Story Blog
← Back to Stories

অচেনা মানুষের ডায়েরি

Romantic
অচেনা মানুষের ডায়েরি

অনির্বাণ ডায়েরিটা হাতে নিয়ে সোফায় বসে পড়ল, এমনভাবে যেন বই নয়, কোনো জীবন্ত মানুষের নাড়ি সে স্পর্শ করতে চলেছে। পাতাগুলো পুরোনো, কোণাগুলো একটু ভাঙা, কাগজে হালকা হলদেটে দাগ, তবু লেখাগুলো পরিষ্কার, যত্ন করে লেখা। সে দ্বিতীয় পাতায় চোখ রাখতেই বুঝল, এটা কোনো সাধারণ নোটবুক নয়; এটা কারও জীবনের হিসাব, কারও না বলা কথার শেষ আশ্রয়। সেখানে তারিখ লেখা ছিল প্রায় পাঁচ বছর আগের, আর তার নিচে লম্বা করে লেখা—একজন মেয়ের নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা, যেন পৃথিবীতে আর কেউ নেই শুনবার মতো।

“আজ আমি আবার মিথ্যে হাসলাম। অফিসের সবাই ভাবল আমি খুব শক্ত মেয়ে, কিছুতেই ভাঙি না। কেউ জানে না, প্রতিদিন বাসে ফিরতে ফিরতে জানালার কাঁচে নিজের মুখটা দেখলে মনে হয়, এই মুখটা আমার নয়, কোনো অচেনা মানুষের মুখ, যে শুধু অভিনয় করে যাচ্ছে বেঁচে থাকার। মা বেঁচে থাকলে হয়তো বলত, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’, কিন্তু তার সেই কথাটুকু শোনার জন্য আজ আমার কাছে আর কেউ নেই।”

এই কয়েকটা লাইন পড়েই অনির্বাণের বুকটা অদ্ভুত ভারী হয়ে উঠল। সে জানত না কেন, কিন্তু এই অচেনা মেয়েটার কষ্ট তাকে নিজের কষ্টের কাছাকাছি এনে দাঁড় করাল। তার নিজের জীবনও কি খুব আলাদা? শহরের বড় আইটি কোম্পানিতে চাকরি, ভালো ফ্ল্যাট, মাসের শেষে মোটা বেতন, অথচ প্রতিদিন রাতে ঘরে ফিরে সে অনুভব করত এক ধরনের নিঃশব্দ ফাঁকা ঘর, যেখানে টিভির শব্দ, মোবাইলের নোটিফিকেশন, সব মিলেও একটা মানুষের অভাব পূরণ করতে পারে না। হয়তো সেই কারণেই এই ডায়েরির লেখা তার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল এত সহজে।

সে পড়তে থাকল। পাতার পর পাতা জুড়ে সেই মেয়েটার জীবন ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগল তার সামনে। নাম লেখা ছিল না কোথাও, শুধু মাঝে মাঝে নিজেকে “আমি” বলে সম্বোধন করেছে। জানা গেল, সে কলকাতারই কোনো এক প্রান্তে ভাড়া বাড়িতে থাকত, ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম তার নিত্যসঙ্গী, বাবা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই, মা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পড়াশোনা আর স্বপ্ন দুটোই একসঙ্গে টেনে নিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। লেখার ভেতর দিয়ে অনির্বাণ যেন দেখতে পেল একটি রোগা, জেদি মেয়ে, যে বাসের ভিড়ে ঠেসে দাঁড়িয়ে অফিস যায়, সন্ধ্যায় বাজার করে মায়ের জন্য ওষুধ কেনে, আর গভীর রাতে নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় ছুড়ে দিয়ে ভাবতে থাকে, এই জীবনটা কি সত্যিই তার নিজের, নাকি কেবল দায়িত্বের বোঝা।

ডায়েরির এক জায়গায় এসে অনির্বাণ থমকে গেল। সেখানে লেখাটা একটু কাঁপা কাঁপা, কালির দাগ গাঢ়, যেন লেখার সময় হাত কেঁপে উঠেছিল।

“আজ প্রথমবার ওর সঙ্গে কথা হল। নামটা লিখব কি না জানি না, কারণ নাম লিখলে হয়তো মনের ভেতরটা আরও গভীরে ঢুকে যাবে। অফিসের লিফটে আটকে পড়েছিলাম আমরা দু’জন। পাঁচ মিনিটের জন্য আলো নিভে গিয়েছিল, আর সেই অন্ধকারে অদ্ভুতভাবে আমার ভয় কেটে গিয়েছিল ওর কথা শুনে। কেউ কীভাবে এত স্বাভাবিক গলায় বলতে পারে, ‘ভয় পেও না, আলো আসবেই’? জানি না কেন, এই সাধারণ বাক্যটাই সারাদিন মাথায় ঘুরছে।”

