানি। তুমি শুয়ে পড়ো।"
তানিয়া ধীর পায়ে আহিরের কাছে এসে দাঁড়াল। সে তার হাতটা আহিরের কাঁধে রাখল। আহির অনুভব করল তানিয়ার হাতের স্পর্শে একটা উষ্ণতা আছে, যা সে অনেকদিন এড়িয়ে চলেছে। তানিয়া ফিসফিস করে বলল, "আমরা কি আগের মতো হতে পারি না আহির? আমাদের মধ্যে এই দূরত্ব কেন?"
আহির তানিয়ার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এক ধরণের তৃষ্ণা, যা শুধু ভালোবাসার নয়, বরং অবহেলার যন্ত্রণায় কাতর। আহির তানিয়াকে কাছে টেনে নিল। ঘরের নিস্তব্ধতায় দুজনের নিশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তানিয়া আর আহিরের বিয়েটা ছিল প্রেম আর পারিবারিক সম্মতির মিশেল। কিন্তু কর্পোরেট জীবনের ইঁদুর দৌড় আহিরকে দিন দিন যন্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। সে ভুলেই গিয়েছিল যে তার ঘরে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ আছে যার মানসিক এবং শারীরিক চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ।
সেদিন রাতে আহির তানিয়াকে জড়িয়ে ধরে অনুভব করল, সে কত বড় ভুল করছিল। তানিয়ার গায়ের হালকা পারফিউমের গন্ধ তাকে বহু বছর আগের সেই দিনগুলোতে নিয়ে গেল। তারা দুজনে মিলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের শহরটা ঘুমালেও তাদের ভেতরের অস্থিরতা যেন নতুন করে জেগে উঠছে।
"আহির," তানিয়া তার বুকে মাথা রেখে বলল, "আমার মাঝে মাঝে খুব ভয় হয়। মনে হয় আমি হারিয়ে যাচ্ছি। তুমি কি আমাকে সত্যিই আর চাও না?" আহির তানিয়ার চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলল। "চাহিদা কখনো শেষ হয় না তানি, শুধু ব্যস্ততার ধুলো জমে ঢাকা পড়ে যায়।"
আহির নিচু হয়ে তানিয়ার কপালে গভীর এক চুম্বন করল। সেই মুহূর্তটি ছিল দীর্ঘদিনের নীরবতার পর প্রথম কোনো আবেগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তারা জানত না, এই সুন্দর মুহূর্তের আড়ালে এক বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
পরদিন অফিসে আহিরের সাথে দেখা করতে এল রুমানা। রুমানা আহিরের নতুন প্রজেক্টের ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। বয়স সাতাশ-আটাশ, চোখেমুখে এক ধরণের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং অদম্য আকর্ষণ। রুমানা যখন কথা বলে, মনে হয় সে প্রতিটি শব্দ মেপে উচ্চারণ করছে।
"মিস্টার আহির, প্রজেক্টের নকশাটা চমৎকার হয়েছে। তবে বেডরুমের কালার স্কিম নিয়ে আমার কিছু কথা ছিল," রুমানা ফাইলটা টেবিলে রাখল। আহির ফাইলে চোখ বুলাতে বুলাতে বলল, "বলুন।"
"বেডরুম মানে শুধু ঘুমানোর জায়গা নয়," রুমানা এক পা এগিয়ে এল, "এটি এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলো শান্ত হয়। সেখানে রঙের উষ্ণতা থাকা খুব জরুরি।" আহির রুমানার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল সেখানে এক ধরণের প্রলুব্ধকর আহ্বান। সে বুঝতে পারল, রুমানা শুধু কাজের কথা বলছে না।
অফিস শেষে আহির যখন বাড়ি ফিরছিল, তার মাথায় রুমানার সেই কথাগুলো ঘুরছিল— "বেডরুম মানে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি শান্ত হওয়ার জায়গা।" রুমানার চোখের সেই সাহসী চাহনি আহিরকে এক ধরণের অস্বস্তিতে ফেলছে, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি।
বাড়িতে ঢোকার পর দেখল তানিয়া আজ খুব যত্ন করে সেজেছে। টেবিলে মোমবাতি জ্বলছে, দামী রেড ওয়াইনের বোতল খোলা। তানিয়া আজ কালো রঙের একটা স্বচ্ছ জর্জেট শাড়ি পরেছে। আহিরকে দেখে সে মুচকি হাসল। "আজ এত আয়োজন কিসের জন্য?" আহির ব্যাগটা সোফায় রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল। তানিয়া আহিরের টাই আলগা করে দিতে দিতে বলল, "সবকিছুর জন্য কি কারণ লাগে আহির? সাত বছর পর কি আমি আমার স্বামীকে নিজের করে একটু সময় পেতে পারি না?"
