Story Blog
← Back to Stories

ছেঁড়া জামা দেখে তাড়িয়ে দিল পুলিশ... নাম শুনেই এসপি সাহেব পায়ে লুটিয়ে পড়লেন!

Real Experience
ছেঁড়া জামা দেখে তাড়িয়ে দিল পুলিশ... নাম শুনেই এসপি সাহেব পায়ে লুটিয়ে পড়লেন!

জেলে শহরের কোতোয়ালি থানার প্রাঙ্গণে তখন গনগনে দুপুরের খাঁ-খাঁ রোদ। পুরোনো আমলের চুনকাম খসে পড়া দেয়াল, মাথার ওপর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ঘুরে চলা মরচে ধরা সিলিং ফ্যান আর পুরোনো নথিপত্রের দমবন্ধ করা আঁশটে গন্ধ। থানার পরিবেশটা বরাবরের মতোই কর্কশ, যান্ত্রিক আর ক্ষমতাদম্ভে ঠাসা। টাইপরাইটারের খটাখট আওয়াজ, চটি পরা কয়েদিদের শুকনো কাশির শব্দ আর ডিউটি অফিসারদের কর্কশ কণ্ঠের ধমক—সব মিলিয়ে এক অসহ্য অনুভূতি।

থানার প্রধান ফটকের সামনে কাঠের পুরোনো পর্দাটা কেঁপে উঠল। খুব সাবধানে, যেন নিজের অস্তিত্বের ভারেই নিজেই কুণ্ঠিত, ধীরে ধীরে ভেতরে পা বাড়ালেন এক অশীতিপর বৃদ্ধ। বয়স হয়তো পঁচাত্তর কি ছিয়াত্তর। মাথায় কাঁচা-পাকা উসকোখুসকো চুল, অযত্নে বেড়ে ওঠা ধবধবে সাদা দাড়ি মুখের অধিকাংশ অংশ ঢেকে রেখেছে। পরনে তেলচিটে, হাঁটুর কাছে তালি দেওয়া মলিন সাদা ধুতি আর গায়ে বহু পুরোনো খদ্দরের কুর্তা, যার কলারের সুতো উঠে গেছে। পায়ে একজোড়া ক্ষয়ে যাওয়া হাওয়াই চটি, যার একপাশে সেফটিপিন দিয়ে আটকানো। বৃদ্ধের চোখের নিচে কালশিটে পড়া কালি—বহু নির্ঘুম রাত, অনাহার আর বুকভাঙা যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট।

বৃদ্ধের কাঁধে ঝুলছিল শতচ্ছিন্ন এক খাকি কাপড়ের ঝোলা। তিনি কাঁপতে কাঁপতে অভ্যর্থনা ডেস্কে বসা কনস্টেবল ভবতোষের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। টেবিলের ওপর চায়ের কাপে জমে যাওয়া সরের ওপর মাছি ভনভন করছে। ভবতোষ তখন মুখের ভেতর খৈনি ডলতে ডলতে একটা দৈনিক পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছিল।

বৃদ্ধ কাঁপাকাঁপা স্বরে, দ্বিধান্বিত গলায় ডাকলেন, "বাবা... একটু শুনবে?"

ভবতোষ খৈনি মুখে পুরে কড়া চোখে তাকাল। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বৃদ্ধের মলিন বেশভূষা দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মুখ বিকৃত করে একদলা পিক পাশের পিলারের কোণে ফেলে সে কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, "এই বুড়ো! এখানে কী মতলবে ঢুকেছিস? বলি চোখকান কি খোয়া গেছে? এটা থানা, কোনো কালীমন্দিরের নাটমন্দির বা অন্নছত্র নয় যে হাত পাতলেই পেটের খোরাকি জুটবে! যা, ভাগ এখান থেকে! বিদেয় হ!"

বৃদ্ধের শীর্ণ বুকটা অপমানে কেঁপে উঠল। তিনি দুই হাত জোড় করে বুকফাটা স্বরে বললেন, "না বাবা, আমি ভিক্ষে চাইতে আসিনি... আমি বড় বিপদে পড়েছি। আজ সকালে সাপ্তাহিক হাটে গিয়েছিলাম গিন্নির জন্য দুটো পথ্য কিনতে। বাজারে ভিড়ের মধ্যে কে বা কারা আমার কাপড়ের থলি আর পুরোনো মানিব্যাগটা মেরে দিয়েছে বাবা। ওতে আমার অসুস্থ স্ত্রীর তিন মাসের ইনসুলিন কেনার টাকা ছিল, আর ছিল আমার সারাজীবনের পেনশনের কাগজগুলো। ওই কাগজ না পেলে কাল থেকে ঘরে হাঁড়ি চড়বে না, আমার পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রী ওষুধ না পেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে... দয়া করে একটা ডায়েরি লিখে দাও বাবা!"

বৃদ্ধের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে দাড়ি বেয়ে তালি দেওয়া কুর্তার ওপর টপটপ করে ঝরে পড়ল।

কিন্তু থানার নিষ্ঠুর ইট-পাথর কিংবা ভবতোষের হৃদয়—কোনোটাই গলল না। বরং ভবতোষ টেবিল চাপড়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, "ন্যাকামি বন্ধ কর বুড়ো ভাম! তোদের মতো ছিঁচকে চোর-ভিখারিদের রোজ দেখি। পেনশনের গল্প ফাঁদতে এসেছিস? তোর মতো ফকিন্নির আবার পেনশন! যা বললি সোজা পথে কেটে পড়, নইলে লকআপে ঢুকিয়ে এমন ডাণ্ডা মারব যে বাপের নাম ভুলে যাবি!"

থানার অন্য দুই-তিনজন কন্সটেবল ও সিপাহী কাজ ফেলে খিলখিল করে হেসে উঠল। একজন ব্যঙ্গ করে বলল, "কী রে ভবতোষ, বুড়োর ছেঁড়া চটি চুরি গেছে নাকি রে? ডায়েরি লিখে রাখ, কাল রাষ্ট্রপতি ভবনে পাঠাতে হবে!"

বৃদ্ধ নিরঞ্জন মিত্র স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখের জলের বাঁধ ভেঙে গেল। সমাজের নিম্নবর্গের এই চূড়ান্ত অবহেলা আর বঞ্চনা তাঁর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরোল। তিনি শুধু কাঁপতে কাঁপতে বিড়বিড় করলেন, "ভগবান... তুমি কি অন্ধ? গরিবের কান্না কি তোমার আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না?"

ঠিক সেই মুহূর্তে— ভেতরের বড় সাহেবের কাঁচের দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। ঘরের ভেতরকার ঠান্ডা বাতাসের সাথে যেন এক গম্ভীর, হিমশীতল নীরবতা নেমে এল পুরো থানার চত্বরে।

"কী হচ্ছে এখানে? কাকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, কনস্টেবল ভবতোষ?"

