Story Blog
← Back to Stories

নীল কুয়াশার হাহাকার

Detective
নীল কুয়াশার হাহাকার

কলকাতা শহর থেকে প্রায় দু-ঘণ্টার পথ। বারুইপুরের কাছাকাছি এক বিশাল জঙ্গলঘেরা এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে নীলকুঠি। একসময় নীলকর সাহেবদের দাপট ছিল এখানে, এখন শুধু পুরনো ইটের পলেস্তারা খসা অট্টালিকাটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

অদ্রীশ সেন তার পুরনো অ্যাম্বাসেডর গাড়িটা কুঠির ফটকের সামনে থামালেন। তার পরনে ঘিয়ের রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা। চোখে চশমা নেই, কিন্তু দৃষ্টি অতি তীক্ষ্ণ। তার সহকারী নীল গাড়ি থেকে ব্যাগগুলো নামাতে নামাতে বলল, "অদ্রীশ দা, জায়গাটা যেন কেমন থমথমে। দিনের বেলাতেও কেমন যেন একটা হিমশীতল ভাব।"

অদ্রীশ মৃদু হেসে বললেন, "যেখানে ইতিহাস চাপা পড়ে থাকে, সেখানে বাতাস একটু ভারিই হয় নীল। আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন রায়বাহাদুরের ছেলে সুদীপ্ত বাবু। চলো ভেতরে যাওয়া যাক।"

ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল বিশাল হলঘর। দেয়ালে ঝোলানো তৈলচিত্রগুলো যেন বিচারকের দৃষ্টিতে নবাগতদের দেখছে। সুদীপ্ত বাবু এগিয়ে এলেন। তার মুখ ফ্যাকাসে, চোখের নিচে কালি।

"অদ্রীশ বাবু, আপনি এসেছেন খুব ভালো হয়েছে। বাবা মারা গেছেন আজ তিন দিন। ডাক্তার বলেছেন হার্ট অ্যাটাক, কিন্তু আমি মানতে পারছি না। বাবা মরার ঠিক আধঘণ্টা আগেও সুস্থ ছিলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, বাবার গলার সেই লকেটটা নেই। যাতে সূর্যমণি হীরেটা বসানো ছিল।"

অদ্রীশ সোফায় বসে শান্ত গলায় বললেন, "আপনার বাবাকে ঠিক কোথায় পাওয়া গিয়েছিল?"

"লাইব্রেরি ঘরে। ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। জানালাগুলোও বন্ধ। কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। অথচ লকেটটা উধাও।"

অদ্রীশ উঠে দাঁড়ালেন। "আমাকে ঘরটা দেখান।"

লাইব্রেরি ঘরের দরজা খুলতেই পুরনো বইয়ের গন্ধ নাকে এল। ঘরটা বিশাল। চারদিকে উঁচু র‍্যাক ভর্তি বই। মাঝখানে একটা বড় টেবিল। অদ্রীশ টেবিলের নিচে ঝুঁকে কিছু একটা দেখতে পেলেন। এক টুকরো ছাই। কিন্তু রায়বাহাদুর তো ধূমপান করতেন না। তাহলে এই ছাই এল কোত্থেকে?

নীল পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, "অদ্রীশ দা, জানালার কাঁচের বাইরে দেখো।"

অদ্রীশ জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ধুলো জমা কাঁচের ওপর কেউ একটা চিহ্ন এঁকে দিয়ে গেছে—একটি ছোট বৃত্ত আর তার মাঝখানে একটি বিন্দু। প্রাচীন তান্ত্রিক চিহ্ন? নাকি অন্য কিছু?