তানিয়ার শরীরের ঘ্রাণ আর মোমবাতির ম্লান আলোয় আহির নিজেকে কিছুটা অপরাধী মনে করল। সে তানিয়াকে জড়িয়ে ধরল, কিন্তু তার মনের কোণে কোথাও রুমানার সেই তীক্ষ্ণ হাসির ছবিটা ভেসে উঠল। মানুষের মন বড় বিচিত্র; সে যা পায় তার চেয়ে যা পায় না, তার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে বেশি।
পরদিন সাইট ভিজিটে আহির আর রুমানাকে শহরের বাইরে একটা নিরিবিলি বাংলোতে যেতে হলো। প্রজেক্টের কাজ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে এল। হঠাৎ শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। পাহাড়ি রাস্তার ধসে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
"মনে হচ্ছে আজ রাতটা এখানেই কাটাতে হবে, মিস্টার আহির," রুমানা তার ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে বলল। বাংলোর কেয়ারটেকার তাদের জন্য ডিনারের ব্যবস্থা করল। আগুনের কুন্ডের পাশে বসে তারা ড্রিঙ্কস করছিল। রুমানা আজ অনেক বেশি খোলামেলা। "আহির, আপনি কি কখনো অনুভব করেছেন যে আপনি যা চাইছেন তা পাচ্ছেন না? এই যে এত সাকসেস, এত বড় বাড়ি—এতে কি আপনার ভেতরের পুরুষটি শান্ত?" রুমানা গ্লাসে চুমুক দিয়ে আহিরের খুব কাছে এসে বসল।
আহির চুপ করে রইল। রুমানার গলার কাছের বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আগুনের আলোয় হিরের মতো চকচক করছে। রুমানা তার হাতটা আহিরের হাতের ওপর রাখল। আহির সরাতে চাইল, কিন্তু পারল না। এক ধরণের নিষিদ্ধ টান তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে।
সেই রাতে বাংলোর নিস্তব্ধতায় আহির আর রুমানার মাঝখানের পেশাদারিত্বের দেয়ালটা ভেঙে পড়ল। রুমানার স্পর্শে এক ধরণের আদিম নেশা ছিল, যা আহিরকে তার নীতি আর সংসার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক চূড়ান্ত মুহূর্তে আহিরের ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। তানিয়ার মেসেজ— "বৃষ্টি হচ্ছে খুব, সাবধানে থেকো। তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।"
আহির ছিটকে সরে এল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রুমানা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। "সরি রুমানা, আমি এটা করতে পারব না," আহির দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রুমানা পেছনে এসে দাঁড়াল, তার কণ্ঠে এখন আর প্রলোভন নয়, বরং এক ধরণের বিদ্রূপ। "নিজেকে কতক্ষণ আটকাবেন আহির? আপনি তৃষ্ণার্ত, আর আমি সেই জল যা আপনি খুঁজছেন।"
আহির যখন পরদিন ভোরে বাড়ি ফিরল, তানিয়া তার চোখের দিকে তাকিয়েই কিছু একটা আঁচ করল। নারীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় খুব প্রখর হয়। আহিরের শার্টে অপরিচিত পারফিউমের হালকা গন্ধ আর তার কথা বলার ধরণে এক ধরণের জড়তা তানিয়াকে ভাবিয়ে তুলল।
