নীল জোছনার বিষ
নীল জোছনার প্রহর (অধ্যায় - ১: আকস্মিক দেখা)
শহরের ব্যস্ততম রাস্তার এক কোণে যখন গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই আরিয়ানের সাথে নীলার প্রথম দেখা হয়। আরিয়ান পেশায় একজন স্থপতি, যার জীবনের প্রতিটি অঙ্কই খুব মাপা এবং গোছানো; কিন্তু সেই মাপা জীবনেও যে কোনো একদিন ঝড় উঠতে পারে, তা সে কখনো কল্পনাও করেনি। বৃষ্টির ঝাপটা থেকে বাঁচতে সে যখন ক্যাফেটারিয়া 'রেইনড্রপস'-এর বারান্দায় আশ্রয় নিল, তখন তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সিক্ত বসনা নীলা। তার পরনের নীল শাড়িটা শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, আর কপালের টিপটা বৃষ্টির জলে ধুয়ে গালের এক পাশে এসে থেমেছে। সেই মুহূর্তের অদ্ভুত এক মাদকতা আরিয়ানের ভেতরে এক শিহরণ জাগিয়ে তুলল, যা আগে সে কখনো অনুভব করেনি।
নীলা বুঝতে পারছিল তার দিকে কারো গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে, কিন্তু সে মুখ ফিরিয়ে তাকাতে পারছিল না। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যখন তার খোলা পিঠ স্পর্শ করছিল, তখন সে এক অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব করছিল। সে জানত না এই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা তার জীবনে এক নিষিদ্ধ প্রেমের অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে। আরিয়ানের চোখের সেই তৃষ্ণার্ত চাউনি আর নীরব উপস্থিতি তাকে এমন এক জগতের হাতছানি দিচ্ছিল, যেখানে শুধু আবেগ আর শরীরের ভাষা কথা বলে। তারা দুজনেই জানত, এই দেখা হওয়াটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ এক বিরহের পর দুটি অতৃপ্ত আত্মার মিলনের সূচনামাত্র।
ক্যাফেময় কফির কড়া ঘ্রাণ আর বাইরে বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছিল। আরিয়ান সাহস সঞ্চয় করে যখন তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, তখন নীলার শরীরের সুগন্ধ তাকে পাগল করে তুলছিল। সে নিচু স্বরে শুধু বলল, "আপনার কি ছাতা লাগবে?" নীলা যখন মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকাল, তখন সেই গভীর কালো চোখের মণিতে আরিয়ান নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। সেই এক পলকের চাহনিতে কোনো শব্দ ছিল না, কিন্তু ছিল এক আদিম আকর্ষণের টান। তারা বুঝতে পারল, আজ রাতে এই বৃষ্টির মাঝে তাদের গল্পের শুরুটা হতে যাচ্ছে অত্যন্ত তীব্র এবং উত্তেজনাময়, যা হয়তো সমাজের চোখে ভুল কিন্তু হৃদয়ের কাছে এক চরম সত্য।
আরিয়ান আর নীলার সেই প্রথম দেখার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রকৃতি যেন তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার ষড়যন্ত্র শুরু করল। ক্যাফের সেই ঝাপসা আলো আর বৃষ্টির অবিরাম শব্দের মাঝে তাদের দুজনের নীরবতা এক সময় বাঙ্ময় হয়ে উঠল। আরিয়ান যখন নীলার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল, তখন সে স্পষ্টভাবে নীলার দীর্ঘশ্বাসের ওঠানামা অনুভব করতে পারছিল। নীলার ভেজা শাড়ি থেকে চুইয়ে পড়া জলবিন্দুগুলো যখন মেঝেতে শব্দহীনভাবে পড়ছিল, আরিয়ান তখন নিজের অজান্তেই তার হাতটা বাড়িয়ে নীলার কাঁধের অবাধ্য একগুচ্ছ চুল সরিয়ে দিল। সেই স্পর্শে নীলার সারা শরীরে এক বিদ্যুৎ খেলে গেল, সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সঁপে দিল এক অজানা অনুভূতির কাছে।
অধ্যায় - ২: নিষিদ্ধ টান
আরিয়ানের স্পর্শে এক ধরণের অধিকারবোধ ছিল, যা নীলাকে একই সাথে ভীত এবং রোমাঞ্চিত করছিল। সে জানত সে একজন বিবাহিতা নারী, তার সামাজিক শৃঙ্খল তাকে এই মুহূর্ত থেকে দূরে থাকার কথা বলছে, কিন্তু তার অবদমিত মন আজ যেন সব বাঁধন ছিঁড়ে ফেলতে চায়। আরিয়ানের আঙুল যখন আলতো করে নীলার ঘাড় স্পর্শ করল, তখন সে এক গভীর উষ্ণতা অনুভব করল যা তার বৈবাহিক জীবনের শীতলতাকে এক নিমেষেই তুচ্ছ করে দিল। তারা দুজনেই জানত, এই আকর্ষণ কেবল কথার নয়, বরং এক আদিম এবং তীব্র শারীরিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ, যা তারা আর লুকিয়ে রাখতে পারছে না।
ক্যাফের এক কোণে, যেখানে বাইরের বৃষ্টির ঝাপটা সরাসরি এসে লাগছিল না, সেখানে তারা একে অপরের আরও কাছে এল। আরিয়ান তার দুহাতে নীলার মুখটা আলতো করে ধরল, তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নীলার ঠোঁটের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে বুলিয়ে নিল। নীলার ঠোঁট দুটো তখন থরথর করে কাঁপছিল, তার নিশ্বাস হয়ে এসেছিল উত্তপ্ত। সেই মুহূর্তে বাইরের পৃথিবীর কোলাহল তাদের কাছে ধোঁয়াশা হয়ে গেল; শুধু অবশিষ্ট রইল দুটি হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি আর এক তীব্র কামনার আগুন। আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, "তুমি কি জানো, তোমাকে এই মুহূর্তে কতটা মোহময়ী লাগছে?" নীলা কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু তার হাত দুটো দিয়ে আরিয়ানের শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল।
পরের মুহূর্তেই আরিয়ান তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল নীলার ঘাড়ের সেই নরম অংশে, যেখানে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখনও মুক্তোর মতো জমে ছিল। নীলা এক গভীর গোঙানি দিয়ে নিজের মাথাটা আরিয়ানের কাঁধে এলিয়ে দিল। সেই স্পর্শে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল কেবল এক আদিম তৃষ্ণা মেটানোর আকুলতা। তারা জানত এই পথ পিচ্ছিল, এখানে পা বাড়ানো মানেই এক অনিশ্চিত গন্তব্যে হারিয়ে যাওয়া, তবুও সেই মুহূর্তে তারা একে অপরের শরীরের গন্ধে মাতাল হয়ে ছিল। বৃষ্টির সেই রাত সাক্ষী হয়ে রইল এক নিষিদ্ধ কিন্তু তীব্র প্রেমের প্রসারণের, যা পরবর্তী দিনগুলোতে তাদের জীবনকে এক আমূল পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে।
অধ্যায় - ৩: স্মৃতির দহন ও গোপন অভিসার
