গরিব মেকানিক ভেবে স্বামীকেই ডিভোর্স দিল IPS স্ত্রী... কিন্তু লোকটার আসল পরিচয় কী ছিল?
শহরের এক কোণে পুরোনো টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট একটা গ্যারেজ—"রুদ্র অটো ওয়ার্কস"। বাতাসে পোড়া মোবিল, গ্রিজ আর পেট্রোলের ঝাঁঝালো গন্ধ।
ভাঙা একটা ট্রাকের নিচে শুয়ে রেঞ্জ দিয়ে নাট টাইট করছিল রুদ্র। তার পরনে একটা তালি মারা নীল রঙের জীর্ণ শার্ট, যার হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চুলে ধুলোবালি, কপালে আর গালে কালো গ্রিজের দাগ। বাইরে থেকে তাকে দেখে যে কেউ বলবে বিশ-বাইশ হাজার টাকা আয়ের এক ছাপোষা মোটর মেকানিক। কিন্তু সেই ময়লা শার্টের নিচে যে পাথরের মতো শক্ত পেশিবহুল বুক, সেখানে রয়ে গেছে আটটি বুলেটের দাগ আর কাশ্মীর উপত্যকার বরফে রক্ত ঝরানোর ক্ষত—তা এই শহরের কাকপক্ষীও জানত না।
রুদ্র চৌধুরী—ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারা স্পেশাল ফোর্সেসের দুর্ধর্ষ প্যারা-কমান্ডো মেজর। দেশের জাতীয় সুরক্ষায় স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের গোপন অপারেশনের প্রধান চালিকাশক্তি। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় ছাড়া তার আসল পরিচয় সবার কাছে গোপন।
"রুদ্র! বলি কানে কি তুলো গুঁজে বসে আছিস? বাইরে বেরো হতভাগা!"
বাইরে থেকে তীব্র কর্কশ গলায় ডেকে উঠলেন রুদ্রর শাশুড়ি মালিনী দেবী। সাথে অনন্যার ছোট ভাই বিক্রম।
রুদ্র ট্রলির ওপর শুয়েই গাড়ির তলা থেকে ধীরেসুস্থে বেরিয়ে এল। ময়লা কাপড় দিয়ে হাত মুছতে মুছতে শান্ত গলায় বলল, "কী হয়েছে মা? অনন্যার ইউপিএসসি-র রেজাল্ট কি বেরিয়েছে?"
বিক্রম এক তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে পা দোলাতে দোলাতে বলল, "হ্যাঁ রে মেকানিক বাবু! দিদি অল ইন্ডিয়া র্যাংক করেছে! আইপিএস অফিসার হয়ে গেছে! এখন বোঝ তুই কোন ড্রেনে পড়ে আছিস আর আমার দিদি কোন স্বর্গে পৌঁছে গেছে! তোর মতো মূর্খ, গ্রিজ মাখা লোকের সাথে আমার দিদির বিয়ে হওয়াটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল!"
মালিনী দেবী মুখ বেঁকিয়ে বললেন, "তোর ওই নোংরা হাত যেন আজ অনন্যার গায়ে না লাগে! সারা বাড়ি মেহমানে ভরে গেছে। তোর মতো ভিখারির পাশে দাঁড়ালে আমাদের ইজ্জত থাকবে না। মিষ্টির প্যাকেটগুলো গাড়িতে তোল, চল বাড়ি!"
রুদ্রর চোখের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণতা খেলে গেল, কিন্তু সে টু শব্দটি করল না। সে কাউকে বলেনি—গত চার বছর ধরে অনন্যা যখন রাত জেগে সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন দিল্লির সবচেয়ে সেরা স্টাডি মেটিরিয়াল, মক টেস্টের গোপন প্রশ্নপত্র আর গোপনে দেশের সেরা আইপিএস ট্রেনারদের গাইডেন্স কীভাবে আসত। রুদ্র তার বিশেষ সামরিক যোগাযোগ আর বেতনের গোপন ফান্ড দিয়ে প্রতি মাসে নিঃশব্দে অনন্যার সব স্বপ্ন পূরণ করেছে, যাতে অনন্যার মনে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি না হয়।
সন্ধ্যায় অনন্যাদের দোতলা বাড়ির সামনে আলোর রোশনাই। স্থানীয় কাউন্সিলর, নামীদামি অফিসার আর আত্মীয়স্বজনে বাড়ি গিজগিজ করছে। অনন্যা দাঁড়িয়ে ছিল ড্রয়িংরুমের কেন্দ্রবিন্দুতে। হালকা নীল রঙের সিল্কের শাড়িতে তাকে এক অপরূপা, আত্মবিশ্বাসী তরুণী মনে হচ্ছিল।
রুদ্র এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল সাধারণ একটা ধোয়া শার্ট পরে।
সবাই যখন অনন্যাকে মালা পরাচ্ছিল, অনন্যা হঠাৎ রুদ্রর দিকে তাকাল। অনন্যার চোখে তখন আর সেই কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি নেই—যে দৃষ্টিতে সে একদিন বলেছিল, "রুদ্র, তুমি পাশে না থাকলে আমি মরে যেতাম।" আজ সেই চোখে কেবল ক্ষমতার অহংকার আর রুদ্রর সাধারণ বেশভূষার প্রতি এক গোপন বিরক্তি।
অনন্যা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে শক্ত গলায় বলল, "রুদ্র, তুমি এখানে কী করছ? দেখছ না মিডিয়ার লোক আর বড় বড় অফিসাররা এসেছে? তোমার এই ছেঁড়া জুতো আর মলিন চেহারা দেখে সবাই কী ভাববে? তুমি পেছনের ঘরে গিয়ে বসো, প্লিজ আমাকে সবার সামনে ছোট কোরো না!"
রুদ্র স্তব্ধ হয়ে অনন্যার চোখের দিকে তাকাল। যে মানুষটার পায়ের তলায় সে নিজের জীবনটা বিছিয়ে দিয়েছিল, আজ সেই মানুষটাই তাকে পেছনে লুকিয়ে রাখতে চাইছে।
রুদ্র শুধু শান্ত গলায় বলল, "অভিনন্দন অনন্যা। তুমি দেশের একজন বড় রক্ষক হতে যাচ্ছ। মনে রেখো, ক্ষমতার চেয়ে মানুষের মর্যাদা অনেক বড়।"
অনন্যা ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত হয়ে চলে গেল। রুদ্র ধীরে ধীরে পেছনের বারান্দার অন্ধকারে গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার পকেটের এক বিশেষ স্যাটেলাইট ফোন মৃদু কম্পনে কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে ফুটে উঠল একটি সাংকেতিক নম্বর—HQ-ALPHA-RED।
রুদ্র রিসিভার কানে তুলল। মুহূর্তে তার গলার স্বর বদলে গেল—এক শান্ত মেকানিকের গলা থেকে তা রূপ নিল এক গম্ভীর, বজ্রকঠিন সেনাপতির কণ্ঠে।
"মেজর রুদ্র স্পিকিং।"
ওপাশ থেকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার (NSA) কন্ঠ ভেসে এল, "মেজর রুদ্র, সীমান্তে পরিস্থিতি জটিল। আন্ডারওয়ার্ল্ড ও বিদেশি স্লিপার সেলের একটি মারাত্মক অস্ত্র চালান শহরে প্রবেশ করেছে। উই নিড ব্ল্যাক প্যান্থার ইউনিট রেডি অন স্ট্যান্ডবাই। কোড নেম: রেড ডন।"
রুদ্র ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, "অপারেশন রেডি স্যার। দ্য হান্টার ইজ অলওয়েজ প্রিপেয়ার্ড।"
ছয় মাস পরের ঘটনা।
অনন্যা চৌধুরী এখন জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অ্যাডিশনাল এসপি)। সরকারি কোয়ার্টারে তার জন্য বরাদ্দ হয়েছে বিরাট বাংলো, সামনে পুলিশের গার্ড আর বাড়ির গেটে দিনরাত টহল দিচ্ছে সশস্ত্র কনস্টেবলরা। অনন্যার গাড়ি এখন নীল বাতি লাগানো সাদা এসইউভি।
কিন্তু সেই বাংলোর আউটহাউসের পাশের একটা ছোট ঘরে থাকত রুদ্র। অনন্যা নিজের ডিপার্টমেন্টে কাউকে জানতে দেয়নি যে তার স্বামী একজন মেকানিক। সবাইকে বলে রেখেছিল—তার স্বামী সাধারণ ছোটখাটো ব্যবসায়ী।
সেদিন সকালে অনন্যা ডাইনিং টেবিলে বসে কফি খাচ্ছিল। তার পরনে কড়া ইস্ত্রি করা খাকি পুলিশ উর্দি, কাঁধে জ্বলজ্বল করছে অশোকস্তম্ভ আর রূপোলি ব্যাজ।
মালিনী দেবী টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে দিতে দিতে বলছিলেন, "অনন্যা, আজ তোর ডিআইজি রাজেশ শর্মা সাহেব তোদের কোয়ার্টারে আসার কথা না? উনি তো বলছিলেন তোকে এসপি হিসেবে পদোন্নতি পাইয়ে দেওয়ার ফাইল রেডি করছেন।"
অনন্যা গর্বের সাথে বলল, "হ্যাঁ মা। রাজেশ স্যার আমার কাজের খুব প্রশংসা করেন। আজ বিকেলে উনি নিজেই হোম ভিজিটে আসছেন।"
ঠিক তখনই সদর দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকল রুদ্র। তার হাতে বাজারের একটা সাধারণ থলি—তাতে টাটকা শাকসবজি আর অনন্যার প্রিয় তাজা ফল। রুদ্র সারারাত না ঘুমিয়ে সকালে সাইকেলে করে বাজারে গিয়েছিল শুধু অনন্যার পছন্দের ফল আনতে।
অনন্যা কড়া চোখে রুদ্রর দিকে তাকাল।
"তুমি এই নোংরা বাজারের থলি নিয়ে সদর দরজা দিয়ে কেন ঢুকলে? তোমাকে কতবার বলেছি সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের পেছনের দরজা ব্যবহার করতে? আমার পুলিশ গার্ডরা বাইরে পাহারা দিচ্ছে, তারা তোমাকে দেখলে কী ভাববে?"