অনির্বাণ বুকের ভেতর হালকা একটা ধাক্কা অনুভব করল। সে জানত, এই লাইনটার পর থেকে গল্পটা আর শুধু কষ্টের থাকবে না, সেখানে ঢুকে পড়বে ভালোবাসা, আর ভালোবাসা মানেই কোনো না কোনোভাবে যন্ত্রণা। সে জানত, কারণ নিজের জীবনেও সে একবার বিশ্বাস করেছিল, কারও পাশে থাকলে সব শূন্যতা ভরে যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বাসটাই তাকে সবচেয়ে একা করে দিয়েছিল।

বাইরে তখন পুরো অন্ধকার নেমে এসেছে, জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অনির্বাণ মুহূর্তের জন্য চোখ তুলল, নিজেকে দেখল, তারপর আবার ডায়েরির দিকে তাকাল। তার মনে হচ্ছিল, এই অচেনা মেয়েটার গল্প সে মাঝপথে ছেড়ে দিতে পারবে না, ঠিক যেমন কোনো অচেনা মানুষের কান্না শুনে রাস্তার মাঝখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।

সে আবার পড়তে শুরু করল, আরও গভীরে ঢুকে যেতে লাগল সেই জীবনে, যে জীবন তার নিজের নয়, তবু অদ্ভুতভাবে পরিচিত, যেন একই শহরের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো নিঃসঙ্গ মানুষের গল্প ধীরে ধীরে এক সুতোয় বাঁধা পড়তে চলেছে, আর সেই সুতো টানতে টানতে কোনো একদিন অনির্বাণকেও পৌঁছে দেবে এমন এক সত্যের সামনে, যা সে এখনও কল্পনাও করতে পারেনি।

অনির্বাণ বুঝতে পারছিল না ঠিক কখন রাত এত গভীর হয়ে গেছে। ঘরের দেয়ালঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বাজে, কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই, মাথায় নেই সময়ের হিসাব। ডায়েরিটা তার দুই হাতের মধ্যে এমনভাবে ধরা, যেন কেউ কেড়ে নিতে চাইলে সে লড়াই করবে। সে আর শুধু পড়ছে না, সে যেন ধীরে ধীরে সেই অচেনা মেয়েটার জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়ছে, তার নিঃশ্বাসের ছন্দ, তার ভয়, তার ছোট ছোট আশা সব নিজের ভেতরে টেনে নিচ্ছে।

ডায়েরির পাতায় পাতায় এখন সেই অচেনা পুরুষটির কথা বাড়তে শুরু করেছে। নাম এখনো লেখা হয়নি, শুধু “ও” বলে ডাকা হয়েছে তাকে, কিন্তু বর্ণনায় বোঝা যায় লোকটা খুব সাধারণ, উচ্চস্বরে কথা বলে না, নিজের মতো থাকে, অথচ আশ্চর্য রকম মন দিয়ে শুনতে জানে। মেয়েটা লিখেছে, অফিসের ক্যান্টিনে তারা মাঝে মাঝে একসঙ্গে চা খায়, কখনো কাজের কথা, কখনো ট্রাফিকের জ্যাম, কখনো বা শুধুই নীরবতা ভাগ করে নেয়। সেই নীরবতাই নাকি তার সবচেয়ে প্রিয়, কারণ সেখানে তাকে কিছু প্রমাণ করতে হয় না, শক্ত মেয়ে সাজতে হয় না, শুধু ক্লান্ত একজন মানুষ হয়ে বসে থাকলেই চলে।

এক জায়গায় লেখা ছিল, “আজ ও আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি এত কম কথা বলি কেন। আমি হেসে বললাম, কথা বলার মতো মানুষ পাই না। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তাহলে আমি কি একটু হলেও সেই মানুষ হতে পারি?” এই লাইন পড়ে অনির্বাণের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিল। তার নিজের জীবনে ঠিক এমন একটা প্রশ্নই কেউ একদিন করেছিল, আর সেদিন সে বুঝতে পারেনি, এই ধরনের সাধারণ প্রশ্নই ভবিষ্যতের বড় বড় কষ্টের বীজ বয়ে আনে।

ডায়েরির গল্পের সঙ্গে সঙ্গে অনির্বাণের নিজের স্মৃতির দরজাও ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছিল। তার কলেজের শেষ বছর, শ্রেয়া নামের একটি মেয়ে, যে প্রথমে বন্ধু ছিল, তারপর অভ্যাস, আর শেষ পর্যন্ত জীবনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। তারা ভবিষ্যতের কত পরিকল্পনা করেছিল—বিদেশে চাকরি, একসঙ্গে থাকা, ছোট একটা বাড়ি, বারান্দায় গাছ। কিন্তু শ্রেয়ার পরিবার রাজি হয়নি, অন্য শহরের বড় ব্যবসায়ী ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল, আর অনির্বাণ তখন নিজের আত্মসম্মান আর বাস্তবতার মধ্যে আটকে পড়ে চুপ করে সরে দাঁড়িয়েছিল। সেই চুপ করে সরে দাঁড়ানোই আজও তার সবচেয়ে বড় আফসোস, কারণ ভালোবাসা হারানোর কষ্ট সে সামলাতে পেরেছে, কিন্তু নিজের কাপুরুষতার বোঝা কখনো নামাতে পারেনি।