বৃষ্টির তীব্রতা একটু কমতেই আরিয়ান নীলার হাত ধরে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এল। রাস্তায় তখন সোডিয়ামের আলোয় ভেজা পিচ চকচক করছে। আরিয়ান তার গাড়ির দরজা খুলে দিলে নীলা কোনো দ্বিধা ছাড়াই ভেতরে গিয়ে বসল। গাড়ির ভেতরটা ছিল এসি-র ঠান্ডা আর পারফিউমের মিষ্টি গন্ধে ভরা। আরিয়ান ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার আগে দীর্ঘক্ষণ নীলার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখন এক গভীর তৃষ্ণা, যা কেবল দেখার নয়, বরং স্পর্শ করার। সে নীলার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "আজ রাতে আমি তোমাকে একা ছাড়তে পারছি না, নীলা। তোমার চোখে যে মেঘ আমি দেখেছি, তা আজ আমায় ভিজিয়ে দিচ্ছে।" নীলা শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, তার মনে তখন ঝড়ের চেয়েও বড় কোনো ভাঙচুর চলছে।
গাড়ি যখন আরিয়ানের নির্জন ফ্ল্যাটের সামনে এসে থামল, নীলা জানত সে এক নিষিদ্ধ সীমানা অতিক্রম করতে যাচ্ছে। লিফটে ওঠার সময় দুজনের কারো মুখে কোনো কথা ছিল না, শুধু ছিল একে অপরের শরীরের উত্তাপ অনুভব করার আপ্রাণ চেষ্টা। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই আরিয়ান নীলাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার ঠোঁট দুটো নীলার ওষ্ঠে গভীর আবেগে মিশে গেল। সেই চুম্বন ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা অতৃপ্তির বহিঃপ্রকাশ। নীলা তার দুহাত দিয়ে আরিয়ানের চুলগুলো মুঠো করে ধরল, তার ভেতর থেকে এক অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এল। সারা ঘরের অন্ধকার যেন তাদের এই আদিম আলিঙ্গনকে আরও ঘনীভূত করে তুলল, যেখানে সমাজের কোনো নিয়ম বা সংস্কারের স্থান ছিল না।
আরিয়ান ধীরে ধীরে নীলার শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে খসিয়ে দিল। সেই মৃদু আলো-আঁধারিতে নীলার শরীর যেন এক জীবন্ত কবিতা হয়ে ফুটে উঠল। আরিয়ানের নিশ্বাস যখন নীলার নাভির কাছে এসে আছড়ে পড়ছিল, তখন নীলা এক অন্য জগতে হারিয়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, তার শরীরের প্রতিটি কোষ আজ আরিয়ানের ছোঁয়ায় নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। সে জানত, কাল সকালে সূর্য উঠলে তাকে আবার তার পুরনো, নিরস জীবনে ফিরে যেতে হবে, কিন্তু এই মুহূর্তে সে কেবল আরিয়ানের হতে চায়। তাদের এই শারীরিক ও মানসিক মিলন ছিল এক বিদ্রোহ—নিয়মের বিরুদ্ধে, একঘেয়েমির বিরুদ্ধে এবং সেই সমাজের বিরুদ্ধে যা প্রেমকে খাঁচায় বন্দি করে রাখতে চায়।
ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল, আরিয়ান এবং নীলার সেই মায়াবী জগতটা হঠাৎ করেই বাস্তবতার কঠোর কষাঘাত অনুভব করল। বিছানার চাদরে তখনও তাদের গতরাতের উত্তাল প্রেমের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ছিল, কিন্তু নীলার চোখে তখন এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বিপর্যস্ত চেহারাটা দেখছিল। তার ঠোঁটের কোণে আরিয়ানের রেখে যাওয়া কামড়ের দাগ আর ঘাড়ে কালশিটে পড়ে যাওয়া নীলচে চিহ্নগুলো তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, গত রাতে সে শুধু নিজের শরীর নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের তিলে তিলে গড়া সামাজিক সম্মানকেও বিসর্জন দিয়েছে। আরিয়ান পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলে নীলা শিউরে উঠল—এ কি আনন্দ নাকি এক গভীর পাপবোধ?
অধ্যায় - ৪: মুখোশের অন্তরালে
আরিয়ান নীলার কাঁধে মুখ ঘষে ফিসফিস করে বলল, "তুমি কি এখনই চলে যাবে? এই সকালটা তো আমাদের হতে পারত।" নীলা কোনো উত্তর দিতে পারল না, সে দ্রুত নিজের অবিন্যস্ত শাড়িটা সামলে নিচ্ছিল। তার মনে পড়ছিল তার স্বামী জামালের কথা, যে হয়তো এতক্ষণে বাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করছে বা অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরিয়ানের এই মোহময় আবেশ থেকে বেরিয়ে আসাটা নীলার জন্য ছিল ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু সে জানত এই শহর সম্পর্কের সততার চেয়ে লোকদেখানো অভিনয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। সে আয়নায় নিজের চোখের কাজল ঠিক করতে করতে ভাবল, কাল রাতে সে যা পেয়েছে তা হয়তো দীর্ঘ দশ বছরের দাম্পত্য জীবনেও পায়নি, কিন্তু এই প্রাপ্তির মূল্য তাকে অনেক চড়া দামে দিতে হতে পারে।
বাসায় ফেরার পথে রিকশায় বসে নীলা বাইরের পৃথিবীকে একদম নতুনভাবে দেখছিল। রাস্তার ধারের মানুষ, ফেরিওয়ালা, কিংবা ট্রাফিক জ্যাম—সবকিছুই আগের মতোই আছে, শুধু বদলে গেছে সে নিজে। তার শরীরের ভেতরে এখনও আরিয়ানের স্পর্শের এক মৃদু শিহরণ টের পাচ্ছিল সে। বাড়ির কলিং বেল বাজানোর সময় তার হাত দুটো কাঁপছিল। দরজা খুলতেই জামালের নির্লিপ্ত মুখটা সামনে ভেসে উঠল। জামাল শুধু একবার তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "সারা রাত কোথায় ছিলে? তোমার ফোন কেন বন্ধ ছিল?" নীলা খুব সাবলীলভাবে মিথ্যে বলতে শিখল সেই মুহূর্তে। সে মাথা নিচু করে বলল, "বৃষ্টির কারণে ছোটো পিসির বাসায় আটকে গিয়েছিলাম, নেটওয়ার্ক ছিল না।" এই প্রথম সে উপলব্ধি করল, প্রেম মানুষকে শুধু আবেগপ্রবণই করে না, বরং সুনিপুণ এক অভিনেতাও বানিয়ে দেয়।
সারাদিন ঘরের কাজে ডুবে থেকেও নীলা নিজেকে আরিয়ানের সেই ঘর থেকে বের করে আনতে পারল না। জামালের সাথে কথা বলার সময় বা তাকে খাবার বেড়ে দেওয়ার সময় সে নিজের অজান্তেই আরিয়ানের সাথে তুলনা করে ফেলছিল। জামালের স্পর্শ যেখানে কেবল যান্ত্রিক এবং রুটিনমাফিক, আরিয়ানের ছোঁয়া সেখানে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উত্তপ্ত। সেই রাতে বিছানায় শুয়ে যখন জামাল তার দিকে হাত বাড়াল, নীলা এক চরম বিতৃষ্ণা অনুভব করল। সে শরীর খারাপের অজুহাতে পাশ ফিরে শুয়ে রইল, কিন্তু তার চোখের পাতা বন্ধ হতেই ভেসে উঠল আরিয়ানের সেই তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো। সে বুঝতে পারল, সে এক দ্বৈত জীবন শুরু করতে যাচ্ছে, যেখানে দিনের আলোয় সে এক আদর্শ ঘরণী আর রাতের অন্ধকারে এক অতৃপ্ত প্রেমিকা।