রুদ্র দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো রাগ ছিল না, ছিল গভীর ক্ষত।
"অনন্যা, এটা তোমার স্বামীর বাড়ি। গার্ডরা জানে আমি তোমার স্বামী। লুকিয়ে থাকাটা আমার স্বভাব নয়।"
"স্বামী?" টেবিলে কফির কাপটা সশব্দে আছড়ে রাখল অনন্যা। তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল।
"কোন যোগ্যতায় নিজেকে আমার স্বামী বলছ রুদ্র? এই সমাজে তোমার আর আমার কোনো তুলনা আছে? আমি একজন আইপিএস অফিসার, আর তুমি দিনে পাঁচশো টাকা রোজগার করা একটা তেলচিটে মেকানিক! আমার ব্যাচমেটদের স্বামীরা কেউ বড় আইএএস, কেউ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সিইও... আর আমার কপালে জুটলে তুমি! তোমার পাশে দাঁড়াতে আমার লজ্জা হয়, ঘেন্না করে!"
ঘরের বাতাস এক নিমেষে বরফ হয়ে গেল।
মালিনী দেবী পাশ থেকে সুর মেলালেন, "ঠিকই তো বলছে অনন্যা! তোর লজ্জা থাকা দরকার বাপু! পরের ঘাড়ে বসে বসে বড় বড় কথা বলা!"
রুদ্র বাজারের থলিটা ডাইনিং টেবিলের এক কোণে রাখল। তারপর অনন্যার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সেই দৃষ্টির ভেতর এমন এক অদ্ভুত তীব্রতা আর হিমশীতল শূন্যতা ছিল যে অনন্যা কিছুক্ষণের জন্য ভেতরে কেঁপে উঠল।
রুদ্র খুব শান্ত, নিচু গলায় বলল, "অনন্যা, যে উর্দির শক্তিতে আজ তুমি এত অন্ধ হয়ে গেছ, সেই উর্দির মর্যাদা আর ত্যাগের পরিধি তুমি এখনো জানো না। উর্দি মানুষকে ন্যায় দিতে শেখায়, কাউকে ছোট করতে নয়। যেদিন এই উর্দির আসল মূল্য দিতে হবে, সেদিন যেন তোমার চোখের অহংকার এভাবে কথা না বলে।"
"আমাকে জ্ঞান দিও না!" অনন্যা চিৎকার করে উঠল, "আজ বিকেলে ডিআইজি স্যার আসছেন। খবরদার, তুমি যেন এই বাড়ির সীমানায় না থাকো! তোমার এই চেহারা যদি স্যারের সামনে পড়ে, তবে আমি তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেব!"
রুদ্র আর একটি কথাও বলল না। সে ধীরে ধীরে নিজের ছোট ঘরে চলে গেল।
বিকেল চারটে।
ডিআইজি রাজেশ শর্মার কনভয় এসে থামল বাংলোর সামনে। রাজেশ শর্মা—পঞ্চাশোর্ধ্ব, মুখে চতুর হাসি আর অত্যন্ত ধূর্ত স্বভাবের লোক। আড়ালে সে আন্তর্জাতিক ড্রাগ সিন্ডিকেট ও মাফিয়া ডন কালরাতের সাথে যুক্ত।
অনন্যা হাসিমুখে ড্রয়িংরুমে রাজেশ শর্মাকে অভ্যর্থনা জানাল।
কথাবার্তার মাঝে রাজেশ শর্মা মুচকি হেসে বলল, "অনন্যা, ইউ আর অ্যান আউটস্ট্যান্ডিং অফিসার। তবে এই শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাং 'কে-সিন্ডিকেট' নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়ো না। ওদের হাত অনেক লম্বা। আমি চাই তুমি আমাদের ডিপার্টমেন্টের নিয়ম মেনে চলো।"
অনন্যা দৃঢ় গলায় বলল, "না স্যার, আমি কোনো অপরাধীকে ছাড়ব না। আমি নিজ হাতে কালরাতকে গ্রেপ্তার করব।"
রাজেশ শর্মার চোখে এক কুটিল শয়তানি খেলে গেল। সে মনে মনে হাসল—এক আনাড়ি অহংকারী মেয়েকে কীভাবে ফাঁদে ফেলতে হয়, তা তার ভালো করেই জানা।
চা খাওয়ার সময় রাজেশ শর্মা হঠাৎ বাইরে বাগানের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।
বাংলোর পেছনের গেটে দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র। তার পরনে সাধারণ পোশাক, কিন্তু সে যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল—টানটান মেরুদণ্ড, দুই পা সমান্তরাল, হাত দুটো স্বাভাবিকভাবে শরীরের পাশে রাখা—এটা সাধারণ কোনো নাগরিকের শারীরিক ভাষা নয়। এটা একমাত্র উচ্চপদস্থ স্পেশাল ফোর্সেসের দুর্ধর্ষ কমান্ডোদের ‘স্ট্যান্ড-অ্যাট-ইজ’ পজিশন!
রাজেশ শর্মার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। তার মনে হলো, সে যেন এই অবয়বকে কোথাও দেখেছে। কোনো এক অত্যন্ত গোপনীয় সামরিক ট্রায়ালে... নাকি কোনো টপ-সিক্রেট ব্ল্যাক ক্যাট ইউনিটের ভিডিও ফাইলে?
রাজেশ শর্মা ভ্রু কুঁচকে অনন্যাকে জিজ্ঞেস করল, "অনন্যা... ওই ছেলেটি কে?"