থানার সমস্ত কলরব, ফাইল নাড়াচাড়ার শব্দ আর ব্যঙ্গাত্মক হাসির আওয়াজ এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল।

দরজায় দাঁড়িয়ে স্বয়ং জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) অরিন্দম সেন। পরিপাটি খাকি উর্দিতে তাঁর ব্যক্তিত্বের দীপ্তি যেন গোটা ঘরটাকে আলোকিত করে রেখেছে। টানটান শরীর, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর চওড়া বুক। অরিন্দম সেনের সততা, কঠোর অনুশাসন আর অপরাধীদের প্রতি আপসহীন মনোভাবের গল্প পুরো জেলায় কিংবদন্তির মতো। কিন্তু তাঁর সেই কঠোর দৃষ্টির পেছনে যে এক অসীম মমতাময়ী মন লুকিয়ে থাকে, তা খুব কম লোকই জানত।

এসপি সাহেবের গম্ভীর আওয়াজ শুনে ভবতোষের হাত থেকে খৈনির কৌটোটা মেঝের ওপর পড়ে গেল। সে কোনোমতে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকে বলল, "স... স্যার! কিছু না স্যার, এক ভিখারি ভেতরে ঢুকে অহেতুক ঝামেলা করছিল, তাই বলছিলাম বাইরে যেতে..."

অরিন্দম সেনের চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো জ্বলে উঠল। তিনি ধীর পদক্ষেপে ভবতোষের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর বুটের শব্দে যেন মেঝের প্রতিটি ধূলিকণা কেঁপে উঠল।

অরিন্দম অত্যন্ত শান্ত অথচ বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বললেন, "ভবতোষবাবু, পুলিশ আইন বা ভারতের সংবিধানে কোথায় লেখা আছে যে ছেঁড়া জামা পরা কোনো নাগরিক এই দেশের থানায় বিচার চাইতে পারবে না? সাধারণ মানুষের করের টাকায় আপনার এই উর্দি আর বেতন আসে। মানুষকে সম্মান দিতে না পারলে এই উর্দি খোলার ব্যবস্থাও আমার ভালো করেই জানা আছে।"

ভবতোষের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ল। পুরো থানার বাতাস তখন জমাট বেঁধে বরফ হয়ে গেছে।

অরিন্দম সেন দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালেন মেঝের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বৃদ্ধের দিকে। অশীতিপর বৃদ্ধটির কাঁপতে থাকা পা আর চোখের শুকিয়ে যাওয়া নোনা জলের দাগ দেখে অরিন্দমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক অদ্ভুত হাহাকারে মোচড় দিয়ে উঠল। যেন কোনো অদেখা রক্তের টান তাঁর নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিল।

অরিন্দম তাঁর কঠিন কণ্ঠস্বরকে এক অদ্ভুত কোমলতায় রূপান্তর করে বললেন, "বাবা... আপনি হাত জোড় করবেন না। মাথা তুলুন। আমার ঘরে আসুন, ভেতরে এসে বসুন।"

বৃদ্ধ ভয় আর বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। যাঁর এক ধমকে থানার বাঘা বাঘা পুলিশ কাঁপছে, সেই বিরাট বড় সাহেব তাঁকে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করছেন! বৃদ্ধ ধীরে ধীরে কাঁপাকাঁপা পায়ে এসপি সাহেবের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত চেম্বারে ঢুকলেন।

অরিন্দম নিজ হাতে নিজের রাজকীয় চামড়ার চেয়ারের উল্টো দিকের চেয়ারটা টেনে দিলেন, "বসুন বাবা। আপনি নিরাপদ। এবার শান্ত হয়ে বলুন, কী হয়েছে আপনার?" শুধু তা-ই নয়, অরিন্দম ইন্টারকমে নির্দেশ দিলেন, "অফিস ঘরে এক গ্লাস ঠান্ডা জল আর দুটো বিস্কুট নিয়ে এসো, এখনই।"

বৃদ্ধ এক ঢোক জল খেয়ে শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নিলেন। তারপর তাঁর কাঁধের শতচ্ছিন্ন কাপড়ের থলি থেকে কাঁপতে কাঁপতে একটি জীর্ণ, হলদে হয়ে যাওয়া ছোট ডায়েরি বের করলেন। ডায়েরির চামড়ার মলাটটা ক্ষয়ে গেছে, বহু বছরের স্পর্শে পাতাগুলো তুলসিপাতার মতো ভঙ্গুর।

বৃদ্ধ ভাঙা গলায় বললেন, "স্যার... আজ সকালে বাজারে আমার মানিব্যাগটা কেউ কেটে নিয়েছে। ওতে আমার স্ত্রীর ইনসুলিনের শেষ সম্বল টাকা কটা ছিল। আর এই দেখুন, এই ডায়েরির ভাঁজে ছিল আমার রেলওয়ের রিটায়ারমেন্ট আর পেনশনের কিছু পুরনো নথির কপি। ডায়েরিটা আমার থলির একদম তলায় ছিল বলে চোরেরা নিতে পারেনি, কিন্তু আসল কাগজ আর টাকা সব গেছে স্যার... আমাকে একটা কমপ্লেন লিখে দিন, নইলে সরকারি দপ্তরে গিয়ে আমি আর মুখ দেখাতে পারব না।"

অরিন্দম সেন অত্যন্ত মমতা নিয়ে ডায়েরিটি নিজের হাতে তুলে নিলেন। ডায়েরির প্রতিটি পাতায় পুরোনো দিনের হিসেব আর বিভিন্ন ঠিকানার মাঝে এক অপার্থিব ভালোবাসার ছোঁয়া লেগে আছে।

হঠাৎই ডায়েরির প্রথম পাতার ওপরের দিকে এসপি অরিন্দমের চোখ আটকে গেল। সেখানে পুরোনো নীল কালির পেন দিয়ে পরিষ্কার বড় হরফে বাংলায় লেখা: "নিরঞ্জন মিত্র — অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র মেকানিক, পূর্ব রেল।"

মুহূর্তের জন্য অরিন্দমের বুকের রক্ত চলাচল যেন থমকে গেল! চোখের সামনে সবকিছু কেমন যেন আবছা হয়ে এল। তাঁর নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি তিনি নিজের কানে শুনতে পেলেন।

নিরঞ্জন মিত্র? পূর্ব রেল?

অরিন্দমের চোখের সামনে বিদ্যুৎ চমকের মতো ভেসে উঠল পঁচিশ বছর আগের সেই কালরাতের দুঃস্বপ্ন। চারদিকে পোড়া লোহা, মানুষের রক্তাক্ত লাশ, অন্ধকার রাতের চিৎকার, উল্টে পড়ে থাকা অভিশপ্ত 'করমণ্ডল এক্সপ্রেস' আর সেই ট্রেনের কামরায় হারিয়ে যাওয়া তাঁর শৈশব! সেই দুর্ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র বারো বছর। তাঁর বাবার নামও তো ছিল... নিরঞ্জন মিত্র! যিনি রেলে চাকরি করতেন!

অরিন্দমের সারা শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগল। হাত দুটো ভীষণভাবে কাঁপছে। তিনি ডায়েরির দিক থেকে চোখ তুলে তাকালেন উল্টো দিকে বসে থাকা বৃদ্ধের দিকে।

বৃদ্ধ তখন নিজের কোলের ওপর কাঁপতে থাকা হাত দুটো চেপে ধরে বসে আছেন। ঠিক তখনই অরিন্দমের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চলে গেল বৃদ্ধের ডান হাতের তালুর নিচের দিকে—কবজির ঠিক ওপরে।

সেখানে তিন ইঞ্চি লম্বা চামড়া কুঁচকে যাওয়া একটি পুরোনো পোড়া ক্ষতের দাগ!