লাইব্রেরি ঘরের জানালার কাঁচের সেই রহস্যময় চিহ্নটি অদ্রীশ সেনের কপালে ভাঁজ ফেলে দিল। বৃত্তের মাঝখানে একটি বিন্দু—ঠিক যেন একটি নির্নিমেষ চোখ। অদ্রীশ পকেট থেকে তার ছোট আতশি কাঁচটি বের করলেন।

"নীল, এদিকে এসো তো," অদ্রীশ ফিসফিস করে ডাকলেন। নীল কাছে যেতেই তিনি দেখালেন, "চিহ্নটা বাইরে থেকে আঁকা হয়নি। এটা ভেতর থেকেই আঁকা হয়েছে। কিন্তু ধুলোটা সরেনি। তার মানে, আঙুল দিয়ে ধুলোর ওপর নয়, বরং কাঁচের ওপর বাষ্পের মাধ্যমে কেউ এটা লিখেছিল, যা পরে শুকিয়ে এই ছাপ রেখে গেছে।"

নীল অবাক হয়ে বলল, "তার মানে রায়বাহাদুর মারা যাওয়ার সময় ঘরে অন্য কেউ ছিল? কিন্তু সুদীপ্ত বাবু তো বললেন ঘর ভেতর থেকে বন্ধ ছিল!"

অদ্রীশ কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি মেঝেতে পড়ে থাকা সেই ছাইয়ের দলাটা একটি ছোট্ট কাঁচের শিশিতে ভরে নিলেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সুদীপ্ত বাবুকে বললেন, "সুদীপ্ত বাবু, এই বাড়িতে বর্তমানে কতজন সদস্য এবং কর্মচারী আছেন, তাদের একবার ড্রয়িংরুমে ডাকুন। আমি সবার সাথে একটু আলাপ করতে চাই।"

দশ মিনিটের মধ্যে ড্রয়িংরুমে সাতজন মানুষ এসে জড়ো হলেন। অদ্রীশ তাদের প্রত্যেকের মুখ এবং শারীরিক ভাষা লক্ষ্য করতে লাগলেন।

১. সুদীপ্ত সিংহ: রায়বাহাদুরের বড় ছেলে। রড-সিমেন্টের ব্যবসা করেন, যা বর্তমানে লোকসানে চলছে। ২. অনির্বাণ: ছোট ছেলে। ছন্নছাড়া জীবন যাপন করেন, নেশার ঘোরে থাকেন বেশিরভাগ সময়। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব ভয় পেয়ে আছে। ৩. বিমলা দেবী: রায়বাহাদুরের বিধবা বোন। গত দশ বছর ধরে এই বাড়িতেই থাকেন। হাতে জপমালা, মুখে সারাক্ষণ বিরক্তির ছাপ। ৪. ম্যানেজার তারাপদ বাবু: সাদা চুলে ঢাকা মাথা। গত তিরিশ বছর ধরে এস্টেটের দেখাশোনা করছেন। তার চোখে একটা চাপা ধূর্ততা লক্ষ্য করলেন অদ্রীশ। ৫. সদানন্দ: পুরনো ভৃত্য। রায়বাহাদুরের ব্যক্তিগত সেবা করত। সারাক্ষণ কাঁদছে। ৬. ডঃ বাগচী: পারিবারিক চিকিৎসক। মৃত্যুর রাতে তিনিই প্রথম মৃতদেহ পরীক্ষা করেছিলেন। ৭. রিনি: সুদীপ্ত বাবুর মেয়ে। কলেজে পড়ে। সে এককোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ফোনে কিছু একটা টাইপ করছে।জেরা এবং নতুন তথ্য

অদ্রীশ পাইপে একটু তামাক ভরে ধরিয়ে নিলেন। ধোঁয়া ছেড়ে শান্ত গলায় বললেন, "ডঃ বাগচী, আপনি যখন প্রথম দেহটি দেখলেন, তখন আপনার কী মনে হয়েছিল?"