ডায়েরিতে ফিরে এসে সে দেখতে পেল, অচেনা মেয়েটার জীবনও ধীরে ধীরে একই রাস্তায় হাঁটছে। তার মায়ের অসুখ বেড়েছে, হাসপাতালের বিল বাড়ছে, অফিসে কাজের চাপও বেড়েছে, আর সেই পুরুষটি ধীরে ধীরে তার জীবনের একমাত্র শান্ত জায়গা হয়ে উঠছে। এক রাতে লেখা হয়েছে, তারা দু’জনে হেঁটে ফিরছিল, হালকা বৃষ্টি পড়ছিল, ফুটপাথ ভিজে চকচক করছিল আলোয়, আর সে প্রথমবার বুঝেছিল, কারও পাশে হাঁটলে পথটা ছোট লাগে। সে লিখেছে, “আমি জানি না এটা ভালোবাসা কি না, শুধু জানি, ও পাশে থাকলে বুকের ভেতরের শব্দগুলো একটু চুপ করে।”

অনির্বাণ থেমে গেল, জানালার দিকে তাকাল। তার নিজের ফ্ল্যাটের বাইরেও দূরে দূরে আলো জ্বলছে, কোথাও মানুষ জেগে আছে, কোথাও কেউ কারও পাশে বসে হয়তো এমনই শান্তি খুঁজে পাচ্ছে, আর কোথাও কেউ ডায়েরির পাতায় নিজের জীবনের হিসাব লিখে যাচ্ছে, ঠিক যেমন এই মেয়েটা করেছিল। তার হঠাৎ মনে হল, এই ডায়েরিটা শুধু পড়া নয়, এটা যেন এক ধরনের দায়িত্ব, কারণ যে মানুষটা লিখেছিল, সে হয়তো আর নেই, কিন্তু তার কথাগুলো তো বেঁচে আছে, আর সেগুলো এখন অনির্বাণের মাথার ভেতরে প্রতিধ্বনির মতো ঘুরছে।

ডায়েরির আরও কিছু পাতায় সেই সম্পর্কের গভীরতার কথা এসেছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে কোথাও স্পষ্ট প্রেমের ঘোষণা নেই, শুধু ছোট ছোট মুহূর্ত, যেমন হাসপাতালে মায়ের পাশে বসে থাকা, ওষুধ কিনে দেওয়া, বা অফিস থেকে ফেরার পথে ফোন করে বলা, “পৌঁছালে একটা মেসেজ দিও।” এই ছোট ছোট যত্নের ভেতর দিয়েই যে মানুষ ধীরে ধীরে অন্য মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়, সেটা অনির্বাণ খুব ভালো করেই জানত।

কিন্তু তারপরই ডায়েরির লেখার সুর বদলাতে শুরু করেছে। তারিখের পাশে ছোট ছোট দাগ, লেখার মধ্যে কাঁপুনি, কিছু শব্দ কেটে আবার লেখা হয়েছে। মেয়েটা লিখেছে, “আজ ও হঠাৎ বলল, ওর বাড়িতে নাকি তার বিয়ের কথা চলছে। খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, যেন এটা দুনিয়ার সবচেয়ে সাধারণ খবর। আমি হাসলাম, বললাম, ভালো কথা। কিন্তু ঘরে ফিরে এসে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ কাঁদলাম, এমনভাবে কাঁদলাম যে নিজের গলাটাই চিনতে পারছিলাম না।”

এই অংশে এসে অনির্বাণের চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল। সে ডায়েরিটা নামিয়ে রাখল কিছুক্ষণের জন্য, গভীর শ্বাস নিল। তার মনে হচ্ছিল, সে আর শুধু একজন পাঠক নয়, সে যেন এই কাহিনির একজন নীরব সাক্ষী, যে জানে সামনে কী আসছে, অথচ কিছুই করতে পারবে না থামানোর জন্য।

সে আবার ডায়েরিটা তুলল। শেষের দিকে লেখা আরও ভারী, আরও নিরাশ। মেয়েটা লিখেছে, সে কাউকে কিছু বলেনি, শুধু ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, অফিস বদলেছে, নম্বর পাল্টেছে, শহরের অন্য প্রান্তে চলে গেছে, যেন কোনোভাবে এই কষ্টটাকে নিজের ভেতরে পুঁতে ফেলা যায়। এক জায়গায় লেখা, “ভালোবাসা যদি চুপচাপ সহ্য করা হয়, তাহলে মানুষ বাঁচে, এই কথাটা আমি নিজেকে বোঝাচ্ছি প্রতিদিন।”