আরিয়ানের থেকে দূরে সরে এসে নীলা বুঝতে পারল, বিচ্ছেদের এই কয়েক ঘণ্টা যেন কয়েক যুগের সমান। ফোনের স্ক্রিনে আরিয়ানের নামটা ভেসে উঠলেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। জামাল যখন ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছিল, নীলা তখন বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। শাওয়ারের জলের শব্দের আড়ালে সে আরিয়ানের ফোনটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে আরিয়ানের ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "তোমার শরীরের ঘ্রাণ এখনও আমার বালিশে লেগে আছে নীলা, আমি কাজ করতে পারছি না।" আরিয়ানের এই সরাসরি কথাগুলো নীলার কানে গরম সিসার মতো বিঁধছিল, যা তার সারা শরীরে এক অদ্ভুত কামনার ঢেউ তুলে দিচ্ছিল।
অধ্যায় - ৫: ডিজিটাল অভিসার ও অবদমিত ইচ্ছে
ফোনের অপর প্রান্তে আরিয়ানের কণ্ঠস্বর ক্রমশ আরও গভীর এবং নেশাতুর হয়ে উঠছিল। সে নীলাকে বর্ণনা করছিল গতরাতের সেই মুহূর্তগুলোর কথা, যখন নীলা তার বাহুবন্দি হয়ে যন্ত্রণায় আর সুখে আর্তনাদ করছিল। নীলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গলার সেই নীলচে দাগটা আঙুল দিয়ে স্পর্শ করল। আরিয়ান ফিসফিস করে বলছিল, "তুমি কি জানো, এখন আমি ঠিক কী করতে চাইছি?" নীলা চোখ বন্ধ করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল, তার নিশ্বাস দ্রুত হয়ে এল। বাথরুমের বন্ধ দরজার ওপাশে তার স্বামী, অথচ এপাশে সে অন্য এক পুরুষের কামনার আগুনে পুড়ছে। এই দ্বৈত সত্তা তাকে এক চরম মানসিক উত্তেজনার চূড়ায় পৌঁছে দিচ্ছিল। আরিয়ানের নির্দেশে সে কাঁপাকঁপা হাতে নিজের পরনের সালোয়ারের ওড়নাটা সরিয়ে দিল, ফোনের ক্যামেরায় ফুটে উঠল এক নিষিদ্ধ সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি।
আরিয়ান ওপাশ থেকে হুকুম দিচ্ছিল, আর নীলা সম্মোহিতের মতো তা পালন করছিল। ক্যামেরার সামনে তার এই আত্মসমর্পণ ছিল কেবল শরীরের নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা অতৃপ্তির। আরিয়ান যখন তাকে ভিডিও কলে তার শরীরের ভাঁজগুলো দেখাতে বলল, নীলা এক তীব্র লজ্জার সাথে মিশে থাকা রোমাঞ্চ অনুভব করল। সে জানত এটা ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক, কিন্তু এই বিপদের মধ্যেই সে খুঁজে পাচ্ছিল জীবনের আসল স্বাদ। আরিয়ান স্ক্রিনে হাত বুলিয়ে বলছিল, "পরের বার যখন দেখা হবে, আমি এই দাগগুলো আরও গভীর করে দেব।" নীলার সমস্ত শরীর তখন ঘামে ভিজে গেছে, শাওয়ারের ঠান্ডা জলও তার ভেতরের আগুন নেভাতে পারছিল না। সে বুঝতে পারছিল, সে আর আগের নীলা নেই; সে এখন আরিয়ানের হাতে গড়া এক কামনার পুতুল।
ফোন রাখার পর নীলা অনেকক্ষণ চুপচাপ ভেজা মেঝেতে বসে রইল। তার অপরাধবোধ এখন আর ভয়ের উদ্রেক করছে না, বরং এক ধরণের তৃপ্তি দিচ্ছে। সে যখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল, জামাল তার দিকে তাকিয়ে বলল, "এতক্ষণ লাগে গোসল করতে?" নীলা কেবল এক চিলতে রহস্যময় হাসি হেসে এড়িয়ে গেল। সে জানত, আগামী শুক্রবার আরিয়ান তাকে এক নিরিবিলি রিসোর্টে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সেখানে কোনো সামাজিক মুখোশ থাকবে না, থাকবে না কোনো মিথ্যে অজুহাত। শুধু থাকবে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের আড়ালে দুটি নগ্ন শরীর আর এক অন্তহীন তৃষ্ণা। নীলা আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেখানে এক নতুন আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখা দিচ্ছে—যা পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে তার চেনা জগতকে।
শুক্রবার সকালটা ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন এবং ভেজা, যা নীলার মনের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। জামালকে 'বান্ধবীর অসুস্থতা'র অজুহাত দিয়ে সে যখন বাড়ি থেকে বেরোল, তার হাত-পা তখন হিম হয়ে আসছিল। কিন্তু শহরের সীমানা ছাড়িয়ে গাড়ি যখন পাহাড়ি রাস্তার নির্জনতায় প্রবেশ করল, তখন তার ভেতরে ভয়ের জায়গা নিল এক আদিম উত্তেজনা। আরিয়ান ড্রাইভ করছিল এক হাতে, আর অন্য হাতে সে শক্ত করে ধরে ছিল নীলার উরু। গিয়ার পরিবর্তনের সময় তার হাতের অবাধ্য বিচরণ নীলার শরীরের প্রতিটি স্নায়ুকে সজাগ করে দিচ্ছিল। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, সবুজে ঘেরা সেই রিসোর্টটি ছিল যেন তাদের জন্য পৃথিবীর এক গোপন স্বর্গরাজ্য।
অধ্যায় - ৬: পাহাড়ি অরণ্যে আদিম উল্লাস
রিসোর্টের সেই কাঠের কটেজটি ছিল পাহাড়ের ঢালে, যেখান থেকে মেঘেদের আনাগোনা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। দরজা বন্ধ হওয়া মাত্রই আরিয়ান আর নীলার মাঝখানের শেষ বাঁধটুকুও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আরিয়ান নীলাকে পাজাকোলা করে বিছানায় নিয়ে এল। ঘরের ভেতর কাঠের পোড়া গন্ধ আর বাইরের বৃষ্টির শব্দ মিলে এক মাদকতাময় পরিবেশ তৈরি করেছিল। আরিয়ান যখন নীলার গায়ের পাতলা কামিজটা এক টানে সরিয়ে দিল, তখন বাইরের মেঘের অন্ধকার ঘরের ভেতরেও নেমে এল। নীলা লজ্জায় দুহাতে নিজের বুক আড়াল করতে চাইল, কিন্তু আরিয়ান তার হাত দুটো মাথার ওপরে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, "আজ আমাদের মাঝে কোনো আবরণ থাকবে না নীলা, আজ আমি তোমাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করতে চাই।"
সেই রাতে পাহাড়ের নির্জনতাকে সাক্ষী রেখে শুরু হলো এক উন্মত্ত খেলা। আরিয়ানের ঠোঁট নীলার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি মেপে নিচ্ছিল—কপাল থেকে শুরু করে নাভিদেশ পর্যন্ত। নীলা অনুভব করছিল আরিয়ানের উত্তপ্ত নিশ্বাস তার চামড়ায় আগুনের মতো জ্বলছে। তার ভেতরের অবদমিত কামনাগুলো আজ বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো বেরিয়ে আসতে চাইল। সে আরিয়ানের পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিল, এক অসহ্য সুখে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এটা কি কেবল শরীরী ক্ষুধা? নাকি আত্মার কোনো অতৃপ্ত চিৎকার? আরিয়ান যখন তার সমস্ত পুরুষালি শক্তি দিয়ে নীলার ওপর আধিপত্য বিস্তার করল, তখন নীলার মনে হলো সে যেন এক অন্তহীন গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফেরার আর কোনো পথ নেই।