ডাক্তার আমতা আমতা করে বললেন, "দেখুন অদ্রীশ বাবু, বিমলবাবুর বয়স হয়েছিল। হার্ট অ্যাটাক হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ওনার চোখ দুটো যেভাবে বড় বড় হয়ে ছিল, তাতে মনে হচ্ছিল উনি মৃত্যুর আগে ভীষণ আতঙ্কিত হয়েছিলেন।"

"শরীরে অন্য কোনো দাগ?" অদ্রীশ প্রশ্ন করলেন। "না, সেরকম কিছু দেখিনি। শুধু ওনার গলায় যে চেইনটা থাকত, সেটা ছেঁড়া ছিল।"

অদ্রীশ এবার অনির্বাণের দিকে ফিরলেন। "অনির্বাণ বাবু, ঘটনার রাতে রাত বারোটা থেকে একটার মধ্যে আপনি কোথায় ছিলেন?" অনির্বাণ চমকে উঠল। "আমি... আমি আমার ঘরে ছিলাম। ড্রিঙ্ক করছিলাম। বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই জানি না!"

হঠাৎ বিমলা দেবী চিল চিৎকার করে উঠলেন, "সব ওই হীরের অভিশাপ! সূর্যমণি যার কাছে যায়, তাকেই ধ্বংস করে। অভিশপ্ত কুঠি এটা!"

ঠিক সেই মুহূর্তে লাইব্রেরি ঘরের দিক থেকে একটা বিকট কাঁচ ভাঙার শব্দ এল। নীল আর অদ্রীশ দৌড়ে সেখানে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, লাইব্রেরির সেই জানালার কাঁচটা পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, এবং ঘরের ভেতরে একটি কালো বিড়াল মরে পড়ে আছে। বিড়ালটির মুখে একটি নীল রঙের রেশমি ফিতে।

অদ্রীশ নীলকে বললেন, "নীল, বাড়িটার পেছনের বাগানে যাও। কেউ একজন জঙ্গল দিয়ে পালাচ্ছে। ধরো তাকে!"

নীল টর্চ নিয়ে বাগানের দিকে ছুটল। নীলকুঠির বাগানটা যেন এক গোলকধাঁধা। বড় বড় আগাছা আর ঝাউ গাছগুলো বাতাসের শব্দে অদ্ভুত গোঙানি তৈরি করছে। দূরে একটা ঝোপ নড়ে উঠল। নীল টর্চের আলো ফেলতেই দেখল, একজন লম্বা মতন লোক কালো ওভারকোট পরে পাঁচিল টপকানোর চেষ্টা করছে।

"দাঁড়ান! পালাবেন না!" নীল চিৎকার করল। কিন্তু লোকটি অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় পাঁচিল টপকে অদৃশ্য হয়ে গেল। নীল যখন পাঁচিলের কাছে পৌঁছাল, সেখানে পড়ে থাকতে দেখল একটা পুরনো পকেট ঘড়ি। ঘড়িটার ঢাকনা খুলতেই নীলের রক্ত হিম হয়ে গেল। ভেতরে রায়বাহাদুরের একটি ছোট ছবি রাখা, আর ছবিতে লাল কালি দিয়ে একটা বড় 'X' মার্ক করা।

এদিকে লাইব্রেরি ঘরে অদ্রীশ সেই মৃত বিড়ালটিকে পরীক্ষা করছিলেন। বিড়ালটির মৃত্যু হয়েছে কোনো বিষক্রিয়ায়। কিন্তু নীল রেশমি ফিতেটা কোত্থেকে এল? তিনি ম্যানেজার তারাপদ বাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে ঠিক একই রঙের রেশমি রুমালের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে।

অদ্রীশ মনে মনে ভাবলেন, "খেলোয়াড় অনেকজন, কিন্তু চাল চালছে একজনই।"

নীল যখন হন্তদন্ত হয়ে বাগান থেকে ফিরে এল, তার হাতে সেই রহস্যময় পকেট ঘড়ি। অদ্রীশ ঘড়িটি হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। ঘড়ির কাঁটা দুটো রাত ২টো ১৫ মিনিটে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। রায়বাহাদুরের ছবির ওপর সেই লাল ক্রশ চিহ্নটা যেন একটা অশুভ সংকেত দিচ্ছিল।