এই লাইন পড়ে অনির্বাণ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার মনে হল, সে যেন নিজের কথাই পড়ছে, নিজের পুরোনো সিদ্ধান্তের প্রতিধ্বনি শুনছে অন্য এক মানুষের কণ্ঠে। তার ভেতরে হঠাৎ একটা প্রশ্ন মাথা তুলল—এই মেয়েটা শেষ পর্যন্ত কী করেছিল? সে কি বেঁচে আছে? নাকি এই ডায়েরিটাই তার শেষ চিহ্ন?

ডায়েরির শেষের দিকের পাতাগুলো এখনও পড়া বাকি, কিন্তু অনির্বাণ সেগুলো খুলতে একটু ভয় পাচ্ছে। কারণ তার অজানা এক আশঙ্কা হচ্ছে, এই গল্পের শেষটা হয়তো সুখের নয়, আর যদি তাই হয়, তাহলে সেই অচেনা কষ্টের ভারও তাকে বয়ে নিয়ে চলতে হবে, ঠিক যেমন সে নিজের কষ্ট বয়ে নিয়ে চলেছে এত বছর।

ঘরের আলো নিভিয়ে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল, ডায়েরিটা বুকের কাছে চেপে ধরে। বাইরে শহর ঘুমোচ্ছে, কিন্তু তার মাথার ভেতর অচেনা মানুষের জীবনের গল্প জেগে আছে, আর সেই গল্প ধীরে ধীরে তার নিজের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে যে সামনে হয়তো আর আলাদা করে বোঝা যাবে না, কোনটা ডায়েরির লেখা, আর কোনটা অনির্বাণের নিজের স্মৃতি।

ভোরের আলো যখন জানালার ফাঁক গলে ঘরের ভেতর ঢুকতে শুরু করল, অনির্বাণ তখনও জেগে ছিল। সে বুঝতেই পারেনি কখন রাত কেটে গেছে, কখন শহরের শব্দ ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে সকালের পরিচিত কোলাহলে পরিণত হয়েছে। তার চোখ জ্বলছিল ক্লান্তিতে, কিন্তু মনের ভেতর যে অস্থিরতা জমে উঠেছিল, তা ঘুমোতে দিচ্ছিল না। ডায়েরিটা এখনও তার পাশে পড়ে, যেন কোনো জীবন্ত সঙ্গী, যে নীরবে অপেক্ষা করছে তার বাকি কথাগুলো বলার জন্য।

সে ধীরে ধীরে উঠে বসে শেষের দিকের পাতাগুলো খুলল। এখান থেকে লেখাগুলো আরও এলোমেলো, তারিখগুলো ঠিকঠাক নেই, কোথাও কয়েক দিনের ফাঁক, কোথাও আবার একই দিনে দু’বার লেখা। মেয়েটার মনের অবস্থাও যেন সেই লেখার ভেতর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ভয়, অপরাধবোধ, এক ধরনের নিঃসঙ্গ দৃঢ়তা, আর গভীরে লুকিয়ে থাকা ক্লান্তি। সে লিখেছে, নতুন বাড়িটা ছোট, জানালায় আলো কম আসে, পাশের ফ্ল্যাটের মানুষদের মুখ সে চেনে না, তবু এই অচেনা পরিবেশেই সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে, কারণ এখানে কেউ তার চোখের দিকে তাকিয়ে পুরোনো প্রশ্ন করে না।

এক জায়গায় এসে অনির্বাণ থমকে গেল। সেখানে লেখা ছিল, “আজ ডাক্তার বললেন, মায়ের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে, কিন্তু খরচ… আমি জানি না কী করব। ওকে ফোন করতে ইচ্ছে করছে, শুধু বলার জন্য যে আমি খুব ক্লান্ত, কিন্তু জানি, করলে সব আবার জটিল হয়ে যাবে।” এই কয়েকটা লাইনে অনির্বাণ স্পষ্ট দেখতে পেল সেই দ্বন্দ্ব, যা মানুষকে ভিতর থেকে ছিঁড়ে ফেলে—নিজের কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার তীব্র ইচ্ছে আর সেই ভাগ করে নেওয়াটাই অন্যের জীবনে সমস্যা হয়ে দাঁড়ানোর ভয়।