অরিন্দমের বুক চিরে একটা নীরব আর্তনাদ উঠে এল। এই সেই দাগ! শৈশবে কয়লার ইঞ্জিনের গরম বাষ্পে হাত পুড়ে গিয়েছিল বাবার। ছোট্ট অরিন্দম সেই পোড়া ঘায়ে নিজের ছোট্ট হাত বুলিয়ে দিয়ে বলত, "বাবা, আমি বড় ডাক্তার হয়ে তোমার হাতের এই ঘা সারিয়ে দেব।" বাবা অরিন্দমকে কোলে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতেন, "ডাক্তার নয় রে পাগলা, তুই বড় হয়ে দেশের সেবক হবি, বড় অফিসার হবি!"

অরিন্দমের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কিন্তু চোখ দুটো জলে টলমল করে উঠল। গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে এলো। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

অরিন্দম অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে বৃদ্ধের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাঙা, ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "বাবা... আপনার... আপনার কি কোনো সন্তান ছিল?"

বৃদ্ধ নিরঞ্জন মিত্র চমকে উঠলেন। এই প্রশ্নের আকস্মিকতায় তাঁর বুকের বহু পুরোনো ক্ষতের ব্যান্ডেজ যেন ছিঁড়ে রক্ত ঝরতে শুরু করল। বৃদ্ধের চোখ বেয়ে অঝোরে জল নামল। তিনি ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, "ছিল বাবা... ছিল। আমার এক মানিক ছিল। তার নাম ছিল অরিন্দম। পঁচিশ বছর আগে সেই অভিশপ্ত ট্রেন দুর্ঘটনায় লোহালক্কড়ের নিচে আমার কোল খালি হয়ে যায়। সারা স্টেশন, হাসপাতাল, মর্গ খুঁজেও আমি আমার বারো বছরের বাছাধনটাকে আর খুঁজে পাইনি... সেই শোকে ওর মা আজও আধপাগল হয়ে সেবা আশ্রমে ধুঁকছে... ভগবান আমার সন্তানকে কেড়ে নিয়ে আজও আমাকে এই নরকে বাঁচিয়ে রেখেছে!"

আর কোনো সংশয় রইল না। কোনো প্রমাণের আর দরকার ছিল না।

অরিন্দম সেনের মাথার টুপিটা ডেস্কে খসে পড়ল। তিনি আর এসপি নন, কোনো আইপিএস অফিসার নন—তিনি এখন শুধু পঁচিশ বছর ধরে অনাথ আশ্রমে বড় হওয়া, বাবার স্নেহের জন্য তিয়াসি এক তৃষ্ণার্ত সন্তান!

অরিন্দম এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন মেঝের ওপর—সরাসরি সেই ছেঁড়া ধুতি পরা, ধূলিমলিন বৃদ্ধের পায়ের ধুলো নিজের মাথায় মেখে নিয়ে দুই হাতে বাবার পা জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠলেন—

"বাবা! আমি বেঁচে আছি বাবা! তোমার অরিন্দম মরে যায়নি... চেয়ে দেখো বাবা, তোমার সেই হারিয়ে যাওয়া খোকা আজ তোমার সামনে ফিরে এসেছে!"

পুরো এসপি অফিস যেন এক নিস্তব্ধ মহাশ্মশান থেকে জীবন্ত দেবালয়ে পরিণত হলো। কাঁচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবল ভবতোষসহ গোটা থানার পুলিশ অফিসাররা হতবাক, বাকরুদ্ধ হয়ে নিজেদের অজান্তেই স্যালুট করার ভঙ্গিতে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এসপি চেম্বারের ভেতরে তখন সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। বাইরে থানার বড় দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো আওয়াজ নেই।

মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে থাকা জেলা পুলিশ সুপার অরিন্দম সেনের কাঁধটা তীব্র কান্নায় থরথর করে কাঁপছে। তাঁর পরনের খাকি উর্দির বুক চিরে অশীতিপর বৃদ্ধের ধূলিমলিন পা দুটি সিক্ত হয়ে উঠছে তপ্ত অশ্রুধারায়। যে মানুষটির একটিমাত্র হস্তক্ষেপে জেলার অপরাধীরা ভয়ে কাঁপে, সেই পরাক্রমশালী আইপিএস অফিসার আজ সব অহংকার, সমস্ত ক্ষমতা আর পদমর্যাদা ভুলে এক অবোধ শিশুর মতো বাবার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছেন।

বৃদ্ধ নিরঞ্জন মিত্র প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কোঁচকানো চামড়া, শীর্ণ হাত আর বহু ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করা মস্তিষ্কে কথাগুলো যেন ঠিকঠাক প্রবেশ করছিল না। তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেঝের দিকে।

অরিন্দম?

তাঁর সেই খোকা?

যে বাছাধন পঁচিশ বছর আগে এক রক্তাক্ত অন্ধকারের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল?

বৃদ্ধের শরীরটা এক অজানা আশঙ্কায়, অসীম বিস্ময়ে কেঁপে উঠল। তাঁর জীর্ণ, কম্পিত দুটি হাত ধীরে ধীরে নেমে এল মেঝের দিকে। অবিশ্বাসের ঘোর নিয়ে তিনি অরিন্দমের চিবুক ছুঁয়ে মুখটি ওপরে তুললেন।

অরিন্দমের চোখের জলে নাকের ডগা লাল, চোখের দৃষ্টিতে সেই বারো বছরের খোকার মতো এক তীব্র আকুলতা। বৃদ্ধের হাত দুটো এবার অরিন্দমের কপালের বাম দিকে চলে গেল। সেখানে চুল সরাতেই দেখা গেল দুই ইঞ্চি লম্বা একটি পুরোনো কাটা দাগ।

সেই কালরাতের স্মৃতি বিদ্যুতের মতো নিরঞ্জন মিত্রের স্মৃতিপটে আছড়ে পড়ল!

সেদিন ছিল এক অমাবস্যার রাত। ১৯৯৯ সালের এক বৃষ্টিভেজা বর্ষা। নিরঞ্জন মিত্র, তাঁর স্ত্রী কল্যাণী আর বারো বছরের ফুটফুটে ছেলে অরিন্দমকে নিয়ে ট্রেনে করে ফিরছিলেন গ্রামের বাড়ি থেকে। ট্রেনের কামরায় তখন ঝুম বৃষ্টি আর চাকার একটানা একটানা ছন্দ। অরিন্দম জানালার পাশে বাবার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। রাত তখন আনুমানিক দুটো। হঠাৎ এক বিকট ধাতব আর্তনাদ, ট্রেনের বগিগুলো যেন একটার ওপর আরেকটা আছড়ে পড়ল। চোখের পলকে পৃথিবীটা উল্টে গেল!

লোহার চাদর দুমড়ে-মুচড়ে গেল, চারদিকে জীবন্ত মানুষের হাহাকার আর আগুনের লেলিহান শিখা। ছিটকে পড়েছিলেন নিরঞ্জন, মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, রক্তে ভেসে যাওয়া উল্টে থাকা বগির ভেতরে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজেছিলেন সন্তানকে। রক্তাক্ত মুখে শুধু ডেকেছিলেন, "অরিন্দম! খোকা! তুই কোথায় রে?" কিন্তু উত্তর মেলেনি। উদ্ধারকারী দল যখন তাঁকে টেনে বের করেছিল, তখন তিনি দেখেছিলেন তাঁর ছোট্ট ছেলের মাথার বাম পাশ থেকে রক্ত ঝরছে, এক অচেনা ভিড়ের চাপে সেই নিথর দেহটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

পরের তিনটে মাস নিরঞ্জন মিত্র এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল, রেললাইনের পাশের মর্গ থেকে অনাথ আশ্রমে পাগলের মতো ঘুরেছেন। ছেলের কোনো সন্ধান মেলেনি। স্ত্রীর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল, ট্রেনের হর্ন শুনলেই কল্যাণী চিৎকার করে উঠত। অবশেষে সবাই ধরে নিয়েছিল, সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অরিন্দম আর বেঁচে নেই।

সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি থেকে বর্তমানে ফিরে এলেন নিরঞ্জন মিত্র। তিনি অরিন্দমের কপালে আঙুল বোলালেন। দাগটা ঠিক সেখানেই আছে!