তানিয়া কিছু বলল না, কিন্তু সে নিভৃতে আহিরের ফোন চেক করতে শুরু করল। আহির আর রুমানার কাজের মেসেজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতগুলো তানিয়ার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে বুঝতে পারল, তার ঘর ভাঙার উপক্রম হয়েছে।
তানিয়া এবার দুর্বল না হয়ে সিদ্ধান্ত নিল সে লড়াই করবে। সে জানত, আহিরকে জয় করতে হলে তাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় এবং রহস্যময়ী হয়ে উঠতে হবে। সে রুমানার সাথে সরাসরি দ্বন্দ্বে না গিয়ে এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক খেলা শুরু করল।
তানিয়া বুঝতে পারল, শুধু কান্না বা অভিমান দিয়ে আহিরকে ফেরানো সম্ভব নয়। সে নিজেকে আমূল বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল। পরদিন সে শহরের সবচেয়ে দামী পার্লার থেকে নিজেকে নতুন সাজে সাজালো। জিম আর ইয়োগায় মন দিল যাতে শরীরের প্রতিটি ভাঁজ আবার সেই বিয়ের আগের মতো ধারালো হয়ে ওঠে।
আহির সেদিন অফিস থেকে ফিরে অবাক হয়ে গেল। তানিয়া ড্রয়িংরুমে বসে বই পড়ছে, পরনে একটি স্লিভলেস মেরুন গাউন। ঘরজুড়ে লেমন গ্রাস আর ল্যাভেন্ডারের হালকা ঘ্রাণ। তানিয়াকে আজ ঠিক রুমানার মতোই আত্মবিশ্বাসী আর রহস্যময়ী লাগছে।
আহির যখন কাছে গেল, তানিয়া উঠে দাঁড়িয়ে তার টাইটা খুলতে খুলতে বলল, "আজ রাতে বাইরে ডিনার করব না আহির, আমি তোমার প্রিয় পদগুলো নিজেই রান্না করেছি।" তানিয়ার আঙুলের ছোঁয়া আহিরের গলার কাছে লাগতেই সে এক ধরণের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অনুভব করল। সে ভাবল, তানিয়া কি তবে কিছু বুঝতে পেরেছে? নাকি এটিও কোনো ধরণের মোহ?
অফিসে রুমানা বুঝতে পারল আহির তাকে এড়িয়ে চলছে। সে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে জানত আহিরের দুর্বলতা কোথায়। সে অফিসের একটি কনফারেন্স রুমে আহিরকে একা পেয়ে দরজা লক করে দিল।
"পালাচ্ছেন কেন আহির? ওই বাংলোর রাতে যা হতে পারত, তা আপনি মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আপনার চোখ বলছে আপনি আমাকে আজও চান," রুমানা আহিরের খুব কাছে গিয়ে তার বুকের ওপর হাত রাখল। আহির রুমানার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, "রুমানা, দয়া করে প্রফেশনাল হোন। আমি বিবাহিত।"
রুমানা হাসল, এক অদ্ভূত শীতল হাসি। "বিবাহিত তো অনেকেই থাকে আহির, কিন্তু তৃপ্তি কজন পায়? আপনি তানিয়াকে ভালোবাসেন হয়তো, কিন্তু আপনার শরীর আমার আগুনের উত্তর চায়। আজ সন্ধ্যায় আমার ফ্ল্যাটে আসবেন, আপনার সেই অসমাপ্ত ব্লু-প্রিন্টটা নিয়ে। না এলে আমি এই ছবিগুলো তানিয়াকে পাঠিয়ে দেব।"
রুমানা তার ফোনে সেই বৃষ্টির রাতের কিছু অস্পষ্ট কিন্তু আপত্তিকর ছবি দেখাল, যা সে গোপনে তুলেছিল। আহিরের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সে বুঝতে পারল সে এক ভয়ংকর জালে ফেঁসে গেছে।
সন্ধ্যায় আহির রুমানার ফ্ল্যাটে গেল। রুমানা ঘরটা নীল আলোয় সাজিয়ে রেখেছে। হালকা মিউজিক বাজছে। রুমানা পরনে একটি পাতলা সিল্কের ড্রেসিং গাউন, যা তার শরীরের প্রতিটি বাঁককে স্পষ্ট করে তুলছে।