অনন্যা অপ্রস্তুত হয়ে মুখ কালো করে বলল, "ও কেউ না স্যার... আমাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়, গ্যারেজে ফাইফরমাশ খাটে। ওর মাথায় একটু সমস্যা আছে।"
রাজেশ শর্মা মুচকি হাসল, কিন্তু তার চোখের সন্দেহ দূর হলো না।
আর পেছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্র তখন পকেট থেকে তার ছোট কমব্যাট ডায়েরি বের করে একটি নাম নোট করল: "টার্গেট ৩: ডিআইজি রাজেশ শর্মা — কে-সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ সহায়তাকারী।"
শিকার আর শিকারির খেলা তখন অলক্ষ্যেই শুরু হয়ে গেছে…
শহরের সবচেয়ে দামি ফাইভ-স্টার হোটেল "দ্য গ্র্যান্ড ইম্পেরিয়াল"-এ সে রাতে আয়োজন করা হয়েছিল পুলিশের বার্ষিক চ্যারিটি বল ও সিভিল রিসেপশন। জেলার শীর্ষ আইএএস, আইপিএস অফিসার, মন্ত্রী এবং বড় বড় করপোরেট কর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
অনন্যা পরেছিল গাঢ় নীল রঙের জমকালো সিল্কের শাড়ি। কাঁধে আইপিএস অফিসারের মেডেল না থাকলেও চোখে-মুখে ছিল শাসকসুলভ দম্ভ। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল তার স্বামীর। কিন্তু অনন্যা তাকে প্রকাশ্যে আনতে চরম লজ্জা পাচ্ছিল।
বিকেলবেলা বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে অনন্যা রুদ্রকে অত্যন্ত কঠোর গলায় বলে এসেছিল, "তুমি যদি ভুলেও ওই পার্টিতে যাও, তবে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না। কোনো ভালো স্যুট পরলেও তোমার ওই গ্রিজমাখা কালো হাত আর মেকানিকের শরীরের গন্ধ মুছবে না। আমি সবার কাছে বলেছি আমার স্বামী বাইরে থাকেন।"
রুদ্র তখন তার ছোট ঘরে বসে পুরোনো চামড়ার বুট পরিষ্কার করছিল। সে কোনো প্রতিবাদ করেনি, শুধু এক পলক তার পাথর-কঠিন চোখ তুলে অনন্যার দিকে তাকিয়েছিল। সেই চোখে ছিল এক গোপন কষ্ট, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল এক সতর্কবার্তা।
তবুও রুদ্র সেই পার্টিতে গিয়েছিল। কোনো স্বামীর পরিচয়ে নয়—তার স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং সিস্টেম জানিয়েছিল যে "কে-সিন্ডিকেট"-এর স্নাইপাররা ওই পার্টিতেই ডিআইজি রাজেশ শর্মার সঙ্গে কোনো গোপন ষড়যন্ত্র করতে চলেছে এবং সেখানে অনন্যা ছিল তাদের অজান্তেই পাতা এক ফাঁদের টার্গেট। রুদ্রর পরনে ছিল হোটেলের সাধারণ মেইনটেন্যান্স স্টাফের ইউনিফর্ম, মাথায় ক্যাপ নিচে নামানো।
পার্টির মাঝখানে ক্রিস্টাল গ্লাসের টুংটাং শব্দ আর আভিজাত্যের হাসির ফোয়ারার মাঝে অনন্যা ডিআইজি রাজেশ শর্মার সঙ্গে কথা বলছিল। ডিআইজি কুটিল হেসে বলল, "অনন্যা, তোমার মতো প্রতিভাবান অফিসারের পাশে একজন ক্ষমতাশালী মানুষ মানায়, কোনো অখ্যাত রাস্তার মানুষ নয়।"
ঠিক তখনই ট্রের ওপর খালি কাপ নিয়ে পাশ দিয়ে হেঁটে গেল রুদ্র। কারণ তার তীক্ষ্ণ নজর পড়েছিল দোতলার ভিআইপি বারান্দার এক ওয়েটারের ওপর, যার কাপড়ের ন্যাপকিনের তলায় লুকানো ছিল সাইলেন্সার লাগানো ৯এমএম পিস্তল!
রুদ্র নিঃশব্দে বারান্দার পিলারের দিকে এগিয়ে যেতেই অনন্যার চোখ পড়ল তার ওপর। অনন্যার মাথায় মুহূর্তেই আগুন জ্বলে উঠল। সে রাজেশ শর্মাকে এড়িয়ে পিলারের আড়ালে গিয়ে রুদ্রর হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
"তুমি এখানে? সাহস কী করে হলো তোমার, রুদ্র?!" অনন্যার গলার স্বর রাগে থরথর করে কাঁপছিল। "তুমি এখানে হোটেলের ঝাড়ুদারের ছদ্মবেশে এসেছ আমাকে বেইজ্জত করতে? আমার ওপর নজরদারি করছ? এত নিচু তোমার মানসিকতা?"
রুদ্র মাটির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু সতর্ক গলায় বলল, "অনন্যা, এখন শান্ত থাকো। চারদিকে চোখ তুলে তাকাও। দোতলার ওই স্টাফ সাধারণ কেউ নয়, ওরা সশস্ত্র হিটম্যান। টার্গেট তুমি হতে পারো। এখনই লবি ছেড়ে বাইরে যাও!"
"নাটক বন্ধ করো!" অনন্যার চোখ দিয়ে আগুন ঝরছিল। "আমার সামনে বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছ? আমি জেলার এসপি! আমাকে সুরক্ষা শেখাচ্ছ এক চুনোপুঁটি মেকানিক হয়ে? তোমার এই ভিখারির মতো মুখ দেখে আমার ঘেন্না হয়!"
রুদ্র অনন্যার হাত ধরে তাকে আড়ালে টানার চেষ্টা করল, "অনন্যা, বোঝার চেষ্টা করো, এটা রেড-লেভেল থ্রেট—"
চটাস!
এক প্রচণ্ড চড় এসে আছড়ে পড়ল রুদ্রর বাঁ গালে।
অনন্যা তার সমস্ত আক্রোশ দিয়ে রুদ্রর গালে হাত তুলে দিল। পিলারের আড়ালে হলেও সেই আঘাতের তীব্রতা ছিল মারাত্মক।
রুদ্র স্তব্ধ হয়ে গেল। যে হাত দিয়ে সে দেশের দুর্ধর্ষ শত্রুদের ঘাড় মটকে দিয়েছে, যার একটা ঘুঘিতে বুলেটপ্রুফ কাঁচ গুঁড়িয়ে যায়—সেই রুদ্র পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার গালে পাঁচটা আঙুলের লাল ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
অনন্যার চোখ দিয়ে ঘৃণা ঠিকরে বেরোচ্ছিল, "আমি অনন্যা চৌধুরী, আইপিএস অফিসার। আমার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস আর কোনোদিন দেখাবে না। বাড়ি গিয়ে ডিভোর্স ফাইলে সই করার প্রস্তুতি নাও। আমার জীবন থেকে তোমাকে বের করে দিলেই আমার মুক্তি!"
অনন্যা গটগট করে পার্টির আলোয় ফিরে গেল।
রুদ্র নিজের গালটা একবারও স্পর্শ করল না। তার মুখ এক অদ্ভুত শান্ত রূপ নিল—সেটা কোনো ক্ষমার শান্ত রূপ নয়, ঝড়ের আগের সমুদ্রের মতো এক হিমশীতল নিস্তব্ধতা।
তার কানের ভেতরের ক্ষুদ্র মাইক্রো-ট্রান্সমিটারে আওয়াজ বেজে উঠল:
"ঈগল ওয়ান টু শ্যাডো লিডার। স্নাইপার আপনার পেরিমিটার লক করছে। নির্দেশ দিন, স্যার।"
রুদ্রর চোখ দুটো শিকারি বাঘের মতো জ্বলে উঠল। সে অত্যন্ত বরফশীতল গলায় নির্দেশ দিল:
"পেরিমিটার ক্লিয়ার করো। আমার পরবর্তী কমান্ড ছাড়া যেন কেউ টার্গেট স্পর্শ না করে। এক্সিকিউট সাইলেন্ট সুইপ।"
রাত তখন প্রায় দুটো।
শহরের উপকণ্ঠে পরিত্যক্ত ডকইয়ার্ডের সাত নম্বর গোডাউন। চারদিকে মরিচা ধরা পুরোনো কন্টেইনার, ড্রেনের কালো পানিতে ডিজেলের গন্ধ আর আকাশ ভেঙে নামা ঝুম বৃষ্টি।
এটাই ছিল আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডন "কালরাত"-এর মূল গোপন ঘাঁটি, যেখান থেকে মিলিটারী-গ্রেডের বিস্ফোরক ও আরডিএক্স শহরের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছিল।
বাইরে পাহারা দিচ্ছিল প্রায় বিশজন ভারী অস্ত্রধারী ভাড়াটে গুন্ডা। প্রত্যেকের হাতে একে-৪৭, নাইট-ভিশন গগলস আর কমব্যাট ভেস্ট। তারা ভেবেছিল পুলিশ বা আধা-সেনা এখানে আসার সাহস পাবে না, কারণ ডিআইজি রাজেশ শর্মা নিজেই নিশ্চিত করেছিল যে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট পুরোপুরি শান্ত রয়েছে।
কিন্তু তারা জানত না—আজ পুলিশ আসছে না। আজ স্বয়ং যম নেমে আসছে।
ঠিক রাত ২:১৫ মিনিট।
মেঘের গর্জনের মাঝেই এক নিঃশব্দ বিপর্যয় নেমে এল। কোনো গাড়ি আসেনি।
ঘন কালো আকাশ চিরে প্যারাশুটে নেমে এল চারজন ব্ল্যাক ক্যাট প্যারা-কমান্ডো। মাথায় কার্বন-ফাইবার হেলমেট, ব্যালিস্টিক ফেস-মাস্ক আর হাতে সাইলেন্সার লাগানো তাভোর টিএআর-২১ রাইফেল।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে চওড়া কাঁধের যে কমান্ডো সামনে পা রাখল—তার বুলেটপ্রুফ প্লেট ক্যারিয়ারের বুকে সাঁটা একটি রক্তলাল প্যাচ: "প্যারা স্পেশাল ফোর্সেস — ৯ ব্যাটালিয়ন (ঘোস্ট কোর)"।
সে আর কেউ নয়, স্বয়ং মেজর রুদ্র চৌধুরী। এখন সে কোনো গ্যারেজের মেকানিক নয়, এখন সে এক সাক্ষাৎ ধ্বংসের প্রতিমূর্তি।
পফ! পফ! পফ!