বৃদ্ধের গলা দিয়ে কোনো স্বাভাবিক শব্দ বেরোল না, বেরোল এক বুকফাটা অমানুষিক চিৎকার— "অরি... অরিন্দম! আমার খোকা! তুই... তুই বেঁচে আছিস রে বাপ? তুই ফিরে এসেছিস?"

নিরঞ্জন মিত্র আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি চেয়ার ছেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়লেন এবং দুই হাতে অরিন্দমের মাথাটা নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

পঁচিশ বছরের জমে থাকা সমস্ত হাহাকার, একাকীত্ব, অনাহার আর বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস যেন এক মুহূর্তে বাঁধভাঙা নদীর মতো উথলে উঠল। বৃদ্ধের সাদা দাঁড়িতে ভিজে একাকার হয়ে গেল অরিন্দমের চুল। অরিন্দমও শক্ত করে বাবার কোমর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, "বাবা! আমি তোমাকে কত খুঁজেছি! ভেবেছিলাম দুর্ঘটনায় তোমরা দুজনেই আমাকে একা ফেলে চলে গেছ... বাবা, আমি মরে যাইনি, তোমার খোকা বেঁচে আছে!"

কাঁচের দরজার বাইরে তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।

কনস্টেবল ভবতোষের পা দুটো যেন মেঝের সাথে পেরেক দিয়ে আটকে গেছে। তার মুখের সমস্ত রক্ত শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। যাকে সে একটু আগে 'ভিখারি', 'ফকিন্নি' বলে গালাগালি করেছে, যাকে লাথি মেরে লকআপে ঢোকানোর হুমকি দিয়েছে—তিনি স্বয়ং এই জেলার সর্বেসর্বা পুলিশ সুপারের জন্মদাতা পিতা!

ভবতোষের কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। তার পেছনের অন্য কন্সটেবল আর সাব-ইন্সপেক্টররা ভয়ে ও অনুশোচনায় মাথা নিচু করে কাঁপছে। ভবতোষের মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে যদি পায়ের তলার মাটি ফাঁক হয়ে যেত, তবে সে মাটির ভেতরে ঢুকে নিজের পাপ ঢাকত।

এসপি সাহেব ধীরে ধীরে বাবাকে মেঝের থেকে তুলে নিজের রাজকীয় চেয়ারে বসালেন। তারপর নিজের রুমাল দিয়ে পরম যত্নে বাবার জীর্ণ চটি পরা ধূলিমলিন পা দুটি মুছিয়ে দিলেন।

অরিন্দম দরজার দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় হাঁক দিলেন, "ভবতোষবাবু! ভেতরে আসুন!"

ভবতোষের মনে হলো যেন যমরাজের ডাক এসেছে। সে কাঁপতে কাঁপতে ঘরের ভেতরে ঢুকল। ভয়ে তার হাত-পা অবশ। সে সোজা নিরঞ্জন মিত্রের পায়ের কাছে পড়ে গিয়ে হাত জোড় করে কেঁদে ফেলল, "আমাকে ক্ষমা করে দিন বাবা! আমি চিনতে পারিনি! আমি জানোয়ারের মতো ব্যবহার করেছি... স্যার, আমাকে সাসপেন্ড করবেন না, আমার ছোট ছোট বাচ্চা আছে স্যার!"

নিরঞ্জন মিত্রের সরল, নিষ্পাপ মুখে কোনো ক্রোধ ছিল না। তিনি ভবতোষের মাথায় হাত রেখে শান্ত গলায় বললেন, "ওঠো বাবা... তুমি তো দোষ করোনি। সমাজে যে মানুষের গায়ে ছেঁড়া কাপড় থাকে, তার কোনো দাম থাকে না—এটাই তো দুনিয়ার নিয়ম। তুমি তোমার চোখ দিয়ে দেখেছ, কিন্তু মানুষের ভেতরের রক্ত আর আত্মাকে তো দেখতে পাওনি। ভগবান তোমার মঙ্গল করুক।"

বাবার এই মহানুভবতা দেখে অরিন্দমের চোখ আবার ভিজে উঠল। তিনি ভবতোষকে বললেন, "ভবতোষবাবু, আমার বাবার মহানুভবতায় আজ আপনার চাকরি বাঁচল। কিন্তু মনে রাখবেন, আজ থেকে এই থানায় কোনো সাধারণ মানুষ, কোনো ছিন্নমূল বা বয়োবৃদ্ধ যদি আসে, তাঁদের যেন ভগবানের মতো সেবা দেওয়া হয়। যান, ওনার জন্য গরম খাবার আর চা নিয়ে আসুন।"

ভবতোষ চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

অফিসের ভেতর গরম চা আর কিছু ফল নিয়ে আসা হলো। নিরঞ্জন মিত্রের হাত তখনও কাঁপছিল। অরিন্দম নিজে হাতে বাবাকে চা এগিয়ে দিলেন, মিষ্টি খাওয়ালেন। এক পিতা আর পুত্রের মধ্যে পঁচিশ বছরের শূন্যতা যেন প্রতিটা চুমুকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল।

নিরঞ্জন মিত্র অপলক চোখে ছেলের সুঠাম শরীর আর উর্দির কাঁধে জ্বলজ্বল করা অশোকস্তম্ভ ও আইপিএস ব্যাজের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের কোণ দিয়ে আবার আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

বৃদ্ধ কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "খোকা... তুই কোথায় ছিলিস এতদিন? সেই কালরাতের পর কীভাবে বেঁচে ফিরলি? কী করে তুই এই রাজসিংহাসনে পৌঁছালি রে বাপ?"

অরিন্দম এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি চলে গেল বহু দূরে, অতীতের সেই লড়াইয়ের দিনগুলোতে।

"বাবা," অরিন্দম বলতে শুরু করলেন, "সেই কালরাতে ট্রেনের ধাক্কায় আমার মাথায় লোহার পাত লেগেছিল। জ্ঞান হারানোর পর স্থানীয় কিছু গ্রামবাসী আমাকে উদ্ধার করে এক সরকারি হাসপাতালে ফেলে রেখে যায়। আমার মাথায় গভীর ক্ষতের কারণে প্রায় ছয় মাস আমি স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার শুধু মনে থাকত আমার নাম অরিন্দম, কিন্তু বাড়ি কোথায়, বাবা-মায়ের নাম কী—সব হারিয়ে গিয়েছিল এক ধূসর কুয়াশায়।"

বৃদ্ধ নিরঞ্জন মিত্র শিউরে উঠে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