তাদের এই মিলন ছিল দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাদায়কভাবে সুন্দর। বিছানার চাদর দুমড়ে-মুচড়ে তাদের ঘামের গন্ধে ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এক সময় যখন দুজনেই ক্লান্ত হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিল, তখন বাইরে থেকে ভেসে আসছিল বুনো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। নীলা আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে ভাবছিল, এই শান্তি সে জীবনে কখনো পায়নি। কিন্তু তার মনের এক কোণে এক বিষাক্ত প্রশ্ন বিঁধছিল—এই সুখ কতক্ষণের? কাল যখন সে শহরে ফিরবে, তখন কি এই পাহাড়ের স্মৃতি তাকে আরও বেশি দগ্ধ করবে না? আরিয়ান তার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, "নীলা, আমি তোমাকে চিরদিনের জন্য আমার করে পেতে চাই। তুমি কি পারবে সবকিছু ছেড়ে আসতে?" নীলা কোনো উত্তর দিল না, শুধু আরিয়ানকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল।
পাহাড়ের সেই নিভৃত কটেজে আরিয়ানের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় নীলা যখন এক অলীক শান্তিতে চোখ বুজে ছিল, তখনই তার ফোনটা ড্রয়ারের ভেতর একটানা বেজে উঠল। এই শব্দটা ছিল এই নির্জনতায় এক কর্কশ বজ্রপাতের মতো। আরিয়ান বিরক্তিভরে ফোনটা এগিয়ে দিলে নীলা দেখল স্ক্রিনে 'জামাল' নামটা জ্বলজ্বল করছে। তার বুকের ধড়ফড়ানি মুহূর্তেই কয়েক গুণ বেড়ে গেল। জামাল সাধারণত এই সময়ে ফোন করে না। কাঁপা হাতে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জামালের শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "নীলা, তোমার বান্ধবীর বাসায় ফোন করেছিলাম, ওরা বলল তুমি সেখানে যাওনি। তুমি এখন ঠিক কোথায়?" নীলার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল, সে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল—সেখানে এখন আর প্রেম নয়, বরং এক আসন্ন বিপদের কালো ছায়া।
অধ্যায় - ৭: বিশ্বাসের ফাটল ও রক্তচক্ষু
নীলা কোনোমতে ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে মিথ্যে বলার শেষ চেষ্টা করল, "আসলে ও অসুস্থ বলে আমরা অন্য এক ডাক্তারের চেম্বারে এসেছি, তাই হয়তো বাসায় পায়নি।" কিন্তু জামালের ওপাশ থেকে আসা অবিশ্বাসের হাসি নীলার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত বইয়ে দিল। জামাল ধীরস্থিরভাবে বলল, "মিথ্যে বলাটা তুমি ইদানীং বেশ ভালোই রপ্ত করেছো, নীলা। কিন্তু মনে রেখো, আমি সব জানি। তোমার ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্ট আর লোকেশন হিস্ট্রি আমার হাতে। তুমি এখন ঢাকার বাইরে কোনো এক পাহাড়ি রিসোর্টে আছো। আমি আসছি সেখানে, তোমাকে নিয়ে যেতে।" ফোনটা কেটে যাওয়ার পর নীলা পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার এতক্ষণের স্বর্গীয় সুখ মুহূর্তেই নরকযন্ত্রণায় রূপ নিল। আরিয়ান তার কাঁধে হাত রাখতেই সে ঝটকা দিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিল। এক অদ্ভুত ঘৃণা আর ভয় তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল।
আরিয়ান পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার মধ্যেও এক ধরণের অস্থিরতা কাজ করছিল। সে নীলাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, "ভয় পেয়ো না নীলা, জামাল এলেও আমি সামলে নেব। আমাদের সম্পর্কের কথা সে জানলে জানুক, আমি তো তোমাকে ছাড়ছি না।" কিন্তু নীলার কানে তখন আরিয়ানের কোনো কথাই ঢুকছিল না। সে বুঝতে পারছিল, জামালের মতো প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ তাকে এত সহজে ছেড়ে দেবে না। সে দ্রুত নিজের কাপড় গোছাতে শুরু করল। তার মনে হলো, এই রিসোর্টটি এখন তাদের জন্য এক মৃত্যুপুরী। বাইরে বাতাসের বেগ বাড়ছে, যেন এক প্রলয়ংকরী ঝড় আসন্ন। নীলা আয়নায় নিজের দিকে তাকাল; তার গলায় আরিয়ানের দেওয়া কামড়ের দাগগুলো এখন আর প্রেমের চিহ্ন নয়, বরং তার অপরাধের জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে আছে।
ঠিক দুই ঘণ্টা পর যখন রিসোর্টের গেটে একটি কালো গাড়ি এসে থামল, তখন বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে টায়ারের ঘর্ষণের শব্দ কানে এল। আরিয়ান আর নীলা তখন কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। গাড়ি থেকে জামাল নামল, তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই কিন্তু তার চোখে যে নিষ্ঠুরতা ছিল, তা যেকোনো অস্ত্রের চেয়েও ভয়াবহ। সে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসে আরিয়ানের মুখোমুখি দাঁড়াল। আরিয়ান বুক ফুলিয়ে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু জামাল তার দিকে তাকালে না, সরাসরি নীলার চুলের মুঠি ধরে টেনে নিজের দিকে নিয়ে এল। আরিয়ান বাধা দিতে গেলে জামাল তাকে সপাটে এক চড় মারল। সেই চড়ের শব্দে পাহাড়ের নির্জনতা কেঁপে উঠল। জামাল নীলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমার জিনিস অন্য কেউ ভোগ করবে, সেটা আমি বেঁচে থাকতে হতে দেব না। আজ রাতে তোমার আর এই প্রেমিকের বিচার হবে এই পাহাড়ের কোলেই।"
পাহাড়ের সেই নির্জন কটেজে মুহূর্তেই বাতাসের হিমেল আমেজ বিষাক্ত উত্তেজনায় রূপ নিল। জামালের সেই হিংস্র থাবা নীলার চুলে আটকে আছে, আর তার নখের আঁচড় নীলার কপালে লাল হয়ে বসে গেছে। আরিয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে যখন জামালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল, তখন জামাল তার পকেট থেকে ছোট কিন্তু ধারালো একটি সুইচব্লেড বের করল। স্টিলের সেই ফলাটা ঘরের আবছা আলোয় চিলিক দিয়ে উঠল। আরিয়ান থমকে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, জামাল আজ কেবল কথা বলতে আসেনি, সে এসেছে রক্ত ঝরাতে। নীলা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, কিন্তু জামালের বজ্রমুষ্টি যেন তাকে আজ পিষে মারতে চায়।
অধ্যায় - ৮: প্রতিহিংসার নীল বিষ