সাইলেন্সার লাগানো রাইফেল থেকে আগুনের ফুলকি বেরোল। কন্টেইনারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দুই স্নাইপার টুঁ শব্দটি করার আগেই সোজা নিচে কাদার ওপর আছড়ে পড়ল।
"শত্রু এসেছে! ফায়ার!" এক জঙ্গি চিৎকার করতেই শেডের আলো জ্বলে উঠল। অন্ধের মতো একে-৪৭-এর গুলির বৃষ্টি শুরু হলো রুদ্রর দিকে।
রুদ্র ক্ষিপ্র গতিতে একটি স্টিল কন্টেইনারের আড়ালে স্লাইড করে পজিশন নিল। তার দিকে ধেয়ে আসা বুলেটগুলো কন্টেইনারের গায়ে লেগে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দিল।
রুদ্র তার ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট থেকে একটি স্টান গ্রেনেডের পিন টেনে নিখুঁত মাপে ছুড়ে দিল শেডের ভেতরে।
বুম!
অন্ধ করে দেওয়া সাদা আলো আর প্রচণ্ড কানফাটা শব্দে সামনের দুজন শুটার চোখ চেপে ধরে মাটিতে পড়ে গেল। সেই সুযোগে রুদ্র নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপর।
একজন তার রাইফেল সোজা করার আগেই রুদ্র তার কোমর থেকে বের করল বিশেষ কারাম্বিট ছুরি। চোখের পলকে এক আঘাতে শত্রুর হাতের টেন্ডন কেটে দিল, তার হাত থেকে অস্ত্রটি কেড়ে নিয়ে দ্বিতীয়জনের চোয়ালে নিজের কমব্যাট বুটের এমন এক বিধ্বংসী ফ্লাইং কিক মারল যে লোকটি ছিটকে গিয়ে দশ হাত দূরে পড়ল।
মটাস! হাড় ভেঙে যাওয়ার স্পষ্ট শব্দ হলো।
তৃতীয়জন পেছন থেকে ধারালো দা নিয়ে কোপ মারতে এসেছিল। রুদ্র পেছনে না তাকিয়েই এক অন্ধ রিভার্স এলবো-স্ট্রাইকে লোকটির পাঁজরের হাড় চুরমার করে দিল। লোকটি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, আর রুদ্র তার মাথা ধরে এক ঝটকায় সিমেন্টের মেঝের ওপর আছাড় মারল।
মাত্র পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডে সাতজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী মেঝের ওপর নিথর হয়ে স্তূপাকারে পড়ে রইল।
রুদ্র ধীর পদক্ষেপে গোডাউনের ভেতরের অন্ধকার অফিসে ঢুকল। সেখানে ছিল কালরাতের প্রধান অস্ত্র পাচারকারী—বিক্রমাদিত্য।
বিক্রমাদিত্য ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এক বন্দি সিকিউরিটি অফিসারের মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "দাঁড়িয়ে যা! এক পা এগোলে একে শেষ করে দেব! কে তুই? পুলিশ?"
রুদ্র থামল না। তার হাতে তখন দ্বৈত গ্লক-১৭ পিস্তল। কালো কমান্ডো মাস্কের আড়াল থেকে কেবল তার দুটি চোখ জ্বলছিল—সেই চোখে ছিল অমোঘ মৃত্যুর শীতলতা।
"আমি পুলিশ নই," রুদ্রর কণ্ঠস্বর এক ডিজিটাল ভয়েস মডুলেটরের মতো গম্ভীর শোনাল, "আমি তাদের শাস্তি, যাদের কাছে দেশের সাধারণ আইন পৌঁছাতে পারে না।"
বিক্রমাদিত্য ট্রিগার চাপতে যাচ্ছিল, কিন্তু রুদ্রর রিফ্লেক্স ছিল অতিমানবীয়।
ঠাস!
রুদ্রর একটিমাত্র বুলেট বিক্রমাদিত্যের ডান হাতের তালু ফুটো করে বেরিয়ে গেল। বন্দুকটা ছিটকে মেঝের ওপর পড়ে গেল।
পরের তিন সেকেন্ডে রুদ্র চিতাবাঘের মতো ছুটে এসে বিক্রমাদিত্যের গলা চেপে ধরে কন্টেইনারের লোহার দেয়ালের সাথে সজোরে আছাড় মারল। সেই আঘাতে লোহার পাত দেবে গেল।
রুদ্র তার বুট দিয়ে বিক্রমাদিত্যের বুক চেপে ধরে তার ল্যাপটপের মিলিটারি হার্ড ড্রাইভ আর এনক্রিপ্টেড স্যাটেলাইট ফোনটি ছিনিয়ে নিল।
হার্ড ড্রাইভের একটি এনক্রিপ্টেড অডিও ফাইল খুলতেই স্পিকারে ভেসে উঠল স্বয়ং ডিআইজি রাজেশ শর্মার পরিচিত কণ্ঠ:
"কালরাত ভাই, আইপিএস অনন্যাকে আমি জঙ্গলের বর্ডার ফাঁড়িতে একা পাঠাচ্ছি কোনো ব্যাকআপ ছাড়াই। ওখানে ওকে বন্দি করে টর্চার ভিডিও বানাও। যাতে সরকার বোঝে এই শহরের আসল রাজা কে।"
রুদ্রর চোখ দুটি মুহূর্তে জমাট বরফ হয়ে গেল।
অনন্যা... তার নিজের স্ত্রী। যে স্ত্রী একটু আগেই তাকে সবার সামনে চড় মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে, ডিভোর্সের হুমকি দিয়েছে—সেই স্ত্রীই এখন এক ভয়ংকর মৃত্যুর ফাঁদে পা বাড়িয়েছে!
রুদ্র তার সহকারী লেফটেনেন্টকে কড়া নির্দেশ দিল, "আহতদের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের হাতে তুলে দাও। বিস্ফোরক বাজেয়াপ্ত করো।"
লেফটেন্যান্ট স্যালুট ঠুকে জিজ্ঞেস করল, "স্যার, আপনার পরবর্তী গন্তব্য?"