অরিন্দম বলতে লাগলেন, "হাসপাতাল থেকে আমাকে পাঠানো হয় উত্তরবঙ্গের এক সরকারি অনাথ আশ্রমে। বাবা, সেখানে জীবনটা কোনো নরকের চেয়ে কম ছিল না। একবেলা আধপেটা খেয়ে, পুরোনো ফাটা মেঝেতে পাতলা কম্বল গায়ে দিয়ে শীতের রাত কাটাতে হতো। বড় ছেলেরা মারধর করত, কর্মচারীরা পশুর মতো খাটাত। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেও একটা কথা আমার অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল—একদিন তুমি আমাকে বলেছিলে, 'তুই বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবি, দেশের সেবা করবি।' বাবার সেই অস্পষ্ট কথাটা আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল।"

অরিন্দমের গলার স্বর ভারী হয়ে এলো, "হাইস্কুলে পড়ার সময় আমার পুরোনো স্মৃতিগুলো আস্তে আস্তে ফিরে আসতে শুরু করে। মনে পড়ে ট্রেনের দুর্ঘটনার কথা, মনে পড়ে বাবার হাতের সেই পোড়া দাগের কথা! আমি অনাথ আশ্রমের সুপারিন্টেন্ডেন্টকে বহুবার বলেছিলাম আমার বাবা-মাকে খুঁজে দিতে। কিন্তু এক অনাথের কান্না শোনার মতো সময় কার থাকে বাবা? আঠারো বছর বয়সে আশ্রম থেকে বের করে দেওয়া হলো আমাকে। পকেটে একটা পয়সাও ছিল না। তখন দিনে স্টেশনের চায়ের দোকানে কাপ ধুতাম, রাতে ফুটপাতে পথবাতির নিচে বসে পুরোনো বই পড়ে পড়াশোনা করতাম।"

নিরঞ্জন মিত্র নিজের বুকে হাত চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলেন। তাঁর বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছিল ছেলের এই নির্মম কষ্টের কথা শুনে।

"তারপর বাবা," অরিন্দম এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের হাসি হাসলেন, "কলকাতায় এক সহৃদয় অধ্যাপকের চোখে পড়ে যাই আমি। তিনি আমাকে মেসে থাকার জায়গা করে দেন আর বই কিনে দেন। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি এমন এক জায়গায় পৌঁছাব, যেখান থেকে দাঁড়িয়ে আমি আমার হারিয়ে যাওয়া বাবা-মাকে খুঁজে বের করতে পারব এবং এই দেশের কোনো অসহায় মানুষকে যেন আর বিচারহীনভাবে মরতে না হয়, সেই ব্যবস্থা করব।"

"দিনের পর দিন না খেয়ে, টিউশনি করে আর সিভিল সার্ভিসের জন্য দিনে আঠারো ঘণ্টা পড়াশোনা করেছি বাবা। প্রথম প্রচেষ্টাতেই অল ইন্ডিয়া র‍্যাংক করে আমি আইপিএস পাই। পুলিশ সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পর আমার প্রথম কাজই ছিল সেই পঁচিশ বছর আগের ট্রেন দুর্ঘটনার তালিকা বের করা। কিন্তু রেলওয়ের পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে দেখেছিলাম, আহত ও নিখোঁজদের কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। গ্রামের ঠিকানায় লোক পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু প্রতিবেশীরা জানিয়েছিল—ছেলে হারানোর শোকে সেই মিত্র পরিবার নাকি বহু আগেই ভিটেমাটি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।"

অরিন্দম বাবার হাত দুটি নিজের গালে চেপে ধরলেন, "বাবা, আমি প্রতিদিন ডিউটিতে বেরোনোর আগে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতাম—যদি আমার বাবা-মা এই পৃথিবীর কোথাও বেঁচে থাকে, তবে কোনো না কোনো দিন যেন তাঁদের পায়ের ধুলো আমি মাথায় নিতে পারি। ভগবান আজ আমার সেই প্রার্থনা শুনেছেন বাবা! আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি!"

নিরঞ্জন মিত্রের মুখে তখন গর্ব আর ভালোবাসার আলো ঠিকরে পড়ছে। কিন্তু হঠাৎই বৃদ্ধের মুখটা আবার ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি হঠাৎ অরিন্দমের হাত শক্ত করে চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠলেন, "খোকা! তোর মা! তোর মা যে এখনো বেঁচে আছে রে বাপ!"

অরিন্দম যেন কোনো অদৃশ্য বজ্রপাতে চমকে উঠলেন। তাঁর হৃৎস্পন্দন আবার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো।

"মা? মা বেঁচে আছেন বাবা? কোথায় মা? মা কেমন আছেন?" অরিন্দম রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করলেন।

বৃদ্ধের চোখের জল আবার বাঁধ মানল না। তিনি কান্নাজড়িত গলায় বললেন, "তোর মা তোকে হারানোর পর পুরোপুরি পাগল হয়ে গিয়েছিল রে। দিনরাত দরজার দিকে তাকিয়ে শুধু 'খোকা খোকা' করত। অর্থাভাবে ওর চিকিৎসা করাতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত শহরের এক প্রান্তে রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের দাতব্য মানসিক হাসপাতালে ওকে রেখেছি। সেখানে নার্সদের দয়ায় ও একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে। ওর শরীরের অবস্থা খুব খারাপ রে খোকা... আজ যদি ওর ওষুধের টাকাটা জোগাড় না হতো, তবে হয়তো ও..."

কথা শেষ করতে পারলেন না নিরঞ্জন মিত্র।

অরিন্দম এক মুহূর্তও আর দেরি করলেন না। তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখে ফুটে উঠল এক দৃঢ় সংকল্প। তিনি টেবিল থেকে তাঁর সার্ভিস ক্যাপ ও ওয়্যারলেস তুলে নিলেন।

"বাবা, ওঠো। এক সেকেন্ডও আর এখানে নয়। আমরা এখনই যাব। পঁচিশ বছর ধরে যে মা আমার জন্য কেঁদে কেঁদে অন্ধ হতে বসেছে, সেই মাকে আজ তাঁর ছেলে নিজের বুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে!"