জামাল নীলাকে মেঝেতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে আরিয়ানের দিকে এগোতে লাগল। তার হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, ছিল এক বিভৎস পৈশাচিকতা। সে ফিসফিস করে বলল, "শহরের বড় স্থপতি, মাপা জীবনে অন্যের বউকে নিয়ে বিছানায় আসার স্বাদ কেমন, তা আজ আমি হাড়েমাসজে বুঝিয়ে দেব।" আরিয়ান পেছনে হটতে হটতে কোণঠাসা হয়ে পড়ল। ঠিক তখনই নীলা মেঝের ওপর পড়ে থাকা একটা কাঁচের ফুলদানি কুড়িয়ে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে জামালের পিঠে আঘাত করল। কাঁচ ভাঙার সেই ঝনঝন শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল। জামাল আর্তনাদ করে পেছন ফিরলে আরিয়ান সুযোগ বুঝে তার কব্জি চেপে ধরল। শুরু হলো দুই পুরুষের এক মরণপণ লড়াই, যেখানে একজন লড়ছিল তার হারানো সম্মান ফিরে পেতে, আর অন্যজন লড়ছিল নিজের অবৈধ ভালোবাসাকে রক্ষা করতে।
ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তারা দুজনেই বারান্দার রেলিংয়ের কাছে চলে গেল। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি আর পাহাড়ের নিচে কয়েক হাজার ফুটের গভীর খাদ। নীলা চিৎকার করে কাঁদছিল আর তাদের থামানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটি তীব্র আর্তনাদ শোনা গেল। রেলিংয়ের একদিকের কাঠ পুরনো থাকায় তা মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। আরিয়ান আর জামাল একে অপরকে আঁকড়ে ধরে খাদের কিনারে ঝুলে পড়ল। নীলা দৌড়ে গিয়ে আরিয়ানের হাতটা চেপে ধরল। কিন্তু জামালের ওজন আরিয়ানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। আরিয়ান যন্ত্রণায় চিৎকার করে বলল, "নীলা, আমার হাত ছেড়ো না! ওকে ছেড়ে দাও!" কিন্তু জামালের হাত আরিয়ানের পা দুটো এমনভাবে জড়িয়ে ধরে ছিল যে, একজনকে বাঁচাতে গেলে অন্যজনকেও টানতে হবে।
সেই মুহূর্তে নীলার চোখে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা খেলে গেল। সে দেখল জামালের সেই চোখ দুটো, যা গত দশ বছর ধরে তাকে শাসন করেছে, অবজ্ঞা করেছে এবং আজ তাকে পশুর মতো টেনেছে। নীলা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল, সেখানে ছিল বাঁচার আকুতি। সে নিজের অন্য হাত দিয়ে জামালের হাতটা আরিয়ানের পা থেকে জোর করে ছাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। জামাল গোঙাতে গোঙাতে বলল, "তুমি... তুমি আমাকে মেরে ফেলবে?" নীলা কোনো উত্তর দিল না, সে কেবল তার জীবনের সমস্ত ঘৃণা এক করে জামালের আঙুলগুলো একে একে আলগা করে দিল। একটি দীর্ঘ আর্তনাদ পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ক্রমশ মিলিয়ে গেল। জামাল অন্ধকারে তলিয়ে গেল, আর আরিয়ানকে নীলা টেনে ওপরে তুলে আনল। দুজনেই হাঁপাচ্ছিল, তাদের শরীর রক্ত আর বৃষ্টিতে মাখামাখি। তারা জানত, এই রাত তাদের চিরকালের জন্য অপরাধী করে দিল, কিন্তু তাদের সম্পর্কের মাঝখানের দেয়ালটা আজ চিরতরে রক্তে ধুয়ে মুছে গেছে।
পাহাড়ের সেই গভীর খাদের নিঃসীম অন্ধকারে জামালের আর্তনাদ যখন মিলিয়ে গেল, তখন প্রকৃতির বুক চিরে এক দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। আরিয়ান আর নীলা তখনও বারান্দার ভাঙা অংশটা আঁকড়ে ধরে হাঁপাচ্ছিল। বৃষ্টির জল তাদের শরীরের রক্ত আর কাদা ধুয়ে দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর যে রক্তের দাগ লেগে গেল, তা ধোয়ার কোনো উপায় ছিল না। আরিয়ান কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে নীলার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। নীলার দৃষ্টি তখন সেই অন্ধকারের দিকে স্থির, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগে তার স্বামী তলিয়ে গেছে। সে বুঝতে পারছিল না সে এখন বিধবা নাকি এক মুক্ত নারী, কিংবা সে কি এখন একজন খুনি?
অধ্যায় - ৯: রক্তের দাগ ও পলায়ন
আরিয়ান নীলার কাঁধ ধরে প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, "নীলা! নিজেকে সামলাও! আমাদের এখান থেকে এখনই বেরোতে হবে। কেউ যদি টের পায়, তবে আমাদের সারা জীবন জেলের ঘানি টানতে হবে।" নীলা যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো উঠে দাঁড়াল। তার ভেজা শাড়িটা শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, চুলগুলো অবিন্যস্ত। আরিয়ান দ্রুত ঘরের ভেতর ঢুকে সব চিহ্ন মোছার চেষ্টা করতে লাগল। মেঝের সেই ভাঙা কাঁচের ফুলদানি, ছোপ ছোপ রক্তের দাগ—সবকিছু সে নিজের শার্ট দিয়ে পরিষ্কার করতে শুরু করল। তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু মস্তিষ্কে তখন কাজ করছিল কেবল বাঁচার তাগিদ। সে জানত, জামালের গাড়িটা নিচে পার্ক করা আছে, সেটাকে সরাতে হবে এবং তাদের এমন এক গল্প সাজাতে হবে যা কেউ সন্দেহ করতে না পারে।
আরিয়ান জামালের গাড়ির চাবিটা খুঁজে নিয়ে নীলাকে নিয়ে নিচে নেমে এল। বৃষ্টির তোড়ে পাহাড়ি রাস্তাগুলো এখন পিচ্ছিল আর বিপজ্জনক। আরিয়ান জামালের গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে পাহাড়ের অন্য এক ঢালে নিয়ে গেল, যেখান থেকে গাড়ি গড়িয়ে দিলে মনে হবে এটি একটি দুর্ঘটনা। সে গাড়িটিকে নিউট্রাল করে দিয়ে পাহাড়ের কিনারায় ঠেলে দিল। এক বিকট শব্দে গাড়িটি পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে নিচের ঝোপঝাড়ে হারিয়ে গেল। আরিয়ান ফিরে এল নিজের গাড়িতে, যেখানে নীলা তখনও পাথরের মূর্তির মতো বসে ছিল। সে নীলার বরফ শীতল হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "এখন থেকে আমরা কেউ কাউকে চিনি না নীলা। অন্তত আগামী কয়েক মাস। পুলিশ তদন্ত করবে, জামালকে নিখোঁজ হিসেবে দেখা হবে। তুমি শুধু বলবে সে রেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।"
শহরের দিকে ফেরার পথে গাড়ির ভেতর এক অসহ্য গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছিল। গত রাতের সেই শারীরিক মাদকতা এখন এক বিভীষিকায় রূপান্তরিত হয়েছে। আরিয়ান মাঝেমধ্যে আরষ্ট হয়ে নীলার দিকে তাকাচ্ছিল। নীলার চোখের কোণে এক ফোঁটা জলও ছিল না, বরং তার চোখের মণি দুটো এক অদ্ভুত শূন্যতায় ধূসর হয়ে গিয়েছিল। সে জানত, সে হয়তো জামালের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু আরিয়ানের সাথে তার এই সম্পর্কের ভিত্তি এখন আর ভালোবাসা নেই, তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বীভৎস অপরাধের অংশীদারিত্ব। তারা দুজনেই অনুভব করছিল, জামালের মৃতদেহটা খাদের নিচে থাকলেও তার অদৃশ্য উপস্থিতি তাদের মাঝখানের সিটে বসে আছে। এই রক্তমাখা প্রেম কি পারবে সামাজিক ঝড়ের মুখে টিকে থাকতে? নাকি অপরাধবোধের বিষে তারা একে অপরকেই ঘৃণা করতে শুরু করবে?