রুদ্র তার মাস্কের ওপর থেকে বৃষ্টির পানি মুছে নিল। তার মুখে এখন কেবল এক পাথুরে সংকল্প। সে ট্যাকটিক্যাল জ্যাকেটের চেইন টেনে দৃঢ় কণ্ঠে বলল:
"হেলিকপ্টার প্রস্তুত করো। অনন্যা নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদে ঢুকে পড়েছে। তার সিকিউরিটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। প্যারা স্পেশাল ফোর্সেস এবার সরাসরি যুদ্ধে নামছে।"
পরের দিন সকাল। এসপি বাংলোর বাতাস ভারী আর থমথমে।
ড্রয়িংরুমের কাঁচের টি-টেবিলের ওপর রাখা একটা সাদা রঙের মোটা খাম। তার ওপর বড় বড় হরফে লেখা—"PETITION FOR DISSOLUTION OF MARRIAGE" (বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ)। টেবিলে কফির কাপ হাতে পাথরের মূর্তির মতো বসেছিল অনন্যা। তার পরনে কড়া ইস্ত্রি করা পুলিশি উর্দি, কিন্তু গতকাল রাতের পার্টির অপমান ও ক্ষোভের আগুন তার মুখে তখনও ধিকধিক করে জ্বলছিল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল রুদ্র। সারা রাতের ভয়াবহ কমান্ডো অপারেশনের ক্লান্তি তার মুখে এক ফোঁটাও নেই, তবে তার কাঁধে ঝুলছিল সেই সাধারণ পুরোনো কাপড়ের ব্যাগটি। তার পরনে আবারও সেই সাধারণ মেকানিকের জামা।
অনন্যা এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। খামটা আঙুল দিয়ে রুদ্রর দিকে ঠেলে দিয়ে বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বলল, "এখানে সই করো, আর এই মুহূর্তেই আমার জীবন থেকে, আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।"
রুদ্র শান্ত দৃষ্টিতে টেবিলের কাগজটির দিকে তাকাল। তার চোখের পলক পর্যন্ত কাঁপল না।
"অনন্যা, তুমি কি সত্যিই ভেবে দেখেছ তুমি কী করছ?" রুদ্র খুব নিচু, শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
"ভেবে দেখার আর কিছু বাকি নেই!" অনন্যা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ, "তোমার মতো এক অকর্মা, গ্যারেজের মেকানিককে আমার স্বামী বলে পরিচয় দিতে আমি ক্লান্ত। সমাজ, আমার কলিগ, আমার সিনিয়াররা আমার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকায়। তোমার এই মলিন মুখটা আমার সাফল্যের রাস্তায় সবচেয়ে বড় কলঙ্ক! কাল রাতে তুমি প্রমাণ করে দিয়েছ যে তোমার মধ্যে কোনো আত্মসম্মান নেই। অন্যের পার্টিতে ছিঁচকে চোরের মতো ঢুকে আমাকে ছোট করতে চেয়েছিলে!"
মালিনী দেবী ও ভাই বিক্রম পাশ থেকে হাততালি দিয়ে উঠল। বিক্রম বলল, "দিদি, এক লাখ টাকার ড্রাফট দিয়ে দে ওকে! এই ভিখারির দল তো টাকার জন্যই এতদিন ঝুলে ছিল!"
রুদ্র অনন্যার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সেই দৃষ্টির ভেতর কোনো কাতরতা ছিল না, ছিল এক পর্বতপ্রমাণ শূন্যতা। রুদ্র কলমটা তুলে নিল। এক সেকেন্ডও ইতস্তত না করে ডিভোর্স পেপারের নিচের পাতায় স্বাক্ষর করে দিল।
কাগজটা অনন্যার দিকে এগিয়ে দিয়ে রুদ্র বলল, "তুমি যা চেয়েছিলে, তা পেয়ে গেলে অনন্যা। ক্ষমতা আর পদের অহংকারে তুমি এতটাই অন্ধ যে আসল শত্রু আর আসল বন্ধুকে চিনতে পারছ না। মনে রেখো, আলো যখন চলে যায়, তখন নিজের ছায়াও সঙ্গ ছেড়ে দেয়। যেদিন তোমার এই মিথ্যে অহংকারের চশমা ভাঙবে, সেদিন যেন অনেক দেরি না হয়ে যায়।"
অনন্যা ব্যঙ্গ করে হেসে উঠল, "নিজের চরকায় তেল দাও মেকানিক বাবু। আমি একজন আইপিএস অফিসার, নিজের সুরক্ষা আমি নিজেই করতে পারি। তোমার মতো লোকের উপদেশের কোনো দরকার নেই।"
রুদ্র ব্যাগটি কাঁধে তুলে নিল। বাংলোর সদর দরজা দিয়ে ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল সে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই অনন্যার সরকারি ওয়্যারলেস সেটটি কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। ফোন এল স্বয়ং ডিআইজি রাজেশ শর্মার কাছ থেকে।
"অনন্যা! ইমার্জেন্সি!" ওপাশ থেকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন নাটকীয় কণ্ঠে বললেন রাজেশ শর্মা, "কে-সিন্ডিকেটের মূল পান্ডা কালরাত তার দলবল নিয়ে শহরের উত্তর সীমান্তের 'কালীঘাট জঙ্গল' সংলগ্ন পুরোনো কারখানায় আশ্রয় নিয়েছে। আমাদের ইনফর্মার নিশ্চিত করেছে যে কালরাত একাই আছে। পুরো পুলিশ ফোর্স নিয়ে গেলে ওরা সতর্ক হয়ে পালাবে। তুমি একটা ছোট টিম নিয়ে এখনই রওনা দাও। যদি তুমি একা এই রেইড সফল করতে পারো, তবে কাল সকালেই তোমার এসপি হিসেবে প্রোমোশন কনফার্ম!"
অনন্যার চোখ লোভে আর উচ্চাকাঙ্ক্ষায় চকচক করে উঠল। কালরাতকে একা গ্রেপ্তার করা মানে গোটা রাজ্যে ইতিহাস তৈরি করা!
অনন্যা সোজা উত্তর দিল, "ইয়েস স্যার! আমি এখনই চারজন কনস্টেবল আর একটা জিপ নিয়ে স্পটে পৌঁছাচ্ছি।"
অনন্যা বুঝতেই পারল না—যে ডিআইজিকে সে তার অভিভাবক মনে করত, সেই রাজেশ শর্মাই তাকে আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডন কালরাতের ক্ষুধার্ত নেকড়েদের মুখে বলি দেওয়ার জন্য ছুড়ে দিচ্ছে।
দুপুর দুটো। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। অসময়ের ঝোড়ো বাতাস আর হালকা বৃষ্টিতে ভিজে উঠছে পুরোনো বন্ধ হয়ে যাওয়া জুট মিলের কারখানা। চারিদিকে দশ ফুট উঁচু জঙ্গল আর কাঁটাতার।
অনন্যার পুলিশের জিপটি কারখানার ভাঙা গেটের সামনে এসে থামল। সঙ্গে মাত্র চারজন কনস্টেবল, হাতে সাধারণ থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল।
অনন্যা রিভলভার বের করে লোড করল। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে পা বাড়াল কারখানার অন্ধকার শেডের দিকে। "কেউ গুলি চালাবে না যতক্ষণ না আমি নির্দেশ দিচ্ছি," অনন্যা নির্দেশ দিল।
কিন্তু শেডের ভেতরে ঢুকতেই অনন্যার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
চারিদিক অদ্ভুত রকম নিস্তব্ধ। কোনো সাধারণ শ্রমিক বা পাহারাদার নেই। শুধু মেঝের ওপর পড়ে আছে কিছু ব্যবহৃত বুলেটের খোসা।
হঠাৎই— ধড়াম!
পেছনের বিশাল লোহার গেটটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। ভারী লোহার শেকলের শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। ছাদের জং ধরা প্ল্যাটফর্ম আর অন্ধকার কোণগুলো থেকে একে একে বেরিয়ে এল প্রায় তিরিশ-চল্লিশ জন মুখোশধারী ভারী অস্ত্রধারী জঙ্গি ও সুপারি কিলার। প্রত্যেকের হাতে রাশিয়ান একে-৪৭ এবং স্বয়ংক্রিয় সাব-মেশিনগান। লেজার সাইটের লাল বিন্দুগুলো এসে পড়ল অনন্যার কপাল ও বুকে।
"অ্যামবুশ! পজিশন নাও!" অনন্যা চিৎকার করে ওঠার আগেই পেছনের কনস্টেবল চারজন আতঙ্কে মাটিতে অস্ত্র ফেলে হাত তুলে দিল।
উপরের ধাতব সিঁড়ি দিয়ে ধীরেসুস্থে নেমে এল এক দীর্ঘদেহী, ভয়ংকর চেহারার মানুষ। মুখে গভীর কাটা দাগ, চোখে হিংস্র হাসি। সে আর কেউ নয়—কুখ্যাত মাফিয়া ডন কালরাত।
আর তার ঠিক পেছনেই হাসিমুখে সিগারেট টানতে টানতে প্রবেশ করল ডিআইজি রাজেশ শর্মা!