পর্ব ৫: সাইরেনের গর্জন, অশ্রুসিক্ত সেবাশ্রম ও মায়ের শূন্য কোলে পূর্ণতা এসপি চেম্বার থেকে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এলেন জেলা পুলিশ সুপার অরিন্দম সেন। তাঁর এক হাতে ধরা পিতার শীর্ণ, কাঁপা হাত। থানার করিডোরে তখন পিনপতন নীরবতা। যে কনস্টেবলরা আধঘণ্টা আগেও নিরঞ্জন মিত্রকে অবজ্ঞার চোখে দেখেছিল, তারা এখন শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়ে দুপাশে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে স্যালুট ঠুকছে। অরিন্দম সরাসরি ড্রাইভারকে ডেকে চাবি নিলেন না, বরং স্বয়ং পেছনের দরজা খুলে পরম শ্রদ্ধায় বাবাকে সরকারি সাদা টাটা সাফারি গাড়ির নরম আসনে বসিয়ে দিলেন। ওয়্যারলেসে অরিন্দম নির্দেশ পাঠালেন— "কন্ট্রোল রুম, এসপি ভিজিট। শহরের শেষ প্রান্তে আনন্দময়ী সেবাশ্রমের উদ্দেশ্যে কনভয় মুভ করবে। গ্রিন করিডোর ক্লিয়ার রাখুন।" মুহূর্তের মধ্যে নীল বাতি জ্বালিয়ে পুলিশের পাইলট জিপ আর এসপির গাড়ি জেলা শহরের ট্রাফিক চিরে ছুটতে শুরু করল। সাইরেনের শব্দ যেন শুধু কোনো ভিআইপির যাত্রার বার্তা দিচ্ছিল না, তা ছিল পঁচিশ বছর ধরে অনাথ হয়ে থাকা এক রাজপুত্রের তার নিঃস্ব, দীনহীন রানি-মাকে উদ্ধারের এক পবিত্র অভিযান। গাড়ির পেছনের সিটে বসে কাঁপছিলেন নিরঞ্জন মিত্র। তিনি কাঁচের বাইরে ছুটে চলা শহরের দোকানপাট, মানুষের ভিড় দেখছিলেন আর বারবার পাশে বসা ছেলের উর্দির আস্তিনে হাত বোলাচ্ছিলেন। যেন ভয় হচ্ছিল—এই বুঝি স্বপ্নটা ভেঙে যাবে, এই বুঝি চোখ মেললে আবার সেই থানার চত্বরের অপমান আর ভিক্ষুকের বাস্তবতা ফিরে আসবে! অরিন্দম বাবার সেই ভয় বুঝতে পেরে নিজের শক্ত, চওড়া হাতের তালুতে বাবার হাতটি চেপে ধরলেন, "বাবা, এটা স্বপ্ন নয়। তোমার অরিন্দম সত্যিই তোমার পাশে।" কুড়ি মিনিটের মাথায় গাড়ি এসে থামল শহরের এক নিভৃত প্রান্তে অবস্থিত 'আনন্দময়ী সেবাশ্রম ও মানসিক পুনর্বাসন কেন্দ্র'-এর জীর্ণ লোহার গেটের সামনে। হঠাৎ সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের বড় বড় গাড়ি থামতে দেখে সেবাশ্রমের ম্যানেজার ও সেবিকারা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাইরে বেরিয়ে এলেন। ম্যানেজার সাহেব হাত কচলাতে কচলাতে বললেন, "স্যার! কোনো অন্যায় বা গোলমাল হয়েছে কি? আমরা তো কোনো সরকারি নির্দেশ অমান্য করিনি..." অরিন্দম এক হাত তুলে ম্যানেজারকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর মুখমণ্ডলে কোনো অফিশিয়াল কঠোরতা ছিল না, ছিল শুধুই এক দিশাহারা সন্তানের গভীর ব্যাকুলতা। তিনি শান্ত অথচ ভারী গলায় বললেন, "ভয় পাবেন না। কোনো তদন্তের জন্য আসিনি। ওয়ার্ড নম্বর চারে ভর্তি থাকা কল্যাণী দেবীকে আমি দেখতে এসেছি।" ম্যানেজার অবাক হয়ে পেছনে তাকালেন। নিরঞ্জন মিত্রকে দেখে তিনি চিনতে পারলেন, "আরে মিত্রবাবু! আপনি এনাদের নিয়ে এসেছেন? কিন্তু কল্যাণী দেবীর শরীর তো আজ একদম ভালো নেই। কাল রাত থেকে খাওয়াদাওয়া বন্ধ, ওষুধ দেওয়া যায়নি..." কথাটা শোনামাত্রই অরিন্দমের বুকটা যেন ধক করে উঠল। তিনি আর কারো অনুমতির অপেক্ষা করলেন না। বাবাকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন সেবাশ্রমের স্যাঁতসেঁতে বারান্দা ধরে। চার নম্বর ওয়ার্ডের দরজাটা ছিল আধখোলা। ঘরের এক কোণে একটি মরচে ধরা লোহার খাটিয়া। সেই খাটিয়ায় মেঝের দিকে মুখ করে বসে আছেন এক কঙ্কালসার বৃদ্ধা। পরনে শতচ্ছিন্ন সাদা একখানা থান, মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো ও ধবধবে সাদা। শীর্ণ গাল দুটো ভেতরের দিকে বসে গেছে। বৃদ্ধার কোলের ওপর জড়ো করা একটি পুরোনো, ছেঁড়া কাপড়ের পুতুল। সেই পুতুলটাকে বুকে চেপে ধরে তিনি অবোধ্য সুরে বিড়বিড় করে গুনগুন করছেন— "ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি মোদের বাড়ি এসো... খোকা ঘুমোলো পাড়া জুড়োলো... খোকা আসবে, খোকা দুধ খাবে..." এই দৃশ্য দেখে অরিন্দম সেনের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। যে মা একসময় তাঁকে নিজের বুকের দুধ খাইয়ে বড় করেছিলেন, যিনি তাঁর একটু জ্বরে সারারাত শিয়রে বসে বাতাস করতেন, সেই মা আজ পঁচিশ বছর ধরে সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে এক টুকরো ছেঁড়া কাপড়ের পুতুলকে বুকে চেপে পাগলের মতো প্রলাপ বকছেন! অরিন্দমের চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। বুকফাটা এক হাহাকার গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল। তিনি ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলেন। বুটের শব্দ শুনে বৃদ্ধা চমকে উঠে পুতুলটাকে নিজের বুকের মধ্যে আরও শক্ত করে লুকিয়ে ফেললেন, যেন এই উর্দি পরা অচেনা মানুষটা তাঁর কোলের সন্তানকে ছিনিয়ে নিতে এসেছে! বৃদ্ধা ভয়ার্ত গলায় ভাঙা স্বরে বলে উঠলেন, "কে... কে তুমি? আমার খোকাকে নিতে এসেছ? না, না! আমি কাউকে দেব না... আমার খোকা ঘুমোচ্ছে... ট্রেনের নিচে পড়ে যায়নি আমার খোকা, ও বেঁচে আছে..." অরিন্দম আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি সোজা খাটিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। তাঁর দুহাত দিয়ে মায়ের সেই শুকিয়ে যাওয়া, শিরা ওঠা শীর্ণ হাত দুটো চেপে ধরলেন। "মা... ও মা! আমি তোমার কোনো পুতুল নিতে আসিনি গো মা! চেয়ে দেখো... আমি তোমার সেই খোকা... তোমার অরিন্দম!" অরিন্দমের গলা রুদ্ধ হয়ে এল। তিনি মায়ের কোলের ওপর মাথাটা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন, "মা, তোমার খোকা ফিরে এসেছে! পঁচিশ বছর পর তোমার বুকে ফিরে এসেছে মা! চেয়ে দেখো একবার!" বৃদ্ধা কল্যাণী দেবীর শরীরটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। 