"আসুন আহির। ভয় পাবেন না, আমি তো বাঘ নই," রুমানা আহিরের হাতে একটি পানীয়র গ্লাস তুলে দিল। আহির দেখল রুমানার নেশাতুর চোখ আর তার দেহের উত্তাপ তাকে গ্রাস করতে চাইছে। রুমানা আহিরের কানে ফিসফিস করে বলতে লাগল, "তানিয়া আপনাকে শ্রদ্ধা করতে পারে, কিন্তু আমি আপনাকে উপভোগ করতে চাই। সমাজ আর নৈতিকতা সরিয়ে শুধু একটি রাত আমার হয়ে থাকুন।"
আহির যখন রুমানার বাহুপাশে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করল। তানিয়া ভিডিও কল করছে। আহির স্ক্রিনে দেখল তানিয়া তাদের বিয়ের অ্যালবামটা হাতে নিয়ে হাসছে। আহিরের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে রুমানাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
"শোনো রুমানা, তুমি যা করতে চাও করো। কিন্তু আমি আর নিজেকে ছোট করতে পারব না। তুমি হয়তো আমার শরীর পেতে পারো, কিন্তু আমার ভালোবাসাটা তানিয়ারই থাকবে।"
আহির বাড়ি ফেরার পর তানিয়া তাকে কোনো প্রশ্ন করল না। সে আহিরের চোখের নিচে কালি আর তার অস্থিরতা দেখে সব বুঝে নিল। তানিয়া জানত, এখন সরাসরি আক্রমণ করার সময়।
সেদিন রাতে যখন আহির ঘুমানোর চেষ্টা করছিল, তানিয়া তার পিঠের ওপর হাত রেখে বলল, "আহির, রুমানা কি তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করছে?" আহির চমকে উঠে বসল। "তুমি জানো?"
তানিয়া ম্লান হাসল। "আমি তোমার স্ত্রী আহির। তোমার ঘ্রাণ বদলালে আমি বুঝতে পারি। আমি রুমানার সাথে আজ দুপুরে দেখা করেছি।" আহির স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। "তুমি দেখা করেছ? কেন?"
তানিয়া বলল, "আমি ওকে বলেছি, তুমি যা খুঁজছ তা আমার কাছেও আছে। ওকে আমি ওর নিজের অস্ত্রেই ঘা দিয়েছি। রুমানা বুঝতে পেরেছে যে আমি হার মানার মতো মেয়ে নই।”
পরদিন বিকেলে তানিয়া রুমানার অফিসে গিয়ে হাজির হলো। রুমানা তখন তার কেবিনে পায়ের ওপর পা তুলে কফি খাচ্ছিল। তানিয়াকে দেখে সে একটুও অবাক হলো না, বরং তার ঠোঁটে এক ধরণের তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
"বসুন মিসেস তানিয়া। স্বামীর পিছু পিছু অফিসে আসাটা কি একটু বেশি পুরনো আমলের অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে না?" রুমানা ব্যঙ্গ করে বলল।
তানিয়া শান্তভাবে রুমানার উল্টোদিকে বসল। তার চোখেমুখে কোনো রাগ নেই, বরং এক ধরণের স্থির আত্মবিশ্বাস। সে টেবিলের ওপর একটা খাম রাখল। "পুরনো অভ্যাস অনেক সময় কার্যকর হয়, রুমানা। এই খামটাতে তোমার গত তিন বছরের ট্যাক্স ফাঁকি আর প্রজেক্টের টাকা আত্মসাতের কিছু প্রমাণ আছে।"
রুমানার হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে খামটা খুলে দ্রুত পাতা ওল্টাতে লাগল। তানিয়া বলতে থাকল, "আহিরকে তুমি শরীরের নেশা দেখিয়ে বা ব্ল্যাকমেইল করে পেতে পারো, কিন্তু জেলের ভাত খেলে তোমার এই রূপ আর দম্ভ কোনো কাজে আসবে না। সিদ্ধান্ত তোমার—তুমি আজই এই শহর ছেড়ে চলে যাবে, নাকি আমি পুলিশ ডাকব?"