দৃশ্যটি দেখে অনন্যার চোখের সামনে যেন ব্রহ্মাণ্ড ভেঙে পড়ল। তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।
"ডিআইজি স্যার? আপনি... এদের সাথে?" অনন্যার গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছিল না।
রাজেশ শর্মা একদলা ধোঁয়া অনন্যার মুখের ওপর ছেড়ে কুৎসিতভাবে হেসে উঠল, "মাই ডিয়ার মায়াবতী আইপিএস... তুমি সত্যিই ভেবেছিলে তুমি তোমার যোগ্যতায় এত দ্রুত উপরে উঠছিলে? তুমি তো ছিলে আমাদের খেলার এক বোকা ঘুঁটি! তোমার ডিপার্টমেন্টের সমস্ত সিক্রেট রুট, ফাইল আর অস্ত্রের ছাড়পত্র তোমার সই জাল করেই এই কালরাতের হাতে পৌঁছেছে। আর আজ... আজকের পর মিডিয়া জানবে—আইপিএস অনন্যা চৌধুরী জঙ্গিদের সাথে গুলির লড়াইয়ে বীরের মতো শহীদ হয়েছেন!"
"বেইমান! দেশদ্রোহী!" অনন্যা ক্ষোভে ফেটে পড়ে নিজের সার্ভিস পিস্তলটা তোলার চেষ্টা করল।
কিন্তু কালরাতের এক দুর্ধর্ষ শুটার এক নিমেষে অনন্যার কবজিতে বুটের একটা প্রচণ্ড লাথি মারল।
মটাস!
হাড় মচকে যাওয়ার বিকট শব্দে অনন্যার হাত থেকে পিস্তলটা ছিটকে মেঝের অনেক দূরে গিয়ে পড়ল। যন্ত্রণায় অনন্যা হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। কালরাত তার চুল মুঠো করে ধরে মুখটা ওপরে তুলল।
"উর্দি পরে খুব লাফাচ্ছিলে না ম্যাডাম?" কালরাতের কর্কশ গলার আওয়াজে পুরো শেডটা গমগম করে উঠল, "আজ তোর ওই অহংকারী শরীরের রক্ত দিয়ে আমি এই কারখানার মাটি ভেজাব। রাজেশ, ক্যামেরা চালু কর! সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টকে এই ভিডিও পাঠিয়ে আমরা বুঝিয়ে দেব, এই মাটির আসল রাজা কে!"
মেঝের ঠান্ডা ধুলোয় পড়ে থাকা অনন্যার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল।
তার পুরো শরীর যন্ত্রণায় কাঁপছে। আজ তার পাশে কেউ নেই। কোনো পুলিশ ফোর্স নেই, তার অহংকারী মা-ভাই নেই, তার তথাকথিত পদ আর পাওয়ারের কোনো মূল্য নেই। মৃত্যুর হিমশীতল নিঃশ্বাস তখন তার ঘাড়ে এসে পড়েছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে অনন্যার মনে ভেসে উঠল সকালে বলা রুদ্রর সেই শান্ত অথচ অমোঘ কথাগুলো:
“আলো যখন চলে যায়, তখন নিজের ছায়াও সঙ্গ ছেড়ে দেয়। যেদিন তোমার অহংকারের চশমা ভাঙবে, সেদিন যেন অনেক দেরি না হয়ে যায়...”
অনন্যা মনে মনে ডুকরে কেঁদে উঠল—"রুদ্র... তুমি ঠিক ছিলে। আমি অন্ধ ছিলাম... আমি পশুর মতো অন্ধ ছিলাম! ভগবান, আমাকে শেষবারের মতো ক্ষমা করে দাও..."
কালরাত তার জ্যাকেট থেকে একটি চকচকে ধারালো কমব্যাট ড্যাগার বের করল। অনন্যার গলার শ্বাসনালীর ঠিক ওপরে ছুড়ির ঠান্ডা ফলাটা ঠেকিয়ে সে উন্মত্তের মতো হেসে উঠল—
"বিদায়, আইপিএস সাহেবা!"
ঠিক সেই ভগ্নাংশ সেকেন্ডে—
কারখানার কাঁচের ছাদ ভেঙে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হলো!
ক্র্যাশ! বুম!
কারখানার পঞ্চাশ ফুট উঁচুতে থাকা শক্ত অ্যাসবেস্টস ও কাঁচের ছাদ ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। ওপর থেকে প্রচণ্ড গতিতে আছড়ে পড়ল চারটি ট্যাকটিক্যাল ফ্ল্যাশব্যাং এবং টিয়ারগ্যাস ক্যানিস্টার।
মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র অন্ধ করে দেওয়া সাদা আলো আর কানফাটা বিস্ফোরণে গোটা কারখানা কেঁপে উঠল। সেই সাথে ছড়িয়ে পড়ল শ্বাসরোধকারী ঘন ধোঁয়া।
"হোয়াট দ্য হেল! স্নাইপার! ওপেন ফায়ার!" অন্ধের মতো চোখ ডলতে ডলতে আর্তনাদ করে উঠল কালরাত। তার ড্যাগার অনন্যার গলা থেকে ছিটকে দূরে পড়ে গেল।
পুরো শেডের ভেতরে এলোপাথাড়ি একে-৪৭-এর গুলির ঝড় শুরু হলো। কিন্তু সেই ধোঁয়ার ভেতর কোনো মানুষ দেখা গেল না। শুধু শোনা গেল ভারী স্টিলের তার বেয়ে ওপরে থেকে নিচে নেমে আসার একটানা ঘর্ষণের শব্দ—র্যাপেলিং ড্রপ!
ছাদ থেকে বিদ্যুতের গতিতে রশি বেয়ে নেমে এল চারজন ছায়ামানব। কালো ব্যালিস্টিক আর্মার, কার্বন-ফাইবার নাইট-ভিশন হেলমেট এবং হাতে সাইলেন্সার লাগানো অত্যাধুনিক তাভোর টিএআর-২১ রাইফেল। তাদের চলাফেরায় কোনো দ্বিধা নেই, প্রতিটি পদক্ষেপ নিখুঁত এবং প্রাণঘাতী।
থাপ! থাপ! থাপ!
মেঝের ওপর তাদের বুট ছোঁয়ার পর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট হলো না।
সাইলেন্সার লাগানো রাইফেল থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বেরোল—পফ! পফ! পফ!
কারখানার ডানে আর বাঁয়ে থাকা ছয়জন ভারি অস্ত্রধারী স্নাইপার কোনো চিৎকার করার সুযোগ পেল না; মাথায় ও বুকে নিখুঁত বুলেটের আঘাতে এক নিমেষে নিথর হয়ে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল।
"ওরা কারা? পুলিশ? সিআরপিএফ?" ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চেঁচিয়ে উঠল ডিআইজি রাজেশ শর্মা। সে বুঝতে পারছিল, এটা কোনো রাজ্য পুলিশের অপারেশন নয়। এই গতি, এই নির্ভুল নিশানা কেবল দেশের সর্বোচ্চ গোপন স্পেশাল ফোর্সের রক্তে থাকে!
ঠিক তখনই ধোঁয়া চিরে সামনে এগিয়ে এল দলের মূল অধিনায়ক।
দীর্ঘদেহী, চওড়া কাঁধ, যার চোখের দৃষ্টিতে জ্বলছে এক হিমশীতল মৃত্যুর ছায়া। তার বুকে সাঁটা ব্ল্যাক প্যান্থারের মনোগ্রাম এবং কাঁধের স্ট্র্যাপে স্পেশাল কমান্ডোর বিশেষ গোল্ডেন ইনসিগনিয়া। তার এক হাতে অটোমেটিক ট্যাকটিক্যাল শটগান, অন্য হাতে বিশেষ মেটাল-গ্রিপ কমব্যাট নাইফ।
কালরাতের বারোজন দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার তার দিকে তাক করে অটোমেটিক কারবাইন চালাতে গেল। কিন্তু কমান্ডো প্রধান এক অবিশ্বাস্য অ্যাক্রোবেটিক ডাইভে মাটিতে স্লাইড করে আড়ালে চলে গেল।
পরের তিন সেকেন্ডে যা ঘটল, তা কোনো মানুষের কল্পনার অতীত!