শহরে ফেরার পর আকাশটা যেন আরও বেশি ভারী হয়ে উঠল। নীলা যখন নিজের ড্রয়িং রুমে পা রাখল, সারা বাড়িটা তাকে এক ভৌতিক নিস্তব্ধতায় গিলে খেতে চাইল। প্রতিটি আসবাবপত্র, দেয়ালের প্রতিটি ছবি তাকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করছিল। সে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ নিজের শরীর ঘষে ঘষে পরিষ্কার করল, যেন সে আরিয়ানের স্পর্শ আর জামালের রক্ত—দুটোকেই ধুয়ে ফেলতে চায়। কিন্তু জলের ধারা যতবারই তার শরীর স্পর্শ করছিল, ততবারই তার মনে হচ্ছিল খাদের সেই অন্ধকার থেকে জামালের হাতগুলো বেরিয়ে এসে তার পা জড়িয়ে ধরছে।
অধ্যায় - ১০: তদন্তের ছায়া ও আড়ালে থাকা সত্যি
তিন দিন পর। নীলার দরজায় কড়া নাড়ল বাস্তবতা। সাদা পোশাকে দুজন পুলিশ অফিসার আর একজন ইন্সপেক্টর যখন তার লিভিং রুমে এসে বসলেন, নীলার হৃৎস্পন্দন যেন গলার কাছে উঠে এল। ইন্সপেক্টর রাশেদ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নীলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "মিসেস নীলা, আপনার স্বামী জামাল সাহেবের ফোন গত তিন দিন ধরে বন্ধ। তার অফিসের লোকজনও তাকে খুঁজছে। আপনি কি নিশ্চিত যে সেদিন ঝগড়ার পর সে কোথায় গিয়েছে আপনি জানেন না?" নীলা অত্যন্ত সাহসের সাথে নিজের অভিনয়টা বজায় রাখল। সে আঁচলে চোখ মুছে কাঁপাকঁপা গলায় বলল, "আমি জানি না অফিসার। ও প্রায়ই মেজাজ হারিয়ে বেরিয়ে যেত, কিন্তু এবার যে কেন ফিরছে না, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।" তার এই নিখুঁত কান্নার আড়ালে যে কত বড় এক খুনি লুকিয়ে আছে, তা অভিজ্ঞ ইন্সপেক্টর রাশেদও যেন পুরোপুরি ধরতে পারলেন না, কিন্তু তার মনে এক ধরণের সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল।
অন্যদিকে আরিয়ান তার অফিসে একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। তার সহকর্মীরা ভাবছিল হয়তো কোনো প্রজেক্ট নিয়ে সে চিন্তিত, কিন্তু আরিয়ানের চোখের সামনে তখন কেবল সেই পাহাড়ের রেলিং ভাঙার দৃশ্যটা ভাসছিল। সে নীলাকে ফোন করার সাহস পাচ্ছিল না, কারণ সে জানত তাদের প্রতিটি কল এখন পুলিশের নজরদারিতে থাকতে পারে। এক গভীর রাতে সে আর থাকতে না পেরে একটি 'বার্নার ফোন' (বেনামী সিম) থেকে নীলাকে মেসেজ করল—"দেখা করা দরকার, আজ রাতে সেই পুরনো ক্যাফেটেরিয়ার পেছনে।" নীলা মেসেজটা দেখেই মুছে ফেলল। তার মনে একদিকে আরিয়ানের জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে এক চরম ঘৃণা। আরিয়ানই কি তাকে এই ধ্বংসের পথে নিয়ে এল? নাকি নীলার নিজের অবদমিত কামনাই ছিল এই সর্বনাশের মূল?
রাত ১২টায় বৃষ্টির মাঝে তারা আবার সেই ক্যাফেটেরিয়ার পেছনের নির্জন গলিতে দেখা করল। আরিয়ানকে দেখে নীলা চমকে উঠল; মাত্র কয়েক দিনে লোকটা যেন অর্ধেক হয়ে গেছে। আরিয়ান নীলাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে নীলা তাকে সরিয়ে দিল। সে নিচু স্বরে বলল, "পুলিশ আমাদের ওপর নজর রাখছে। আরিয়ান, আমি আর পারছি না। জামালের ছায়া আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।" আরিয়ান তার হাত শক্ত করে ধরে বলল, "আমাদের শক্ত থাকতে হবে নীলা। আর কিছুদিন, তারপর আমরা এই দেশ ছেড়ে চলে যাব। কানাডায় আমার এক বন্ধুর সাথে কথা হয়েছে।" কিন্তু নীলা জানত, ভৌগোলিক দূরত্ব হয়তো শরীরকে সরাবে, কিন্তু মনের ভেতরের সেই পচা লাশের গন্ধ কি কখনো যাবে? ঠিক তখনই গলির মুখে একটি বাইকের আলো জ্বলে উঠল এবং ইঞ্জিনের শব্দে তারা দুজনেই সজাগ হয়ে গেল। কেউ কি তাদের অনুসরণ করছে?