"অদ্রীশ দা, লোকটা কিন্তু এই বাড়ির পাঁচিল সম্পর্কে বেশ পরিচিত ছিল," নীল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

অদ্রীশ পাইপটা একপাশে রেখে ম্যানেজার তারাপদ বাবুর দিকে ফিরলেন। তারাপদ বাবু তখন ঘামছেন, রুমাল দিয়ে কপাল মুছছেন বারবার। "তারাপদ বাবু, আপনার পকেটের রুমালটা একবার দেখাবেন?" অদ্রীশের কণ্ঠস্বর বরফশীতল।

তারাপদ বাবু থতমত খেয়ে রুমালটা বের করলেন। নীল রঙের রেশমি রুমাল। অদ্রীশ বিড়ালের মুখে পাওয়া ফিতেটির সাথে সেটি মেলালেন। রঙ এবং কাপড়ের গুণমান হুবহু এক। "ম্যানেজার বাবু, আপনি কি বিড়ালটি মারার জন্য বিষ এনেছিলেন?"

"না না! অদ্রীশ বাবু, আমি... আমি তো জানিই না ওটা ওখানে কীভাবে গেল!" তারাপদ বাবুর গলায় কান্নার সুর। "আমি তো শুধু কাল রাতে বিমলবাবুর ঘরে ফাইলগুলো গুছিয়ে রেখে আসছিলাম।"

সুদীপ্ত সিংহ উত্তেজিত হয়ে বললেন, "তবে কি তারাপদই কাজটা করেছে? ও তো বাবার সমস্ত খাতা-পত্রের খবর রাখত।"

অদ্রীশ হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলেন। "এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার সময় হয়নি। নীল, আমাকে টর্চটা দাও। আমি লাইব্রেরি ঘরের বুকশেলফগুলো আর একবার পরীক্ষা করতে চাই।"

লাইব্রেরির দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ওক কাঠের বুকশেলফগুলোর পেছনে অদ্রীশ কিছু একটা খুঁজছিলেন। হঠাৎ একটা বিশেষ তাকের কাছে গিয়ে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। সেখানে 'দ্য হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল' নামক একটি মোটা বই রাখা ছিল। অদ্রীশ বইটা টানতেই এক অদ্ভুত মেকানিজমের শব্দ হলো। হুড়মুড় করে একটা শব্দ হয়ে দেয়ালের একটা অংশ ভেতরে ঢুকে গেল।

সবার চোখের সামনে উন্মোচিত হলো এক অন্ধকার সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ।

সুড়ঙ্গ দিয়ে ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে বাতাসের ঝাপটা এল। অনির্বাণ চিৎকার করে উঠল, "এ কি! আমাদের বাড়িতে এরকম গোপন রাস্তা আছে আমরা কেউ জানতাম না?"

অদ্রীশ শান্তভাবে বললেন, "পুরনো দিনের জমিদাররা বিপদের সময় পালানোর জন্য বা গুপ্তধন লুকানোর জন্য এরকম ব্যবস্থা রাখতেন। নীল, আমার সাথে এসো। বাকিরা দয়া করে উপরেই থাকুন।"

টর্চের আলো ফেলে অদ্রীশ আর নীল সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকলেন। চারদিকে মাকড়সার জাল আর চামচিকার উপদ্রব। সুড়ঙ্গটা নিচে নেমে গিয়ে বাগানের পেছনের দিকে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কিছুটা দূর যাওয়ার পর অদ্রীশ মাটির দিকে টর্চ ফেললেন।

সেখানে তাজা পায়ের ছাপ! এবং ছাপগুলো জুতো পরা কোনো মানুষের। "নীল, আমরা ঠিক পথেই আছি। যে ঘড়িটা ফেলে পালিয়েছে, সে হয়তো এই পথেই ঢুকেছিল।"

সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই তারা একটি ছোট কামরায় এসে থামলেন। সেখানে একটা পুরনো লোহার সিন্দুক রাখা। সিন্দুকটি খোলা! তার ভেতরটা শূন্য। অদ্রীশ সিন্দুকের হাতলে একটি সাদা গুঁড়ো লেগে থাকতে দেখলেন। তিনি সেটা আঙুলে নিয়ে পরীক্ষা করলেন।

"সায়ানাইড!" অদ্রীশ বিড়বিড় করে বললেন। "তার মানে রায়বাহাদুরকে কোনো বিষাক্ত গ্যাস বা এই গুঁড়ো দিয়ে শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে। কিন্তু খুনি জানত এই সুড়ঙ্গের হদিস। সে কি পরিবারের কেউ?"

হঠাৎ মাথার ওপরের ছাদ থেকে একটা গোঙানির শব্দ এল। শব্দটা আর্তনাদের মতো। অদ্রীশ আর নীল তাড়াতাড়ি সুড়ঙ্গ দিয়ে ওপরে ফিরে এলেন। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখলেন এক বীভৎস দৃশ্য।

বিমলা দেবী জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে আছেন, আর তার হাতের জপমালাটা ছিঁড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। জানালার ধারে একটি ছোট চিরকুট পড়ে আছে, যাতে লেখা: "সূর্যমণি তার মালিককে খুঁজে নিয়েছে। এবার তোমাদের পালা।"

বাড়ির পরিবেশ এখন মৃত্যুপুরীর মতো নিস্তব্ধ। ডঃ বাগচী বিমলা দেবীকে পরীক্ষা করে জানালেন তিনি আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়েছেন। অদ্রীশ এবার রিনিকে ডাকলেন। সুদীপ্ত বাবুর মেয়ে রিনি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত ছিল, কিন্তু এখন তার হাত কাঁপছে।

"রিনি, তুমি কাল রাতে তোমার ঠাকুরদাকে কিছু দিতে গিয়েছিলে?" অদ্রীশ প্রশ্ন করলেন। রিনি ভয়ে কেদে ফেলল। "আমি... আমি শুধু ওনাকে জল দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তখন তিনি ঘুমাচ্ছিলেন না, কার সাথে যেন ঝগড়া করছিলেন ফোনে।" "কাকে ফোন করেছিলেন জানো?" "আমি শুধু একটা নাম শুনেছি... 'রুদ্রাক্ষ'।"

রুদ্রাক্ষ! এই নামটা শোনামাত্রই তারাপদ বাবুর মুখ চুন হয়ে গেল। অদ্রীশ সেটা লক্ষ্য করলেন। "তারাপদ বাবু, রুদ্রাক্ষ কে?"

তারাপদ বাবু কাঁপা গলায় বললেন, "রুদ্রাক্ষ হলো রায়বাহাদুরের প্রথম পক্ষের ছেলের নাতি। যাকে ত্যাজ্যপুত্র করা হয়েছিল বিশ বছর আগে। সে কি তবে ফিরে এসেছে?"

অদ্রীশ মনে মনে ছক সাজাতে শুরু করলেন।

অদ্রীশ সেনের গোয়েন্দা মস্তিস্ক এখন বিদ্যুতের গতিতে কাজ করছে। নীলকুঠির প্রতিটি দেয়াল যেন কোনো এক প্রাচীন পাপের কথা ফিসফিস করে বলছে। এবার শুরু হচ্ছে তদন্তের সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর মোড়।

অদ্রীশ পাইপের তামাকটা ঝেড়ে ফেললেন। তারাপদ বাবুর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "তারাপদ বাবু, বিশ বছর আগের সেই ত্যাজ্যপুত্রের গল্পটা একটু খোলসা করে বলুন তো। রুদ্রাক্ষকে কেন বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল?"