ডায়েরির পরের পাতায় লেখা আরও সংক্ষিপ্ত, যেন সময় কম, শক্তিও কম। সেখানে মেয়েটা লিখেছে, মাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে, নিজের গয়নাগুলো বিক্রি করেছে, অফিস থেকে অ্যাডভান্স নিয়েছে, তবু টাকাটা পর্যাপ্ত হচ্ছে না। সে লিখেছে, “মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যদি একটু সাহসী হতাম, তাহলে ওর সামনে দাঁড়িয়ে সব বলে দিতাম। কিন্তু আমি তো সেই মানুষটা নই। আমি কেবল চুপ করে সহ্য করতে জানি।”

এই লাইনটা পড়ে অনির্বাণের বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার উঠল। সে নিজের কথাই শুনতে পাচ্ছিল, নিজের বহু বছরের পুরোনো সিদ্ধান্তগুলোর প্রতিধ্বনি। তার মনে হল, এই অচেনা মেয়েটার সঙ্গে তার অদ্ভুত মিল—দু’জনেই নিজের কষ্টকে চুপচাপ বয়ে নিয়ে চলেছে, দু’জনেই ভাবছে, অন্যের শান্তির জন্য নিজেকে সরিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে বড় ত্যাগ।

ডায়েরির একেবারে শেষের পাতায় এসে লেখার ধরন বদলে যায়। অক্ষরগুলো ছোট, জায়গায় জায়গায় কালি ছড়িয়ে গেছে, যেন লেখার সময় চোখে জল ছিল। সেখানে লেখা, “আজ ওকে দূর থেকে দেখলাম। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, পাশে সেই মেয়েটা, যাকে ও বিয়ে করবে। ও হাসছিল, খুব স্বাভাবিক, খুব শান্ত। আমি বুঝলাম, আমার না থাকাই হয়তো ওর জীবনের জন্য সবচেয়ে ভালো। আমি চলে যাচ্ছি অনেক দূরে, এমন জায়গায় যেখানে কেউ আমাকে চেনে না, যেখানে এই শহরের রাস্তা, এই হাসপাতাল, এই মানুষগুলো আর আমাকে মনে করিয়ে দেবে না, আমি কী হারিয়েছি।”

এই লাইনের পর আর কোনো লেখা নেই। ডায়েরিটা সেখানেই শেষ।

অনির্বাণ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। ঘরের ভেতর সকালের আলো পুরো ছড়িয়ে পড়েছে, বাইরে গাড়ির শব্দ, পাখির ডাক, মানুষের হাঁটার আওয়াজ, সব মিলিয়ে শহর তার স্বাভাবিক গতিতে চলেছে, অথচ তার মনে হচ্ছিল কোথাও সময় থেমে আছে, ঠিক এই ডায়েরির শেষ লাইনের কাছে। সে বুঝতে পারছিল না, “অনেক দূরে চলে যাওয়া” মানে কী। অন্য শহর? অন্য দেশ? নাকি এমন কোনো দূরত্ব, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না?

তার মাথার ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি জমে উঠল। এই গল্পটা সে এখানেই থামাতে পারছে না। যে মেয়েটা এতটা কষ্ট বয়ে নিয়ে নিজের জীবন গুছিয়েছিল, সে এখন কোথায়? বেঁচে আছে তো? নাকি এই ডায়েরিটাই তার শেষ চিহ্ন? অনির্বাণ অনুভব করল, যদি সে উত্তর না খোঁজে, তাহলে এই গল্পটা তার নিজের জীবনের মতোই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, যেন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডায়েরির প্রথম দিকের পাতাগুলো আবার উল্টে দেখতে লাগল, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগল ছোট ছোট তথ্য—অফিসের নামের আংশিক উল্লেখ, হাসপাতালের কাছাকাছি এলাকার কথা, এক জায়গায় লেখা একটি বাসস্টপের নাম, আরেক জায়গায় একটি পুরোনো ভাড়া বাড়ির ঠিকানার অস্পষ্ট ইঙ্গিত। এগুলো একত্র করলে হয়তো সেই মেয়েটার পরিচয় খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

অনির্বাণ জানত না কেন সে এটা করছে। কোনো আত্মীয় নয়, কোনো বন্ধু নয়, একেবারে অচেনা একজন মানুষের গল্পের জন্য সে নিজের সময়, শক্তি, আবেগ ঢেলে দিতে যাচ্ছে। তবু তার মনে হচ্ছিল, এটা কেবল কৌতূহল নয়, এটা এক ধরনের নীরব দায়িত্ব, যেন সেই মেয়েটা ডায়েরির পাতার ভেতর থেকে তাকে অনুরোধ করেছে—“আমার গল্পটা এখানেই শেষ হতে দিও না।”

সে ব্যাগের ভেতর ডায়েরিটা রেখে দরজার দিকে এগোল। আজ অফিসে যাবে না, কাউকে ফোন করে ছুটি নেবে, দরকার হলে মিথ্যে বলবে। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা—এই শহরের ভিড়ের মধ্যে কোথাও হয়তো সেই মেয়েটা এখনও বেঁচে আছে, নিজের জীবনের বোঝা টেনে নিয়ে চলছে, জানে না যে এক অচেনা মানুষ তার ডায়েরি পড়ে তার অস্তিত্বের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে।