কমান্ডো চিফ বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রথম আক্রমণকারীর ওপর। বন্দুকের নলের মুখে হাত দিয়ে এক ঝটকায় তার কবজি ভেঙে দিল—মটাস! সেই ভাঙা বন্দুক ঘুরিয়ে দ্বিতীয়জনের চোয়ালে এমন এক রিভার্স ব্যাক-হ্যান্ড স্ট্রাইক মারল যে লোকটির মুখ থেকে রক্তের সাথে ছিটকে বেরিয়ে এল দাঁতের টুকরো।
তৃতীয়জন পাশ থেকে একে-৪৭ তুলতে গেলে কমান্ডো প্রধান তার কমব্যাট বুটের স্টিল-টো দিয়ে তার হাঁটুতে এক মারাত্মক সাইড-কিক বসাল। হাঁটু উল্টোদিকে বেঁকে গিয়ে অমানুষিক যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল সে। আর সেই মুহূর্তেই নিজের ভারী শটগানের বাট দিয়ে চার নম্বরের মাথায় এমন এক আঘাত হানল যে সিমেন্টের মেঝের ওপর আছড়ে পড়ে সে জ্ঞান হারাল।
পুরো শেড যেন এক রক্তের কসাইখানায় পরিণত হলো। বিশজন সশস্ত্র জঙ্গি মাত্র দেড় মিনিটে মাটিতে স্তূপাকারে লুটিয়ে পড়ল।
মেঝের এক কোণে হাত চেপে পড়ে থাকা অনন্যা নিজের অক্ষিগোলককে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই ভয়ংকর রণমূর্তি, এই অবিশ্বাস্য দানবীয় শক্তি কার হতে পারে? যার এক একটা আঘাতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের হিংস্র জানোয়ারগুলো শুকনো পাতার মতো উড়ে যাচ্ছে!
কালরাত বুঝতে পারল তার খেলা শেষ। সে ভয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মেঝের ওপর পড়ে থাকা অনন্যাকে লক্ষ্য করে তার রিভলভার তুলতে গেল।
"যদি আমাকে মারতে আসিস, এই আইপিএস বেশ্যাকে এক গুলিতে উড়িয়ে দেব!" কালরাত উন্মত্তের মতো চিৎকার করল।
কিন্তু বাক্যটি শেষ করতে পারল না সে।
কমান্ডো প্রধানের হাত থেকে বিদ্যুতের ঝলকের মতো ছুটে গেল একটি ট্যাকটিক্যাল কারাম্বিট ছুরি। বাতাসের গতি চিরে সেই ছুরিটি গিয়ে সরাসরি বিঁধে গেল কালরাতের ডান হাতের তালুর মাঝখানে!
আহহহহহ!
চিৎকার করে রক্তভেজা হাতে রিভলভার ফেলে দিল কালরাত। আর চোখের পলক ফেলার আগেই কমান্ডো প্রধান কালরাতের সামনে এসে দাঁড়াল।
কালরাত মরিয়া হয়ে তার বাঁ হাত দিয়ে একটি ছুরি চালাতে চাইল। কিন্তু কমান্ডো চিফ কালরাতের বাড়ানো হাতটা শূন্যেই খপ করে ধরে ফেলল। তারপর এক অবিশ্বাস্য টানে কালরাতকে শূন্যে তুলে কংক্রিটের এক বিশালাকার পিলারের সাথে সজোরে আছাড় মারল!
ধড়াম!
পিলারের গায়ে রক্তের দাগ লেগে গেল। কালরাতের পাঁজরের হাড় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কমান্ডো প্রধান তার ভারী বুট তুলে কালরাতের বুকের ওপর চেপে ধরল। ভারী বুটের চাপে কালরাতের মুখ দিয়ে রক্ত উপচে পড়ল।
"কে... কে তুই?" গোঙাতে গোঙাতে শেষ প্রশ্ন করল কালরাত।
কমান্ডো প্রধান নিচু হয়ে তার কানের কাছে গেল। কণ্ঠস্বরে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক ঠান্ডা বজ্রধ্বনি:
"তুই ভারতের মাটিতে পা রেখেছিস, এটাই ছিল তোর প্রথম ভুল। আর তুই আমার দেশের উর্দির ওপর হাত তুলেছিস—এটাই তোর শেষ ভুল।"
কমান্ডো প্রধান নিজের হাতের রিভলভার দিয়ে কালরাতের দুই হাঁটুতে দুটি গুলি চালাল। চিরতরে পঙ্গু হয়ে আর্তনাদ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেল অপরাধ জগতের রাজা।
এদিকে পেছনের গোপন দরজার তালা ভেঙে পালানোর চেষ্টা করছিল ডিআইজি রাজেশ শর্মা।
অন্য দুজন কমান্ডো এক নিমেষে রাজেশ শর্মার পথ আটকে দাঁড়াল। তারা এক লাথিতে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে পিঠমোড়া করে প্লাস্টিক হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল।
রাজেশ শর্মা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে চেঁচাতে লাগল, "আমাকে ছেড়ে দাও! তোমরা জানো না আমি কে? আমি এই স্টেটের ডিআইজি! তোমাদের কোর্ট মার্শাল করাব!"
কমান্ডো চিফ ধীর পায়ে এগিয়ে এল রাজেশ শর্মার সামনে। রাজেশ শর্মার দিকে তাকিয়ে সে তার বুকপকেট থেকে একটি বিশেষ এনক্রিপ্টেড স্যাটেলাইট ট্যাব বের করল।
স্ক্রিনে ফুটে উঠল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিবের সরাসরি সিলমোহরযুক্ত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা:
"SUBJECT: DIG RAJESH SHARMA — CHARGED WITH HIGH TREASON, ARMS SMUGGLING, AND ATTEMPTED MURDER OF POLICE OFFICIALS. SHOOT ON SIGHT PERMITTED."
রাজেশ শর্মার মুখ মুহূর্তের মধ্যে ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল। তার শরীরের সমস্ত ক্ষমতা আর অহংকার যেন পায়ের নিচ দিয়ে গলে বেরিয়ে গেল। সে হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল।
চারিদিক শান্ত হয়ে এল। বাইরে ততক্ষণে আকাশে চক্কর কাটছে সেনার দুটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছে শত শত ব্ল্যাক ক্যাট কমান্ডো।
রক্ত আর ধোঁয়ায় মাখামাখি মেঝের ওপর বসে কাঁপছিল অনন্যা। তার কপাল দিয়ে রক্ত ঝরছে, ইউনিফর্মের শার্ট ধুলোয় মলিন, হাত ভেঙে অবশ হয়ে আছে। সে ভয়ার্ত, কৃতজ্ঞ এবং অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল সেই রক্তমাখা কমান্ডো প্রধানের দিকে।
এই সেই বীর, যে একা নরকের মুখে নেমে এসে তাকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে। অনন্যা কোনোমতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে লাগল।
কমান্ডো চিফ দ্রুত এগিয়ে এসে এক হাতে শক্ত করে অনন্যার কোমর ধরে তাকে পতন থেকে রক্ষা করল।
সেই স্পর্শ...
অনন্যার মস্তিষ্কে যেন এক তীব্র ঝাঁকুনি লাগল। এই বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ, এই চওড়া বুকের গন্ধ... এটা কেমন যেন খুব চেনা!
অনন্যা অস্ফুট স্বরে বলল, "থ্যাংক ইউ স্যার... আপনি কে? আমি আপনার কাছে সারাজীবন ঋণী... দয়া করে আপনার মুখটা দেখান স্যার, এই অভাগী জানতে চায় আজ কার জন্য সে বেঁচে ফিরল..."
কমান্ডো প্রধান কোনো কথা বলল না। সে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে অনন্যার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর... ধীরে ধীরে সে তার ডান হাতটি ওপরে তুলল।
খুলে ফেলল তার ট্যাকটিক্যাল কার্বন-ফাইবার হেলমেট। তারপর এক টানে মুখের কালো ব্যালিস্টিক মাস্কটি নিচে নামিয়ে দিল।
ধোঁয়া আর ভোরের হালকা আলোর মাঝে উন্মোচিত হলো সেই মুখ।
তীক্ষ্ণ চোয়াল, কপালে ঘামের ফোঁটা, চোখের কোণে সেই পরিচিত গভীর মমতা আর অপরিসীম শূন্যতা।
সেই মুখ আর কারও নয়—
তার নিজের স্বামী... সেই "গ্যারেজের সামান্য মেকানিক"... রুদ্র!