'খোকা' শব্দটা যেন কোনো এক গভীর জাদুমন্ত্রের মতো তাঁর মস্তিষ্ক আর অন্তরের বদ্ধ কপাটগুলোতে এক প্রচণ্ড ধাক্কা দিল। তাঁর চোখের ঘোলাটে দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল। তিনি কাঁপতে কাঁপতে কোলের পুতুলটা ফেলে দিলেন। তাঁর শীর্ণ আঙুলগুলো দিয়ে অরিন্দমের কপালের চুলগুলো সরালেন। সেই পুরোনো আঘাতের দাগ! বৃদ্ধার শুকনো ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপতে লাগল। বহু বছর ধরে স্মৃতি হারিয়ে ফেলা, বাকরুদ্ধ হয়ে থাকা এক মায়ের মাতৃত্ব যেন কোনো দৈব শক্তিতে আবার জেগে উঠল। বৃদ্ধা এক অমানুষিক আর্তনাদ করে উঠলেন— "অরি... অরিন্দম! আমার মানিক! আমার কোলজোড়া ধন!" কল্যাণী দেবী অরিন্দমকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। এক মা আর ছেলের কান্নায় পুরো সেবাশ্রমের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সেবাশ্রমের নার্স, ডাক্তার, কড়া পুলিশ অফিসাররা পর্যন্ত চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। নিরঞ্জন মিত্র দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। পঁচিশ বছরের এক মহাশ্মশান যেন আজ এক মুহূর্তে অমৃতের স্পর্শে পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠল! পর্ব ৬: রাজপ্রাসাদে আগমন, তনয়ার প্রণাম ও ঐতিহাসিক সংকল্প বিকেলের রক্তিম সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। জেলা পুলিশ সুপারের সরকারি বাংলোর প্রধান ফটক খুলে গেল। সাধারণত এসপির গাড়ি ঢুকলে গার্ডরা অ্যালার্ট হয়ে দাঁড়িয়ে স্যালুট দেয়, কিন্তু আজকের দৃশ্য দেখে বাংলোর সমস্ত নিরাপত্তা কর্মী আর কর্মচারীরা স্তব্ধ হয়ে গেল। গাড়ি থেকে প্রথমে নামলেন এসপি অরিন্দম সেন। তারপর তিনি পরম মমতায় হাত ধরে নামালেন এক জীর্ণ ধুতি পরা বৃদ্ধকে, আর অন্য হাত দিয়ে আগলে ধরে নামালেন সাদা থান পরা, কঙ্কালসার এক বৃদ্ধাকে। সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন অরিন্দমের স্ত্রী তনয়া। তনয়া ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে এবং পেশায় কলেজের অধ্যাপিকা। তিনি স্বামীর চোখে এমন অশ্রু আর মুখের এমন এক অপার্থিব আনন্দের দীপ্তি আগে কখনো দেখেননি। তনয়া বিস্ময়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "অরিন্দম! এনারা কারা? কী হয়েছে?" অরিন্দম চোখের জল মুছতে মুছতে এক অনাবিল তৃপ্তি নিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "তনয়া, আজ আমার ভগবানকে ঘরে নিয়ে এসেছি। যাঁর কথা ভেবে আমি প্রতিটি রাতে বালিশ ভিজিয়েছি, সেই আমার জন্মদাতা বাবা আর মা! পঁচিশ বছর আগের সেই কালরাতের ট্রেন দুর্ঘটনায় এঁরা হারিয়ে যাননি তনয়া... আমার বাবা-মা আজ আমার ঘরে ফিরে এসেছেন!" কথাটা শোনামাত্রই তনয়ার চোখে পলকে জল নেমে এল। স্বামীর শৈশবের লড়াই, অনাথ আশ্রমের বেদনা আর বাবা-মায়ের জন্য বুকের ভেতর বয়ে বেড়ানো হাহাকার তনয়া প্রতিদিন খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে, নিজের সিল্কের শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে দিয়ে তনয়া সোজা নিরঞ্জন মিত্র ও কল্যাণী দেবীর পায়ের ওপর মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। তনয়া কেঁদে ফেলে বললেন, "বাবা... মা! আজ আমাদের ঘর তীর্থক্ষেত্র হয়ে গেল। আমার স্বামী আজ আর অনাথ নন, আজ উনি পরিপূর্ণ।" নিরঞ্জন মিত্র ও কল্যাণী দেবী কাঁপতে থাকা হাত দুটো পুত্রবধূর মাথায় রেখে অস্ফুট স্বরে আশীর্বাদ করলেন। বৃদ্ধার চোখ দিয়ে তখনও আনন্দাশ্রু ঝরছিল। বহু বছর পর তিনি যেন নিজের ঘরে ফেরার স্বাদ পেলেন। সেই রাতেই পুরো বাংলোয় এক নতুন জীবনের সূচনা হলো। অরিন্দম ও তনয়া নিজের হাতে বাবা-মাকে নতুন বস্ত্র পরিয়ে দিলেন। গরম সুস্বাদু খাবার সাজিয়ে অরিন্দম নিজে বসে বাবাকে খাওয়ালেন, তনয়া পরম যত্নে শাশুড়ি মায়ের মুখে এক একটি লোকমা তুলে দিলেন। সেবাশ্রম থেকে নিয়ে আসা দামি ওষুধের প্রেসক্রিপশন দেখে অরিন্দম জেলা সিভিল সার্জনকে রাতেই ডেকে পাঠালেন মায়ের সর্বোত্তম চিকিৎসার জন্য। পরদিন সকালে— জেলা কোতোয়ালি থানার চত্বরে এক বিশেষ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল। জেলার সমস্ত থানার ওসি, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর এবং স্থানীয় গণ্যমান্য সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মঞ্চের সামনে একটি আরামদায়ক সোফায় বসানো হয়েছিল নিরঞ্জন মিত্রকে। তাঁর পরনে নতুন পরিচ্ছন্ন খদ্দরের কুর্তা ও ধুতি। পাশে বসে আছেন কল্যাণী দেবী। মাইকের সামনে এসে দাঁড়ালেন জেলা পুলিশ সুপার অরিন্দম সেন। তাঁর কণ্ঠে আজ কোনো দাপট ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত বিনম্র প্রতিজ্ঞা। অরিন্দম মাইকে বললেন— "গতকাল পর্যন্ত আমি এই জেলার কেবল একজন খাকি উর্দি পরা পুলিশ অফিসার ছিলাম। কিন্তু আজ আমি নিজেকে গর্বের সাথে এক সন্তানের পরিচয় দিতে পারছি। গতকাল এই থানার দরজায় দাঁড়িয়ে আমার বাবাকে শুধু তাঁর ছেঁড়া জামার কারণে ভিক্ষুক বলে অপমান করা হয়েছিল। আজ আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে এই উর্দি ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করছি—এই জেলার প্রতিটি থানায় আজ থেকেই তৈরি হবে একটি করে 'সম্মান কক্ষ' (Elderly & Dignity Cell)। কোনো বয়োবৃদ্ধ, কোনো দিনমজুর, কোনো প্রান্তিক ছিন্নমূল মানুষ যদি অভিযোগ জানাতে আসেন, তাঁকে চেয়ারে বসিয়ে এক গ্লাস জল দিয়ে তাঁর কথা শুনতে হবে। যদি কোনো পুলিশ কর্মী ক্ষমতার দম্ভে কোনো সাধারণ মানুষের মর্যাদাহানি করে, তবে তাকে এই পুলিশ ডিপার্টমেন্টে এক মুহূর্তও বরদাস্ত করা হবে না। উর্দি আমাদের ক্ষমতা জাহির করার জন্য নয়, এই উর্দি হলো সেই সমস্ত মানুষের চোখের জল মোছানোর দায়িত্ব, যাঁরা নিজেদের লড়াইয়ে হেরে আমাদের কাছে বিচারের আশায় আসেন!" অরিন্দম সেনের বক্তব্য শেষ হতেই পুরো থানা প্রাঙ্গণ করতালির গর্জনে ফেটে পড়ল। উপস্থিত সাংবাদিকরা এই অভাবনীয় ঘটনাকে ক্যামেরাবন্দী করে রাখলেন। কনস্টেবল ভবতোষ ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দুহাত জোড় করে চোখের জলে এসপি সাহেবের বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার ভেতরের অন্ধ অহংকার আজ এক মানবিক পিতার চরণে চিরতরে সমর্পিত হয়েছিল। পরের দিন শহরের প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বড় বড় হরফে শিরোনাম ছাপা হলো— "থানায় ভিখারি ভেবে অপমানের পর এসপির হারানো বাবার সন্ধান: মানবিকতার নতুন দিগন্ত রচনা করলেন আইপিএস অরিন্দম সেন।" আর সেই জেলা বাংলোর বাগানে বসে মিষ্টি রোদের আলোয় নিরঞ্জন মিত্র তাঁর স্ত্রীর হাত ধরে পরম শান্তিতে হাসছিলেন। কারণ তাঁরা জানতেন, তাঁদের পঁচিশ বছরের রক্তক্ষয়ী তপস্যা আজ বৃথা যায়নি—তাঁদের খোকা শুধু দেশের বড় অফিসার হয়নি, সে এক খাঁটি সোনার মানুষ হয়ে ঘরে ফিরেছে।