আর সেই খোঁজ হয়তো শুধু তার গল্পই নয়, অনির্বাণের নিজের জীবনকেও এমন এক মোড়ে এনে দাঁড় করাবে, যেখান থেকে আর আগের মতো করে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না।

সকালটা পুরোপুরি জেগে উঠলেও অনির্বাণের মাথার ভেতর যেন এখনও রাতের অন্ধকার জমে ছিল। দাঁত ব্রাশ করতে করতেই সে বারবার ডায়েরির শেষ লাইনটার কথা ভাবছিল—“আমি চলে যাচ্ছি অনেক দূরে।” এই বাক্যটা তার মনে এমনভাবে আটকে গেছে, যেন কেউ ইচ্ছে করে কানের ভেতর ফিসফিস করে বলে দিয়েছে, এখানে একটা অসমাপ্ত হিসাব রয়ে গেছে। সে দ্রুত তৈরি হয়ে ব্যাগের ভেতর ডায়েরিটা যত্ন করে রেখে বেরিয়ে পড়ল, দরজা বন্ধ করার সময় হঠাৎ মনে হল, এই ফ্ল্যাটে ফিরে আসার পর সে আর আগের মানুষটা থাকবে না।

প্রথম সূত্র হিসেবে সে ডায়েরিতে লেখা সেই হাসপাতালের নামটা ধরল। পুরো নাম নেই, শুধু “এস. কে. হাসপাতাল” লেখা, সঙ্গে একটা ইঙ্গিত—“পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের কাছে।” কলকাতার মতো শহরে এমন নামের হাসপাতাল একাধিক, তবু অনির্বাণ মনে করল, শুরুটা এখান থেকেই করা উচিত। সে বাস ধরে দক্ষিণ কলকাতার দিকে রওনা দিল, জানালার পাশে বসে শহরের চেনা রাস্তাগুলোকে আজ অদ্ভুত নতুন মনে হচ্ছিল, যেন এই শহরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অচেনা মানুষের ছায়া, আর সে সেই ছায়াটার পেছনে হাঁটছে।

প্রথম হাসপাতালটায় গিয়ে সে সরাসরি রিসেপশনে দাঁড়িয়ে পড়ল। কী বলবে ঠিক করে আসেনি, তাই কথাগুলো একটু এলোমেলো বেরোল। বলল, পাঁচ বছর আগে এক বয়স্ক মহিলা এখানে ভর্তি ছিলেন, তার মেয়ের খোঁজ সে করছে। রিসেপশনের মেয়েটা ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, এত পুরোনো রেকর্ড বের করা সহজ নয়, আর নাম না জানলে তো প্রায় অসম্ভব। অনির্বাণ ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এল, বুকের ভেতর হালকা হতাশা জমে উঠল, কিন্তু সে বুঝল, এই পথ সহজ হবে না, আর সহজ না হলেই হয়তো এই খোঁজের একটা মানে আছে।

দ্বিতীয় হাসপাতাল, তৃতীয় হাসপাতাল—সারাদিন কেটে গেল এভাবেই। কোথাও পুরোনো রেকর্ড নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও কর্মীরা বদলে গেছে, কোথাও কেউ সাহায্য করতে রাজি নয়। বিকেলের দিকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে এক পুরোনো চায়ের দোকানে বসে পড়ল। দোকানটা হাসপাতালের গেটের ঠিক উল্টো দিকে, কাঠের বেঞ্চ, ধোঁয়া ওঠা কেটলি, আর চারদিকে রোগীর আত্মীয়দের মুখে জমে থাকা উৎকণ্ঠা। অনির্বাণ চায়ে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ মনে করল, ডায়েরিতে এক জায়গায় লেখা ছিল, “হাসপাতালের সামনে চায়ের দোকানের কাকুটা খুব ভালো মানুষ।” সেই লাইনটার কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতর হালকা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।

সে দোকানদারের দিকে তাকাল। বছর পঞ্চাশের লোক, মুখে সাদা দাড়ির ছোঁয়া, চোখে ক্লান্ত কিন্তু শান্ত দৃষ্টি। অনির্বাণ একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, “কাকু, আপনি কি অনেক বছর ধরে এখানে দোকান চালান?” লোকটা মাথা নাড়ল, “প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেল বাবা।”

অনির্বাণ গভীর শ্বাস নিল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, “পাঁচ-ছয় বছর আগে এখানে একটা মেয়ে আসত… রোগা, শান্ত স্বভাব, তার মা খুব অসুস্থ ছিল… আপনি কি মনে করতে পারেন?”