অনন্যার চোখের সামনে গোটা পৃথিবীটা যেন এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হৃৎস্পন্দন থেমে গেল। নিঃশ্বাস আটকে গেল গলায়।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রর ট্যাকটিক্যাল বুলেটপ্রুফ ভেস্টের ওপরে রুপোলি হরফে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে দেশের সর্বোচ্চ গোপন পদমর্যাদা:
"COLONEL RUDRA CHOWDHURY — COMMANDING OFFICER, 9 PARA SF (SPECIAL FORCES)"
কারখানার ধ্বংসস্তূপের ভেতর তখন সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। বাতাসে বারুদ আর রক্তের পোড়া গন্ধ।
অনন্যার চোখের পাতা কাঁপছে। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে সে চিনতে পারছে, কিন্তু তার মস্তিষ্ক তা মেনে নিতে পারছে না।
যে রুদ্রকে সে কাল সকালে "ভিখারি", "তেলচিটে মেকানিক" বলে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল; যার দেওয়া বাজারের ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তাকে ডিভোর্স পেপারে সই করতে বাধ্য করেছিল—সেই রুদ্রই এখন দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং স্পেশাল ফোর্সেসের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ প্যারা-কমান্ডো কর্নেল হিসেবে! যার কাঁধের রৌপ্য ও সোনালি ইনসিগনিয়ার সামনে গোটা দেশের সুরক্ষা বিভাগ স্যালুট জানায়!
অনন্যার অবশ হয়ে আসা শরীরটা আর নিজের ভর রাখতে পারল না। সে মাটির ধুলোয় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার চোখ থেকে বাঁধভাঙা নদীর মতো জল নেমে ধুলোমাখা গাল ভিজিয়ে দিল।
"রু... রুদ্র? তুমি... তুমি কর্নেল রুদ্র চৌধুরী?" অনন্যার কণ্ঠস্বর দিয়ে কোনো স্বাভাবিক আওয়াজ বেরোল না, বেরোল এক বুকফাটা হাহাকার।
রুদ্র নিথর মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে কোনো বিজয়ের অহংকার নেই, কোনো প্রতিশোধের হিংস্রতা নেই—আছে শুধু এক হিমশীতল শূন্যতা।
অনন্যা দুই হাত দিয়ে রুদ্রর রক্তমাখা কমব্যাট বুট চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল— "আমাকে ক্ষমা করে দাও রুদ্র! আমি অন্ধ ছিলাম! ক্ষমতার অহংকারে আমি পশুর চেয়েও অধম হয়ে গিয়েছিলাম! যে মানুষটা নিজের পরিচয় লুকিয়ে আমার স্বপ্ন পূরণ করল, আমার জন্য সারা রাত না ঘুমিয়ে বাজার করল—আমি সেই মানুষটাকেই সবার সামনে চড় মারলাম, ভিখারি বলে তাড়িয়ে দিলাম! ভগবান, আমাকে এই পাপের জন্য মৃত্যু দাও... রুদ্র, তুমি তোমার এই বন্দুক দিয়ে আমাকে গুলি করো, কিন্তু এভাবে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থেকো না!"
আশপাশের কমান্ডো ও প্যারা ট্রুপাররা মাথা নিচু করে রইল।
রুদ্র ধীর পদক্ষেপে এক পা পিছিয়ে গেল। অনন্যার হাত দুটি তার বুট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধুলোয় আছড়ে পড়ল।
রুদ্র অত্যন্ত শান্ত, গম্ভীর অথচ ভাঙা গলায় বলল— "অনন্যা, গুলি শত্রুর বুকে চালানো হয়, কোনো মোহগ্রস্ত পথভ্রষ্ট মানুষের ওপর নয়। আমি তোমাকে কোনোদিন মেকানিক হিসেবে ভালোবাসিনি, আর আজ এই কমান্ডো উর্দির অহংকারেও তোমাকে ফিরিয়ে নিচ্ছি না। আমি ভালোবেসেছিলাম সেই সহজ-সরল অনন্যাকে, যে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু সেই অনন্যা অনেক আগেই মরে গেছে—যেদিন সে ক্ষমতার নেশায় এক শ্রমজীবী মানুষকে পদদলিত করেছিল।"
রুদ্র নিজের পকেট থেকে সেই সকালে সই করা ডিভোর্স পেপারটা বের করে অনন্যার সামনে মেঝের ওপর ফেলে দিল।
"তোমার ডিভোর্স পেপার। আমি সই করে দিয়েছি। তোমার রাস্তা আলাদা, আমার সীমান্ত আলাদা। ভালো থেকো।"
রুদ্র আর এক সেকেন্ডও পেছনে তাকাল না। সে হেলমেটটা হাতে তুলে নিয়ে সোজা হেঁটে বাইরে অপেক্ষমাণ সামরিক হেলিকপ্টারের দিকে এগিয়ে গেল। অনন্যা ধুলোয় মাথা ঠুকে কাঁদতে লাগল, কিন্তু রোটারের প্রচণ্ড বাতাসে সেই কান্নার আওয়াজ মিলিয়ে গেল মেঘের গর্জনে।
তিন মাস পর। নতুন দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন।
ঐতিহাসিক দরবার হলে তখন দেশের সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ কর্তাদের মিলনমেলা। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং সেনা প্রধানরা সামনের সারিতে আসীন। দেশজুড়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার চলছে এই রাষ্ট্রীয় বীরত্ব পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের।
আন্তর্জাতিক মাফিয়া সিন্ডিকেট ও দেশবিরোধী বিশাল ষড়যন্ত্র ধ্বংস করে রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য আজ প্রদান করা হচ্ছে ভারতের সর্বোচ্চ শান্তিকালীন সামরিক সম্মান—‘কীর্তি চক্র’।
মঞ্চের স্পিকারে নাম ঘোষিত হলো:
"৯ প্যারা স্পেশাল ফোর্সেসের কমান্ডিং অফিসার—কর্নেল রুদ্র চৌধুরী!"
পুরো হলঘর করতালি ও দেশপ্রেমের স্লোগানে ফেটে পড়ল। পূর্ণ সামরিক পোশাকে, মেরুন বেরেট মাথায় দিয়ে সটান পদক্ষেপে মঞ্চে উঠলেন রুদ্র। রাষ্ট্রপতি স্বয়ং তাঁর বুকে ঝুলিয়ে দিলেন রৌপ্যখচিত সেই ঐতিহাসিক পদক।
হলঘরের একেবারে শেষ সারির এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনন্যা।
আজ তার পোস্টিং হয়েছে এক প্রত্যন্ত সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ পুলিশ ফাঁড়িতে। ডিআইজি রাজেশ শর্মার বিশ্বাসঘাতকতার তদন্তে অনন্যা নির্দোষ প্রমাণিত হলেও, রুদ্রর আসল পরিচয় জানার পর অনন্যার অহংকারের শিকড় চিরতরে উপড়ে গেছে। তার ভাই বিক্রম আর মা মালিনী দেবী আজ নিজেদের লজ্জায় ঘরের বাইরে মুখ দেখাতে পারে না। অনন্যা নিজের ইচ্ছাতেই শহর ছেড়ে সেই দূরবর্তী গ্রামে পোস্টিং নিয়েছে, যেখানে গরিব ও অসহায় মানুষদের সে দিনরাত নিঃস্বার্থ সেবা দেয়—শুধুমাত্র রুদ্রর প্রতি করা অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করতে।
অনুষ্ঠান শেষে রাষ্ট্রপতি ভবনের লনে যখন রুদ্র বেরোলেন, অনন্যা ভিড় এড়িয়ে দূরে এক গাছের ছায়ায় এসে দাঁড়াল। দূর থেকেই সে করজোড়ে রুদ্রকে শেষবারের মতো প্রণাম জানাল।
রুদ্র এক মুহূর্তের জন্য অনন্যার দিকে তাকালেন। তারপর মাথা সামান্য নত করে এক নিঃশব্দ বিদায় জানিয়ে নিজের সামরিক কনভয়ে উঠে বসলেন।
অনন্যা চোখ মুছে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। সে জানত, রুদ্র হয়তো কোনোদিন তার জীবনে ফিরে আসবে না, কিন্তু রুদ্র তাকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে—উর্দির আসল শক্তি ক্ষমতায় নয়, উর্দির আসল শক্তি আত্মত্যাগ, মানবতা আর মাটির মানুষের সেবায়।