তারাপদ বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুরু করলেন, "রায়বাহাদুরের বড় ছেলে—মানে সুদীপ্ত বাবুর বড় দাদা সুমিত বাবু—এক মেমসাহেবকে বিয়ে করেছিলেন। রায়বাহাদুর সেটা মেনে নিতে পারেননি। সুমিত বাবু সপরিবারে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। শোনা গিয়েছিল তারা পাহাড়ের দিকে কোথাও একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। শুধু তাদের ছোট্ট ছেলে রুদ্রাক্ষ বেঁচে ছিল। রায়বাহাদুর কোনোদিন তার খোঁজ নেননি।"

"কিন্তু রুদ্রাক্ষ যদি বেঁচে থাকে, সে আজ বড় হয়েছে। তার অধিকার ফিরে পেতেই কি সে এসেছে?" নীলের প্রশ্নে ঘরটা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

হঠাৎ সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। বাইরে এখন প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। নীল গিয়ে দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকলেন এক দীর্ঘদেহী যুবক। তার গায়ের রেইনকোট থেকে জল ঝরছে। হাতে একটা কালো ব্রিফকেস।

"কে আপনি?" সুদীপ্ত বাবু চিৎকার করে উঠলেন। যুবকটি শান্ত গলায় বলল, "আমিই রুদ্রাক্ষ। আজ বিকালেই আমি এই গ্রামে পৌঁছেছি। দাদুর মৃত্যুর খবর শুনে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না।"

সবার চোখে তখন অবিশ্বাস। রিনি অস্ফুট স্বরে বলল, "তুমি... তুমিই কি সেই রুদ্রাক্ষ?"

অদ্রীশ এগিয়ে গিয়ে যুবকটির চোখের দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ হেসে উঠলেন। "মজার ব্যাপার! আপনি যখন এসেছেনই রুদ্রাক্ষ বাবু, তখন আপনার হাতের ওই ব্রিফকেসটা একবার খুলে দেখান তো। শোনা যায় আপনার দাদুর সেই সূর্যমণি হীরেটা নাকি খুব পছন্দের ছিল।"

রুদ্রাক্ষের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। "আমি হীরে নিতে আসিনি অদ্রীশ বাবু। আমি এসেছি আমার বাবার একটা পাওনা মেটাতে।"

সেই রাতেই নীলকুঠির লাইব্রেরি ঘরে আবার তল্লাশি শুরু হলো। অদ্রীশ জানতেন, খুনি যাই করুক না কেন, হীরেটা বাড়ি থেকে বের করতে পারেনি। কারণ পুলিশের ঘেরাটোপ আর তার নিজের কড়া নজর ছিল সর্বত্র।

অদ্রীশ হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, লাইব্রেরির সেই সুড়ঙ্গের মুখে যেখানে সায়ানাইডের গুঁড়ো পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে এক ধরণের বিশেষ ফুলের পাপড়ি পড়ে আছে। নীলকণ্ঠ ফুল। এই ফুল কেবল বাগানের উত্তর কোণে ফোটে, যেখানে রায়বাহাদুরের স্ত্রীর সমাধি রয়েছে।

"নীল, চলো সমাধিতে যেতে হবে," অদ্রীশ সংকেত দিলেন।

বৃষ্টির মধ্যে দুজনে যখন সমাধিতে পৌঁছালেন, দেখলেন সেখানে মাটি খোঁড়া হয়েছে। অদ্রীশ টর্চের আলো ফেলতেই দেখলেন মাটির নিচে একটি ছোট ধাতব কৌটো। কৌটোটা খুলতেই ঘর অন্ধকার করে জ্বলে উঠল এক নীলচে জ্যোতি। সূর্যমণি হীরে!

