Story Blog
← Back to Stories

অপূর্ণ সত্য

Horror
অপূর্ণ সত্য

রাত ২টা ১৭ মিনিটে বারীনগর স্টেশনে ট্রেনটা এসে থামল, যেন ক্লান্ত কোনো জন্তু দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকার উগরে দিল। অর্জুন একা নামল, হাতে ছোট একটা ব্যাগ আর একটি সাদা খাম। খামের ওপর শুধু তার নাম, প্রেরকের কোনো পরিচয় নেই। লেখাটা কাঁপা কাঁপা, যেন হাতের সঙ্গে বুকের ভয়ও কেঁপেছে। কুড়ি বছর পর সে এই গ্রামে ফিরেছে। সবকিছু একই আছে, তবু সবকিছু আলাদা। বাতাসেও যেন পুরোনো গোপন কথার গন্ধ। স্টেশনের আলো টিমটিম করছে অসুস্থ চোখের মতো, কুকুরগুলো অকারণেই ডাকছে, আর নীরবতা তার বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসছে। সে বাবার বাড়ি বিক্রি করতে এসেছে—এটাই সবাই জানে। কিন্তু নিজের অজান্তেই সে বুঝে গেছে, এই চিঠি শুধু বাড়ির জন্য নয়, তাকে ডেকেছে এমন এক সত্যের কাছে, যেটা কবরের ভেতরেও শান্তিতে ঘুমায়নি।

গ্রামের কাঁচা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অর্জুনের মনে পড়ছিল শৈশবের কথা—বর্ষায় কাদা, শীতে ধুলো, আর সন্ধ্যেবেলায় বাবার কড়া গলা। সেই বাবা, যিনি হঠাৎ একদিন হৃদরোগে মারা গিয়েছিলেন বলে সবাই মেনে নিয়েছিল। তখন অর্জুন শহরে পড়াশোনা করত। শেষবার বাবাকে দেখাও হয়নি। আজ এত বছর পর, অচেনা চিঠির টানে ফিরে এসে তার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তাকে সুতোয় বেঁধে টেনে আনছে। আকাশে চাঁদ নেই, তারকারাও ম্লান। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে বুঝতে পারছিল, এই গ্রাম তাকে শুধু স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে নেই, বরং বিচার করতে দাঁড়িয়ে আছে।

বাড়িটা রাস্তার একেবারে শেষে। দেওয়ালে ফাটল, জানালায় কালচে দাগ, আর দরজায় মরচে পড়া তালা। অর্জুন তালা খুলতেই শব্দটা এমন হলো, যেন কেউ দীর্ঘ ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠল। ভেতরে ঢুকে সে টর্চ জ্বালাল। ধুলোর কণাগুলো আলোয় ভেসে উঠল, মনে হলো অদৃশ্য আত্মারা নাচছে। ঘরের আসবাব ঠিক আগের জায়গাতেই আছে, কিন্তু তাতে প্রাণ নেই। বাবার পড়ার ঘরে ঢুকেই সে থমকে গেল। টেবিলের ওপর রাখা একটি ছোট কাঠের বাক্স, যেন কেউ খুব যত্ন করে রেখে গেছে। বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠল তার।

বাক্সটা খুলতেই ভেতরে পেল একটা পুরোনো ক্যাসেট টেপ। তার ওপর কালো কালি দিয়ে লেখা একটাই শব্দ— “খুন”। অর্জুনের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। সরকারি কাগজে তার বাবার মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল হৃদরোগ। তাহলে এই টেপ? কে রেখেছে এটা? আর কেন? ঘরের চারপাশে তাকিয়ে তার মনে হলো, অন্ধকারের মধ্যেই কেউ দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে দেখছে সে কী করছে। নিজের অজান্তেই সে দরজার দিকে তাকাল, জানালার দিকে তাকাল। কিছু নেই। তবু ভয়টা রয়ে গেল, দেয়ালের ভেতর ঢুকে থাকা কোনো নিশ্বাসের মতো।

রাত বারোটা নাগাদ সে টেপটা চালাল। বাড়ির চারদিকে তখন পিনপতন নীরবতা। পুরোনো রেকর্ডারের ভেতর থেকে ভেসে এলো তার বাবার গলা—ক্লান্ত, ভাঙা, আতঙ্কে কাঁপা। সেই গলা বলল, সে একদিন রাতে হাসপাতালের পেছনে একটি খুন হতে দেখেছিল। খুনি ছিল গ্রামের বড় লোকেরা—হাসপাতালের ডিরেক্টর, আর থানার ওসি নিজে। তারা তাকে দেখে ফেলায় ধীরে ধীরে বিষ মেশাতে শুরু করেছিল তার ওষুধে। সমাজের কাছে মৃত্যুটা হবে স্বাভাবিক, কিন্তু সত্যটা পচবে অন্ধকারে।