রুমানা বুঝতে পারল সে ভুল জায়গায় আঘাত করেছে। তানিয়া শুধু ঘরনী নয়, সেও একসময় কর্পোরেট ল’ নিয়ে পড়াশোনা করেছিল—যা আহিরও প্রায় ভুলে গিয়েছিল। রুমানার দম্ভ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা হাতে প্রমাণগুলো দেখছিল।
"তুমি এটা করতে পারো না তানিয়া," রুমানা নিচু স্বরে বলল। "আমি অনেক কিছুই করতে পারি যখন আমার সংসার আক্রান্ত হয়," তানিয়া উঠে দাঁড়াল। "আহিরকে প্রলুব্ধ করা সহজ, কারণ পুরুষরা মাঝে মাঝে নতুনত্বের মোহে অন্ধ হয়। কিন্তু সেই মোহ ভাঙতে আমার এক মিনিটও সময় লাগবে না। আজ রাতের মধ্যে আমি তোমার পদত্যাগপত্র আর শহর ছাড়ার টিকিট দেখতে চাই।"
সেদিন রাতে শহরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামল। আহির ড্রয়িংরুমে বসে অন্ধকার জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে জানত না তানিয়া আর রুমানার মধ্যে কী কথা হয়েছে, কিন্তু সে অনুভব করছিল তার বুকের ওপর থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে গেছে।
তানিয়া ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল। তার পরনে সেই পুরনো দিনের নীল শাড়ি, যা পরে আহির তাকে প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিল। তানিয়া আহিরের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল এবং তার পিঠের ওপর দুহাত রাখল।
"ও চলে গেছে আহির। আর কোনোদিন ও আমাদের মাঝে আসবে না," তানিয়া ফিসফিস করে বলল। আহির ঘুরে দাঁড়িয়ে তানিয়াকে জড়িয়ে ধরল। তার চোখের কোণে জল। "আমাকে ক্ষমা করো তানি। আমি বুঝতে পারিনি আমি কী হারাতে যাচ্ছিলাম।"
তানিয়া আহিরের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। "ক্ষমা নয় আহির, আমি চাই আমাদের এই তপ্ত মরুভূমিতে আবার বৃষ্টি নামুক। আমি চাই তুমি আমাকে আবার সেই একইভাবে আবিষ্কার করো, যেমনটা সাত বছর আগে করেছিলে।"
সেই রাতে তাদের শয়নকক্ষে কোনো নীল আলো ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিম সুগন্ধি। ছিল শুধু দুজন মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান আর তীব্র তৃষ্ণার অবসান। আহির অনুভব করল, তানিয়ার প্রতিটি স্পর্শে যে নিরাপত্তা আর গভীরতা আছে, তা রুমানার মতো ক্ষণস্থায়ী নেশায় থাকা সম্ভব নয়।
তানিয়া আজ আর লাজুক নববধূ নয়; সে আজ এক বিজয়িনী নারী, যে তার ভালোবাসার আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে সব অন্ধকার। তাদের নিশ্বাসের শব্দ আর বাইরের বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। তারা দুজনে মিলে এক নতুন অরণ্য তৈরি করল, যেখানে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশাধিকার নেই।
ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরে ঢুকল, আহির দেখল তানিয়া তার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আহির জানল, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থাপত্য কোনো ইমারত নয়, বরং একটি মানুষের অটল বিশ্বাস।