"পেয়ে গেছি!" নীল উত্তেজিত হয়ে বলল। "সাবধান নীল!" অদ্রীশ চিৎকার করে উঠলেন।

অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা গুলি এসে অদ্রীশের পায়ের ঠিক সামনে লাগল। বাগানের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন ডঃ বাগচী। তার হাতে রিভলভার। কিন্তু তার চেহারায় কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং এক উন্মাদ জেদ।

"সরে দাঁড়ান অদ্রীশ বাবু! ওই হীরেটা আমার পাওনা। রায়বাহাদুর আমাকে তিলে তিলে শেষ করেছেন, তার চিকিৎসার খরচ মেটাননি, উল্টে আমাকে চুরির অপবাদ দিয়েছিলেন। আজ আমি আমার পাওনা বুঝে নেব।"

অদ্রীশ শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। ডঃ বাগচীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "ডাক্তার বাবু, হীরেটা আপনি নিতেই পারেন। কিন্তু আপনি কি জানেন আপনি যাকে গুলি করতে চাইছেন, সে আসলে নির্দোষ? আর রায়বাহাদুরকে আপনি মারেননি।"

ডাক্তার চমকে উঠলেন। "মানে? আমিই তো ওনাকে সেই বিষাক্ত ধোঁয়া দিয়েছিলাম!"

"না," অদ্রীশ মৃদু হাসলেন। "আপনি ধোঁয়া দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু আপনি ঘরে ঢোকার আগেই রায়বাহাদুর মারা গিয়েছিলেন। তাকে মেরেছে এমন একজন, যে খুব সন্তর্পণে এই নীলকুঠির সুড়ঙ্গটা ব্যবহার করত।"

ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার থেকে এক জোড়া হাত এসে ডঃ বাগচীর গলা টিপে ধরল। লোকটা আর কেউ নয়—ম্যানেজার তারাপদ বাবু!

তারাপদ বাবুর আসল রূপ বেরিয়ে এল। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন খুনি উন্মাদনা। "সব দোষ ওই বুড়োটার! সে সূর্যমণি বেচে দিতে চেয়েছিল ট্রাস্টকে। আমি ত্রিশ বছর ধরে গোলামি করেছি এই হীরের আশায়। আমিই তাকে শ্বাসরোধ করে মেরেছি সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকে।"

অদ্রীশ পকেট থেকে একটা হুইসেল বের করে বাজালেন। মুহূর্তের মধ্যে সাদা পোশাকের পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে ধরল তারাপদ বাবুকে।

পরদিন সকালে সূর্য উঠল এক পরিষ্কার আকাশ নিয়ে। নীলকুঠির সেই গুমোট ভাবটা আর নেই। অদ্রীশ বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন।

নীল জিজ্ঞাসা করল, "অদ্রীশ দা, তারাপদ বাবু যে খুনি বুঝলে কী করে?" অদ্রীশ হাসলেন। "সেই ছাই মনে আছে নীল? ওটা কোনো তামাকের ছাই ছিল না। ওটা ছিল তারাপদ বাবুর সেই বিশেষ মশা মারার ধূপের ছাই, যা তিনি তার ঘরে ব্যবহার করতেন। সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢোকার সময় তার জামায় সেই ছাই লেগে ছিল এবং তা লাইব্রেরিতে পড়েছিল। আর ওই নীল রেশমি ফিতে? ওটা আসলে বিমলা দেবীর নয়, তারাপদ বাবুর সেই ডায়েরির বাঁধন ছিল যা তিনি হীরেটা চুরি করার সময় ছিঁড়ে ফেলেছিলেন।"

"আর রুদ্রাক্ষ?" "রুদ্রাক্ষ আসলেই সৎ। সে কেবল তার বাবার একটা পুরনো উইল জমা দিতে এসেছিল, যেখানে রায়বাহাদুর তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন।"

নীলকুঠির গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় অদ্রীশ শেষবারের মতো অট্টালিকাটার দিকে তাকালেন। সূর্যমণি হীরেটা এখন পুলিশের জিম্মায়, কিন্তু রহস্যের সেই নীল কুয়াশা যেন অদ্রীশ সেনের মনে নতুন কোনো গল্পের বীজ বুনে দিল।