দোকানদার কিছুক্ষণ ভেবে রইল, তারপর চোখ সরু করে বলল, “হ্যাঁ… মনে পড়ছে। খুব চুপচাপ মেয়ে ছিল। প্রায় রোজই চা খেতে আসত, কিন্তু নিজের জন্য না, মায়ের জন্য বিস্কুট নিয়ে যেত। নামটা কী যেন… র…” লোকটা থেমে গেল, যেন শব্দটা জিভের ডগায় এসে আটকে গেছে।

অনির্বাণের বুক ধক করে উঠল। “আপনি কি জানেন, এখন সে কোথায়?” সে প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

দোকানদার মাথা নাড়ল। “মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর আর আসেনি। শুনেছিলাম, বাড়িটা ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে, কেউ জানে না। তবে… একবার শুনেছিলাম, সে নাকি উত্তরের দিকে কোনো ছোট শহরে চাকরি পেয়েছিল।”

এই তথ্যটা খুব স্পষ্ট নয়, তবু অনির্বাণের কাছে মনে হল যেন অন্ধকারে কেউ একটা ম্লান আলো জ্বালিয়ে দিল। উত্তর দিকের কোনো ছোট শহর—এটা অন্তত একটা দিকনির্দেশ। সে দোকানদারকে ধন্যবাদ দিল, টাকা দিয়ে উঠে পড়ল। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল, বিকেলের আলো তখন কমে আসছে, শহরের রঙ ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।

তার মনে হচ্ছিল, এই খোঁজ কেবল সেই অচেনা মেয়েটার জন্য নয়, এটা তার নিজের জন্যও। যদি সে তাকে খুঁজে পায়, তাহলে হয়তো প্রমাণ করতে পারবে, মানুষ শুধু নিজের কষ্ট নিয়ে বাঁচতে বাধ্য নয়, চাইলে অন্যের কষ্টের দিকেও হাত বাড়ানো যায়। আর যদি না পায়, তাহলেও এই খোঁজ তাকে শিখিয়ে দেবে, জীবনে কিছু প্রশ্ন এমন থাকে, যাদের উত্তর না পেলেও খোঁজ করাটাই মানুষকে একটু বেশি মানুষ করে তোলে।

সন্ধ্যার দিকে সে বাড়ি ফিরল, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মাথার ভেতর অদ্ভুত এক অদম্য জেদ। ডায়েরিটা আবার বের করে টেবিলের উপর রাখল, যেন সেই অচেনা মেয়েটার সামনে বসে কথা বলছে। ধীরে ধীরে বলল, “আমি জানি না তুমি কোথায় আছ, বেঁচে আছ কি না, কিন্তু আমি চেষ্টা করব। অন্তত তোমার গল্পটা এমনভাবে শেষ হতে দেব না, যেন তুমি কেউ ছিলে না।”

ঘরের ভেতর নিঃশব্দ, শুধু দূরের ট্রাফিকের শব্দ। অনির্বাণ জানত, এই খোঁজ এখানেই শেষ নয়, বরং এখান থেকেই শুরু হয়েছে এমন এক পথ, যার শেষ কোথায় সে জানে না, শুধু জানে, সেই শেষের দিকে কোথাও হয়তো তার নিজের জীবনেরও একটা নতুন মানে অপেক্ষা করে আছে।

পরের কয়েকটা দিন অনির্বাণের জীবনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা নিয়ে এল। অফিসে গিয়ে সে কাজে মন দিতে পারছিল না, কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ডায়েরির সেই শেষ পাতার কাঁপা অক্ষরগুলো, আর কানে বাজছিল দোকানদারের কথাগুলো—“উত্তরের দিকে কোনো ছোট শহর।” কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, সে যেন ধীরে ধীরে এই শহরের সঙ্গে নিজের পুরোনো সম্পর্ক আলগা করে ফেলছে, যেন কোথাও দূরে তাকে টানছে এমন এক গল্প, যা আর শুধু কাগজের পাতায় বন্দি নেই, বরং রক্ত-মাংসের মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

অবশেষে এক সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল, আর অপেক্ষা নয়। অফিসে মেইল পাঠিয়ে কয়েক দিনের ছুটি নিল, খুব সংক্ষেপে লিখল, “পারিবারিক কাজ,” যদিও জানত, এই খোঁজের সঙ্গে তার কোনো পরিবারের সম্পর্ক নেই, তবু অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, এই অচেনা মেয়েটার গল্পটাই এখন তার পরিবারের মতো কাছের হয়ে উঠেছে। ছোট একটা ব্যাগ গুছিয়ে সে শিয়ালদহ স্টেশনের দিকে রওনা দিল, বুকের ভেতর এক ধরনের নার্ভাস উত্তেজনা, ঠিক যেমন কেউ বহুদিন পর এমন কোনো যাত্রায় বেরোয়, যার শেষটা সে নিজেও জানে না।