বাইকের তীব্র আলো যখন গলিটার অন্ধকার দেয়ালগুলোকে সাদা করে দিল, আরিয়ান এবং নীলা একে অপরের থেকে ছিটকে সরে গেল। আরিয়ানের কপালে ঘাম জমেছে, আর নীলার শরীর কাঁপছে থরথর করে। বাইক থেকে যে লোকটা নামল, তার পরনে রেইনকোট এবং মাথায় হেলমেট। হেলমেটটা খোলার পর যে মুখটা বেরিয়ে এল, তাকে দেখে নীলার হৃদপিণ্ড যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ইন্সপেক্টর রাশেদ নন, বরং জামালের ছোট ভাই—ইমতিয়াজ। ইমতিয়াজ সবসময়ই নীলাকে একটু অন্য চোখে দেখত, তার তীক্ষ্ণ নজর থেকে কখনোই কিছু এড়াত না। সে ধীর পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে এল, তার ঠোঁটের কোণে এক ক্রূর হাসি।
অধ্যায় - ১১: ব্ল্যাকমেইল ও নতুন সমীকরণ
ইমতিয়াজ আরিয়ানের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর নীলার চোখের দিকে স্থিরভাবে তাকাল। সে পকেট থেকে তার মোবাইল ফোনটা বের করে একটি ভিডিও প্লে করল। অন্ধকার আর বৃষ্টির শব্দে অস্পষ্ট হলেও, সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—পাহাড়ের সেই রিসোর্টের বারান্দায় আরিয়ান আর নীলা একে অপরের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে, আর কিছুক্ষণ পরেই জামালের গাড়ি সেখানে এসে থামছে। নীলার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ইমতিয়াজ ফিসফিস করে বলল, "ভাবি, ভাইয়াকে তো পাহাড় থেকে ফেলে দিলে, এখন আমার মুখ বন্ধ করার দামটা কীভাবে দেবে? আরিয়ান সাহেব অনেক টাকাওয়ালা লোক, কিন্তু আমার টাকার চেয়েও বেশি কিছু দরকার।" ইমতিয়াজের চোখের সেই লালসা দেখে নীলা বুঝতে পারল, সে এক নরক থেকে বেরিয়ে অন্য এক নরকে পা দিয়েছে।
আরিয়ান রাগে ইমতিয়াজের কলার ধরতে গেল, কিন্তু ইমতিয়াজ খুব সহজেই তাকে সরিয়ে দিয়ে বলল, "সাবধান আরিয়ান সাহেব! এই ভিডিওর একটা কপি অলরেডি আমার এক বন্ধুর কাছে চলে গেছে। আমি যদি কাল সকালের মধ্যে সিগন্যাল না দেই, তবে এটা সরাসরি থানায় পৌঁছে যাবে। আপনার ক্যারিয়ার, আপনার সম্মান—সবকিছু এক নিমেষে শেষ হয়ে যাবে।" আরিয়ান নিস্তেজ হয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, তারা এখন এক অদৃশ্য জালে বন্দি। ইমতিয়াজ নীলার চিবুকটা হাত দিয়ে উঁচিয়ে ধরে বলল, "আজ রাতে আমি তোমার বাসায় আসব নীলা। জামাল ভাই তো নেই, এখন থেকে আমিই তোমার দেখাশোনা করব। আর আরিয়ান সাহেব, আপনি কালকের মধ্যে এক কোটি টাকা রেডি রাখবেন।"
ইমতিয়াজ চলে যাওয়ার পর আরিয়ান আর নীলা সেই অন্ধকার গলিতে দাঁড়িয়ে রইল দুটি জীবন্ত লাশের মতো। আরিয়ান নীলার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমাদের ওকে মেরে ফেলতে হবে নীলা। ও আমাদের বাঁচতে দেবে না।" নীলা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত হাসি হাসল। তার চোখের সেই সারল্য আর নেই, সেখানে এখন দানা বাঁধছে এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের নেশা। সে বলল, "না আরিয়ান, আর কতজনকে মারবে? এই পাপের শেষ কোথায়?" কিন্তু তার মনে মনে অন্য পরিকল্পনা চলছিল। সে বুঝতে পারছিল, আরিয়ান তাকে বিপদে ফেলে হয়তো একদিন নিজেকে বাঁচিয়ে নেবে, কিন্তু তাকে নিজের লড়াইটা নিজেকেই লড়তে হবে। সেই রাতে নীলা বাসায় ফিরে ইমতিয়াজের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল, কিন্তু তার হাতে ছিল একটি ছোট ওষুধের শিশি—যা সে আরিয়ানের ড্রয়ার থেকে সরিয়েছিল।
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে নীলার অ্যাপার্টমেন্টে এক দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা নেমে এল। সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে তার গলার সেই নীলচে দাগগুলো মেকআপ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করছিল, যা জামালের দেওয়া শেষ স্মৃতি। টেবিলের ওপর রাখা সেই ছোট কাঁচের শিশিটা—যার ভেতরে থাকা স্বচ্ছ তরল এক মুহূর্তের মধ্যে যে কাউকে চিরনিদ্রায় পাঠিয়ে দিতে পারে। নীলা জানত, ইমতিয়াজ কোনো সাধারণ লোভী নয়; সে জামালের চেয়েও বেশি ধূর্ত এবং লম্পট। সে শুধু টাকা চায় না, সে চায় নীলার ওপর সেই আধিপত্য বিস্তার করতে যা জামাল করত।
অধ্যায় - ১২: শেষ দান ও একাকীত্বের খেলা
রাত একটার দিকে কলিং বেল বেজে উঠল। নীলা দরজা খুলতেই ইমতিয়াজ ভেতরে ঢুকল, তার চোখে এক বিজয়ীভাব। সে ড্রয়িং রুমের সোফায় বেশ আয়েশ করে বসে বলল, "ভাবি, বাড়িটা এখন বেশ ছিমছাম লাগছে। কোনো বাধা নেই, কোনো চিৎকার নেই।" নীলা কোনো কথা না বলে রান্নাঘরের দিকে গেল। সে দুটি গ্লাসে দামী রেড ওয়াইন ঢালল—যা জামাল খুব শখ করে কিনেছিল। এক হাতে শিশিটা নিয়ে সে কয়েক ফোঁটা বিষ ইমতিয়াজের গ্লাসে মিশিয়ে দিল। তার হাত কাঁপছিল না, বরং এক অদ্ভুত স্থিরতা কাজ করছিল তার ভেতরে। সে বুঝতে পেরেছিল, এই পৃথিবীতে বাঁচতে হলে তাকেও শিকারি হতে হবে।
গ্লাসটা ইমতিয়াজের সামনে রেখে নীলা তার খুব কাছে গিয়ে বসল। ইমতিয়াজ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসল, "বাহ্! ভাবি তো বেশ তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিলে!" সে গ্লাসে চুমুক দেওয়ার আগেই নীলার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে নীলার ফোনে আরিয়ানের একটা মেসেজ এল— "নীলা, পুলিশ আমার অফিসের নিচে অপেক্ষা করছে। ইমতিয়াজ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, ও ভিডিওটা অলরেডি পাঠিয়ে দিয়েছে!" নীলার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে ইমতিয়াজের দিকে তাকাতেই দেখল ইমতিয়াজ তার ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। ইমতিয়াজ বলল, "তুমি কি ভেবেছিলে আমি শুধু এক কোটি টাকায় শান্ত হব? আরিয়ানকে জেলে পাঠিয়ে আমি ওর সব প্রজেক্ট হাতিয়ে নেব, আর তোমাকে রাখব আমার পায়ের নিচে।"
ইমতিয়াজ যখন হাসতে হাসতে ওয়াইনের গ্লাসটা মুখে তুলল, নীলা তাকে বাধা দিল না। সে নির্লিপ্ত নয়নে চেয়ে দেখল ইমতিয়াজ গ্লাসটা শেষ করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইমতিয়াজের হাসি গোঙানিতে রূপ নিল। সে তার গলা চেপে ধরে মেঝেতে পড়ে গেল। তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল, শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল। নীলা তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "ইমতিয়াজ, তুমি ভুল করেছিলে। আমি এখন আর কারো ভাবি নই, কারো স্ত্রী নই—আমি এখন শুধুই এক খুনি, যার হারানোর কিছু নেই।" ইমতিয়াজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে নীলার শাড়ির আঁচলটা খামচে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু নীলা এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিল।