টেপে আরও বলা ছিল, “অর্জুন, তুই যদি কখনো এটা শোনিস, বুঝবি আমি বাঁচতে পারিনি। গ্রামে ফিরিস না। এরা সবাই জানোয়ার।” এই কথা শুনেই অর্জুনের বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ল। ঠিক তখনই সে বাইরে পায়ের শব্দ শুনল। কেউ বাড়ির চারপাশে হাঁটছে। ধীরে, খুব ধীরে। যেন নিশ্চিত হতে চাইছে, সে একা নয়। অর্জুন রেকর্ডারটা বন্ধ করল। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, অতীত তার দরজায় এসে কড়া নাড়ছে।

ভয় তার শরীর কাঁপাচ্ছিল, কিন্তু মাথার ভেতর আগুন জ্বলছিল। সে জানত, এখান থেকে পালালে বাবার মতোই হারিয়ে যাবে সত্য। তাই সে টেপের কপি বানাল, শহরের এক বন্ধুর কাছে অনলাইনে পাঠিয়ে দিল, নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশ হবে এমন ব্যবস্থা করে রাখল। এরপর সে আবার সেই সাদা কাগজ বের করল। নিজের হাতে লিখল আরেকটা চিঠি—একই ভাষায়, একই কাঁপা অক্ষরে। যেন কেউ আবার একদিন ফিরে আসে।

পেছনে দরজার শব্দ হলো। কেউ ঢুকছে। অর্জুন ঘাড় ঘোরাল না। তার আর পালানোর ইচ্ছে নেই। কিছু মানুষ ইতিহাস লেখে, আর কিছু মানুষ ইতিহাসের ভেতর রক্ত হয়ে মিশে যায়। সে ঠিক করল, যদি মরতেই হয়, তবে সত্যের নামেই মরবে।

রাত তিনটে নাগাদ বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে গেল, শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে কুয়াশাভেজা চাঁদের আলো ঢুকছে। অর্জুন চেয়ারে বসে ছিল, টেপের কপিটা ব্যাগে ঢোকাতে গিয়েই হঠাৎ তার মোবাইলটা কেঁপে উঠল। নেটওয়ার্ক নেই, তবু স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি ইনকামিং কল। নম্বরটা দেখে তার বুকের রক্ত জমে গেল—ওটা তার বাবার পুরোনো নম্বর, যেটা বিশ বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কলটা সে ধরেনি। ফোনটা নিজে থেকেই কেটে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর একটি মেসেজ এল: “বাক্সটার ভেতরে আরেকটা বাক্স আছে।”

অর্জুন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কাঠের বাক্সটা আবার খুলে দেখল। নিচের স্তরে লুকোনো ছিল আরও একটা পাতলা ধাতব কৌটো। ভেতরে পেল কিছু ছবি আর একটি ছোট ডায়েরি। ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে হাসপাতালের বেসমেন্টে রক্তে ভেজা মেঝে, আর মাঝখানে পড়ে থাকা এক যুবকের দেহ—চোখ খোলা, মুখ বিকৃত আতঙ্কে। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা: “যদি আমি মরি, তবে ধরে নিস আমি আত্মহত্যা করিনি।” লেখাটা বাবার হাতের। ঠিক তখনই বাইরে কেউ হেসে উঠল—খুব নিচু, কর্কশ হাসি।

পরদিন সকালেই অর্জুন গ্রামে বেরোল। লোকজন তাকে দেখে স্বাভাবিক ব্যবহার করলেও চোখে ছিল অস্বস্তি। চায়ের দোকানের বুড়ো মালিক ফিসফিস করে বলল, “তোর বাবা ভালো মানুষ ছিল… বেশি ভালো।” এরপর আর কথা বলল না। হাসপাতালের দিকে যেতেই তার মাথা ঘুরে উঠল। বিল্ডিংটা নতুন রঙ করা, কিন্তু দেয়ালের ভেতর থেকে যেন পচা গন্ধ বেরোচ্ছে।

হাসপাতালের রেকর্ড রুমে ঢুকে সে বাবার নাম খুঁজল। কিন্তু ফাইলটা নেই। রেজিস্টারে তার বাবার মৃত্যুর তারিখের পাতাটা ছেঁড়া। ঠিক তখনই পুলিশ ওসি রুদ্র সেন ঘরে ঢুকল। ঠোঁটে ভদ্র হাসি, চোখে হিম শীতলতা। সে বলল, “তোমার বাবার মতো লোক এখানে অনেক ছিল… কিছু মানুষ সত্য সহ্য করতে পারে না, অর্জুন।” কথাটা হুমকি না সতর্কতা—বোঝা গেল না। কিন্তু অর্জুন বুঝে গেল, সে শিকার, আর গ্রামটা একটা বিশাল ফাঁদ।