পরদিন সকাল। কোতোয়ালি থানার চত্বরে এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্য। সাধারণ দিনের চেয়ে আজকের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। পুলিশ লাইন্স ও জেলার প্রতিটি ফাঁড়ি থেকে সার্কেল ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর এবং কনস্টেবলদের বিশেষ সমন পাঠিয়ে ডেকে পাঠানো হয়েছে। থানার সামনে ভিড় জমিয়েছেন স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানরা।

সবার মনে একটাই কৌতূহল—হঠাৎ কেন এই জরুরি অধিবেশন?

সকাল দশটা বাজতেই পুলিশ সুপারের গাড়ি এসে থামল। তবে আজ গাড়ি থেকে এসপি অরিন্দম সেন একা নামলেন না। তিনি পরম যত্নে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনলেন তাঁর অশীতিপর পিতা নিরঞ্জন মিত্র এবং মা কল্যাণী দেবীকে। নিরঞ্জনবাবুর পরনে ছিল শুভ্র খদ্দরের পাজামা-পাঞ্জাবি আর কল্যাণী দেবীর পরনে স্নিগ্ধ তাঁতের শাড়ি। পিতা-মাতার হাত ধরে স্বয়ং জেলার পুলিশ প্রধান ধীর পদক্ষেপে থানার মূল বারান্দায় তৈরি অস্থায়ী মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন।

উপস্থিত সমস্ত পুলিশ কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে টানটান হয়ে স্যালুট ঠুকলেন। কনস্টেবল ভবতোষ এক কোণে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে অশ্রু সংবরণ করছিল।

মঞ্চে উঠে মাইকের সামনে দাঁড়ালেন অরিন্দম সেন। তাঁর চোখে-মুখে এক শান্ত অথচ অটল সংকল্পের দীপ্তি। পুরো চত্বরে পিনপতন নীরবতা নেমে এল।

অরিন্দম মাইকে বলতে শুরু করলেন—

"উপস্থিত সহকর্মী এবং সাংবাদিক বন্ধুরা, গতকাল পর্যন্ত আমি আপনাদের কাছে ছিলাম শুধুই একজন জেলা পুলিশ সুপার—আইন ও শৃঙ্খলার প্রতীক। কিন্তু আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে একজন কৃতজ্ঞ সন্তান। যে বৃদ্ধ পিতাকে গতকাল এই থানারই দরজায় দাঁড়িয়ে ছেঁড়া জামা দেখে 'ভিখারি' ভেবে অপমানিত হতে হয়েছিল, তিনি অন্য কেউ নন—তিনি আমার জন্মদাতা পিতা। আর তাঁর সেই অপমান কোনো ব্যক্তির নয়, আমাদের গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখে এক নির্মম চপেটাঘাত।"

উপস্থিত পুলিশ মহলে তখন অপরাধবোধের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।

অরিন্দম সেন তাঁর গম্ভীর কণ্ঠে যোগ করলেন—

"আমরা আইন রক্ষা করি, কিন্তু সেই আইনের মূল ভিত্তি যদি মানবতা না হয়, তবে আমাদের এই উর্দির কোনো মূল্য নেই। যে বয়স্ক মানুষগুলো সারাজীবন রক্তজল করে এই সমাজ গড়ে তুলেছেন, তাঁদের জীবনের শেষ বেলায় সামান্য অভিযোগ দায়ের করতে এসে কেন ধমক আর অবহেলার শিকার হতে হবে? তাই আজ থেকে এই জেলায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে।"

এসপি অরিন্দম সেন মঞ্চের ডানদিকের সুসজ্জিত এক নতুন কক্ষের দিকে ইশারা করলেন। দরজার ওপরে সোনালি হরফে লেখা ফলক—'শ্রদ্ধা ও সম্মান কক্ষ' (Senior Citizens Dignity Cell)।

"আজকের দিন থেকে এই জেলার প্রতিটি থানায় চালু হলো এই 'সম্মান কক্ষ'। কোনো প্রবীণ নাগরিক বা সহায়হীন মানুষ থানায় এলে তাঁদের আর সাধারণ ডেস্কে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে না। তাঁদের বসিয়ে পানীয় জল ও চা পরিবেশন করা হবে, অফিসার নিজে গিয়ে তাঁদের পাশে বসে অভিযোগ নথিভুক্ত করবেন। আর এই কক্ষটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন আমার পিতা শ্রী নিরঞ্জন মিত্র এবং আমার মা কল্যাণী দেবী।"

চারদিক থেকে করতালির রোল উঠল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে ভেসে গেল প্রাঙ্গণ। নিরঞ্জন মিত্র কাঁপাকাঁপা হাতে লাল ফিতে কেটে কক্ষটির শুভ উদ্বোধন করলেন। বৃদ্ধের চোখ বেয়ে তখন গড়িয়ে পড়ছে পরম তৃপ্তির আনন্দাশ্রু।

তিনি শুধু মাইকের কাছে এসে বললেন, "ভগবান যেন কোনো সন্তানকে তাঁর মা-বাবার কাছ থেকে এভাবে আলাদা না করেন। আর এই দেশের কোনো বৃদ্ধ পিতা যেন বিচার চাইতে এসে চোখের জল না ফেলেন।"

অনুষ্ঠান শেষে কনস্টেবল ভবতোষকে অরিন্দম নিজে ডেকে নিলেন। অরিন্দম বললেন, "ভবতোষবাবু, আপনার কোনো বিভাগীয় শাস্তি হচ্ছে না। তবে আজ থেকে এই সম্মান কক্ষের প্রধান সহায়কের দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো। আশা করি, আপনার হাতে আর কোনো নিরঞ্জন মিত্রকে অপমানিত হতে হবে না।"

ভবতোষ হাত জোড় করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, "স্যার, সারাজীবন আমি এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব মানুষের সেবা করে।"

দুপুরের নরম রোদ্দুর তখন ছড়িয়ে পড়েছে কোতোয়ালি থানার অঙ্গনে। বাবার কাঁধে হাত রেখে মায়ের হাতটি পরম নির্ভরতায় জড়িয়ে বাংলোর দিকে ফিরে চললেন অরিন্দম।

পঁচিশ বছরের দীর্ঘ বিচ্ছেদ, হাহাকার আর অন্ধকার পেরিয়ে এক পরিবার শুধু আবার একসঙ্গেই হলো না—সেই অশ্রুভেজা মিলন জন্ম দিল এক নতুন মানবিক ব্যবস্থার, যা যুগে যুগে প্রবীণদের সম্মান ও সুরক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।