বাইরে তখন পুলিশের সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নীলা জানত আরিয়ান ধরা পড়েছে এবং পুলিশ এখন তার বাড়ির দিকেই আসছে। সে শান্তভাবে ড্রয়িং রুমের মাঝখানে দাঁড়াল। সে আরিয়ানকে ভালোবাসত কি না, তা সে আজ আর জানে না; কিন্তু সে জানে, এই সমাজে প্রেমের চেয়ে বড় সত্য হলো বেঁচে থাকার লড়াই। সে আলমারি থেকে তার সবচেয়ে দামী নীল শাড়িটা বের করল—সেই শাড়ি যা পরে আরিয়ানের সাথে তার প্রথম দেখা হয়েছিল। সে আয়নায় নিজেকে দেখে ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক মাখল। পুলিশ যখন তার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল, তারা দেখল এক সুন্দরী নারী দুটি লাশের (একটি নিখোঁজ জামালের স্মৃতির আর একটি মেঝেতে পড়ে থাকা ইমতিয়াজের) মাঝে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে হাসছে। তার চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না, ছিল এক চরম স্বাধীনতার তৃপ্তি।
পুলিশ যখন নীলার অ্যাপার্টমেন্টের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল, তারা এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হলো। মেঝেতে ইমতিয়াজের নিথর দেহ পড়ে আছে, আর নীলা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ইন্সপেক্টর রাশেদ হাতকড়া বের করতেই নীলা শান্তভাবে নিজের হাত দুটো বাড়িয়ে দিল। তার মুখে এক মায়াবী হাসি ফুটে উঠল, যা দেখে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত বয়ে গেল। নীলা জানত, এই হারানো লড়াইয়ে সে আসলে জিতে গেছে। সে আরিয়ানের মতো কাপুরুষ নয় যে পুলিশের ভয়ে পালানোর চেষ্টা করবে, আবার সে জামালের মতো নিষ্ঠুরও নয় যে নিজের ক্ষমতা জাহির করবে। সে কেবল এক নারী, যে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সমাজ আর আইনের দেওয়া প্রতিটি দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
অধ্যায় - ১৩: লৌহ কপাটের আড়ালে নতুন সূর্য
আদালতের দীর্ঘ শুনানিতে নীলা একটি শব্দও বলেনি। আরিয়ান সব দোষ নীলার ওপর চাপানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, নিজের প্রাণ বাঁচাতে সে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নীলাকে 'চরিত্রহীন' এবং 'প্ররোচনাকারী' হিসেবে সাব্যস্ত করেছিল। নীলা কেবল ডক থেকে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে একবার হেসেছিল—সেই হাসিতে ছিল গভীর করুণা। সে বুঝতে পেরেছিল, যে পুরুষ বিপদের মুখে নিজের ভালোবাসাকে বলি দিতে পারে, তাকে ভালোবাসাটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আদালত নীলাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরিয়ানকে খুনের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অপরাধে দীর্ঘমেয়াদী জেল প্রদান করে। কিন্তু জেলের সেই চার দেয়াল নীলার কাছে কোনো কারাগার মনে হলো না; বরং তার মনে হলো, গত দশ বছরের দাম্পত্য জীবনের চেয়ে এই নির্জনতা অনেক বেশি স্বস্তির।
জেলখানায় নীলার দিনগুলো কাটতে লাগল এক অদ্ভুত নিয়মে। সে লাইব্রেরি থেকে খাতা আর কলম চেয়ে নিল। প্রতিদিন রাতে যখন অন্য বন্দিরা ঘুমানোর চেষ্টা করত, নীলা তখন তার সেই নীল ডায়েরিতে লিখে রাখত এক নিষিদ্ধ প্রেমের আখ্যান। সে লিখতে লাগল বৃষ্টির সেই সন্ধ্যার কথা, আরিয়ানের হাতের প্রথম স্পর্শের শিহরণ, পাহাড়ের সেই রক্তমাখা রাত আর ইমতিয়াজের শেষ গোঙানির কথা। তার লেখনীতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল এক আদিম এবং নগ্ন সত্যের বহিঃপ্রকাশ। কয়েদিদের মাঝে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল যে, ১০২ নম্বর সেলের সেই সুন্দরী নারীটি আসলে একজন জাদুকর, যে কলমের টানে মানুষের হৃদয়ের গোপন অন্ধকারগুলোকে জীবন্ত করে তুলতে পারে।
কয়েক বছর পর, জেলের বাইরে এক চাঞ্চল্যকর খবর ছড়িয়ে পড়ল। 'নীল জোছনার বিষ' নামে একটি উপন্যাস বাজারে এসেছে যা সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কোনো এক অজ্ঞাতনামা প্রকাশকের মাধ্যমে জেলের ভেতর থেকে পাণ্ডুলিপিটি বাইরে এসেছিল। পাঠকেরা বইটির ছত্রে ছত্রে খুঁজে পাচ্ছিল কামনার তীব্রতা, বিশ্বাসঘাতকতার দহন আর এক নারীর প্রতিশোধের গল্প। কেউ জানত না লেখিকা কে, কিন্তু নীলা যখন জেলের বাগানে বসে আকাশের দিকে তাকাত, সে জানত—সে হেরে যায়নি। সে হয়তো শারীরিকভাবে বন্দি, কিন্তু তার ভাবনা আর তার প্রেম আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে বুঝতে পারল, প্রেম মানে কেবল মিলন নয়; প্রেম মানে নিজেকে ধ্বংস করে নতুন এক সত্তার জন্ম দেওয়া।
অধ্যায় - ১৪: চূড়ান্ত মুক্তি (উপসংহার)
দশ বছর পর। নীলার সাজা মওকুফ হয়েছে তার ভালো ব্যবহারের জন্য। জেলের গেট দিয়ে যখন সে বেরিয়ে এল, তখন তার চুলে রুপালি রেখা দেখা দিয়েছে, কিন্তু চোখের সেই ধারালো চাউনি এখনও ম্লান হয়নি। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে—ঠিক যেমনটি হয়েছিল আরিয়ানের সাথে প্রথম দেখার দিন। সে শহরের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে সোজা চলে গেল সেই পাহাড়ের চূড়ায়, যেখানে জামালের সমাধি হয়েছিল কোনো এক নাম না জানা ঝোপের নিচে। সে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পকেট থেকে বের করল আরিয়ানের দেওয়া সেই পুরনো হাতঘড়িটা, যা সে এতদিন সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল। ঘড়িটা সে খাদের নিচে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, "সময় এখন আমার, আরিয়ান। তোমার দেওয়া খাঁচা থেকে আমি আজ চিরতরে মুক্ত।"
নীলা এখন এক ছোট মফস্বল শহরে নাম পরিবর্তন করে বসবাস করে। সেখানে সে একটি অনাথ আশ্রম চালায় আর রাতে নিয়মিত লেখে। তার নতুন উপন্যাসে আর কোনো রক্ত নেই, কোনো প্রতিশোধ নেই; আছে কেবল একলা চলার আনন্দ। সে বুঝতে পেরেছে, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো পুরুষ বা নারী নয়, বরং নিজের আত্মাকে চিনতে পারা। মাঝে মাঝে বৃষ্টির রাতে সে বারান্দায় বসে কফি খায় এবং অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সেই নীল জোছনার কথা ভাবে। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে—এক খুনি প্রেমিকার হাসি, যে নিজের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো বেঁচে উঠেছে।
গল্পের এই দীর্ঘ পথচলা এখানেই শেষ হলো। আরিয়ান আর নীলার সেই বিষাক্ত কিন্তু তীব্র প্রেম কাহিনী আজ কেবল কাগজের পাতায় বন্দি। কিন্তু নির্জন রাতে যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন হয়তো কোনো এক গোপন কোণে অন্য কোনো নীলা আজও আরিয়ানের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে, ভুলে যায় যে—প্রেমের শেষ গন্তব্য অনেক সময় মুক্তি নয়, বরং এক অনন্ত শূন্যতা।