রাতে বাড়ি ফিরে অর্জুন আবার সেই নম্বর থেকে কল পেল। এবার সে ধরল। ওপাশে বাবার গলা নয়—একজন কিশোরের গলা। ভাঙা, কাঁপা। সে বলল, “কাকু… আমি মরিনি। ওরা আমাকে মেরে ফেলেনি। আমাকে নিচে রেখেছে।” তারপর লাইন কেটে গেল।ডায়েরি খুলে অর্জুন শেষ পাতাটা পড়ল, যেটা আগে খেয়াল করেনি: “খুনটা শুধু একটা নয়। ওরা মানুষ মারে না… ওরা মানুষ বদলে দেয়।”

হঠাৎ বাড়ির দেয়ালের ভেতর থেকে শব্দ এলো—নখ দিয়ে আঁচড়ানোর মতো। মেঝের নিচে কিছু নড়ছে। ধীরে ধীরে মেঝের কাঠ ফেঁটে উঠল, আর ভেতর থেকে উঠে এল একটি হাত—কালচে, ফুলে যাওয়া, মানুষের হাত, কিন্তু নখগুলো অস্বাভাবিক লম্বা।অর্জুন বুঝে গেল, এই গ্রামের রহস্য শুধু অপরাধ নয়। এটা সংক্রমণ।এটা খুনের গল্প নয়। এটা রূপান্তরের গল্প।

অর্জুনের শরীর তখন অচেনা এক রূপে জমে গেছে—হাড়গুলো বেঁকে আছে, চোখ কালো আগুনের মতো জ্বলছে, আর ছায়াটা দেয়ালের গায়ে আলাদা হয়ে নড়ছে। তবু তার ভেতরে কোথাও মানুষটা এখনও বেঁচে ছিল। তার বাবা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ছেলের কপালে হাত রাখলেন। সেই স্পর্শ ছিল বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু স্মৃতির মতো ভারী।

তিনি ফিসফিস করে বললেন, “এই ল্যাবটা ধ্বংস না করলে কেউ বাঁচবে না। গ্রাম, মানুষ, এমনকি তুইও না।” তারপর বাবার শরীর কাঁপতে শুরু করল। চামড়ার নিচে কালো শিরা ফুলে উঠল। তিনি পকেট থেকে একটি ছোট রিমোট বের করে দিলেন।“নিচের কোর রুমে চাপ দিলে সব শেষ হয়ে যাবে… আমিও।”অর্জুন বুঝল—এই দানব হয়ে যাওয়া মানুষটাই এখনও তার বাবা।

কোর রুমটা ছিল মাটির অনেক নিচে। চারদিকে লাল আলো, ভারী মেশিনের শব্দ, কাঁচের টিউবে আধা-মানুষ আধা-কিছু সাঁতার কাটছে। সশস্ত্র প্রহরীরা ছুটে এল, কিন্তু অর্জুন আর পুরো মানুষ ছিল না। সে দেয়াল ভেঙে এগোল, গুলিগুলো তার শরীরে ঢুকে মিলিয়ে গেল, রক্ত পড়ল না—কালো ধোঁয়ার মতো কিছু বেরিয়ে এলো।সে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড়াল। রিমোটটা কাঁপা হাতে ধরল। ঠিক তখনই তার বাবা পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন।“ভয় পাস না… তুই যা হচ্ছিস, সেটা দানব না… ওদের শেষ সাক্ষী।

”অর্জুন বোতাম চাপল। ভূমি কাঁপতে শুরু করল। আগুন ছড়িয়ে পড়ল তারের মতো। কাঁচের টিউব ফেটে গেল। মানুষের আর্তনাদ আর অমানবিক চিৎকার একসঙ্গে মিশে গেল।শেষবার সে তার বাবার মুখ দেখল—মানুষের মতো হাসছে।তারপর আলো।তারপর অন্ধকার।

কয়েক সপ্তাহ পরে বারীনগর গ্রাম মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে গেল। সরকার বলল, গ্যাস লিক আর ভূমিকম্পে সব ধ্বংস হয়েছে। কেউ আর হাসপাতালের কথা বলে না। কেউ পুলিশ ওসি রুদ্র সেনের নামও নেয় না।কিন্তু গভীর রাতে এখনো গ্রামের ধ্বংসস্তূপের পাশে আলো জ্বলে ওঠে। লোকজন বলে, ছায়া নড়ে, কিন্তু মানুষ দেখা যায় না।কেউ কেউ শপথ করে বলে—একটি লম্বা ছায়ামূর্তি পাহারা দেয়, যেন কিছু আর কখনো মাটির নিচে জন্মাতে না পারে।তার চোখ কালো।কিন্তু বুকের ভেতর এখনও একটি মানুষের হৃদয় ধুকধুক করে।তার নাম ছিল অর্জুন।

এখন সে কেবল—শেষ সাক্ষী।