ট্রেনে বসে জানালার পাশে সে শহরটা ধীরে ধীরে পিছনে সরে যেতে দেখল। উঁচু দালান কমে গেল, জায়গা নিল খোলা মাঠ, ছোট ছোট স্টেশন, চা আর ঝালমুড়ির ফেরিওয়ালাদের ডাক, আর দূরে দূরে দেখা যেতে লাগল সবুজের টানা রেখা। উত্তরবঙ্গের দিকে যেতে যেতে বাতাসের রং বদলে গেল, আকাশটা যেন একটু বড় হয়ে উঠল, আর সেই সঙ্গে অনির্বাণের বুকের ভেতরের ভারও যেন ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে লাগল—কষ্টের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ঢুকে পড়ল অদ্ভুত এক আশা।

সে ঠিক জানত না কোথায় নামবে। দোকানদারের কথায় “ছোট শহর” বলতে অনেক কিছুই হতে পারে—শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, এমনকি আরও ছোট কোনো জায়গা। সে ঠিক করল, প্রথমে শিলিগুড়ি নামবে, সেখান থেকে খোঁজ নেবে। ট্রেন থেকে নামতেই তার নাকে এলো ভেজা মাটির গন্ধ, দূরে পাহাড়ের নীলচে রেখা, আর চারদিকে এক ধরনের শান্ত কোলাহল, যা কলকাতার চেনা হর্ন আর চিৎকারের থেকে আলাদা।

স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ দিশেহারা হয়ে রইল, তারপর মনে পড়ল ডায়েরির এক পুরোনো লাইন—“আমি যদি এই শহর ছাড়ি, তাহলে এমন জায়গায় যাব, যেখানে পাহাড় দেখা যায়।” তখন এই কথাটাকে সে কেবল আবেগের প্রকাশ ভেবেছিল, কিন্তু এখন মনে হল, হয়তো এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা সূত্র।

সে প্রথমে একটা ছোট লজে ঘর নিল। ব্যাগ রেখে বেরিয়ে পড়ল শহরের ভেতর। হাসপাতাল, ছোট অফিস, এনজিও, স্কুল—যেখানেই সম্ভব, সে খোঁজ নিতে লাগল, পাঁচ বছর আগে কোনো তরুণী মহিলা কি এখানে নতুন চাকরিতে এসেছিল, যার মা অসুস্থ ছিলেন, কলকাতা থেকে এসেছিলেন। বেশিরভাগ জায়গায় মানুষ মাথা নাড়ল, কেউ কিছু জানে না, কেউ আবার বলল, এ রকম গল্প এখানে অনেক, আলাদা করে মনে রাখা কঠিন।

বিকেলের দিকে সে প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছে গেল। এত বড় এলাকা, এত মানুষ, এত অজানা মুখ—এই ভিড়ের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট মানুষকে খুঁজে পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? সে একটা পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, মাথা নিচু করে নিজের জুতোর দিকে তাকিয়ে, ঠিক তখনই দোকানের ভেতর থেকে একজন বৃদ্ধ লোক বেরিয়ে এল, হাতে ধুলো ধরা বইয়ের স্তূপ।

অনির্বাণের চোখ হঠাৎ আটকে গেল লোকটার মুখে। কারণ অদ্ভুতভাবে, সেই মুখটা ডায়েরিতে বর্ণিত সেই অচেনা পুরুষটির মতোই শান্ত, চোখে এক ধরনের গভীর ক্লান্তি আর সহানুভূতির মিশ্রণ। অবশ্য এটা কেবল কল্পনাও হতে পারে, তবু অনির্বাণের বুক ধক করে উঠল।

সে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাকু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

লোকটা তাকাল, মাথা নাড়ল।

অনির্বাণ ধীরে ধীরে তার গল্পের সংক্ষিপ্ত অংশ বলল—একজন মেয়ে, কলকাতা থেকে এসেছে, মা অসুস্থ ছিলেন, কয়েক বছর আগে এখানে থাকতে পারে। কথা বলতে বলতে সে দেখল, লোকটার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যাচ্ছে, চোখের পাতা একটু কেঁপে উঠল, যেন কোনো পুরোনো স্মৃতি আচমকা জেগে উঠেছে।

লোকটা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, “তুমি যে মেয়েটার কথা বলছ, তার নাম কি… রিমঝিম?”

এই নামটা অনির্বাণ আগে কখনো শোনেনি, কিন্তু ডায়েরিতে নাম না থাকলেও, এই উচ্চারণের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে সবকিছু মিলে যাচ্ছে বলে তার মনে হল।

“হ্যাঁ,” সে অজান্তেই বলে ফেলল, যদিও নিশ্চিত নয়।

বৃদ্ধ লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “সে এখানে ছিল। ছোট একটা স্কুলে চাকরি করত। খুব শান্ত, খুব ভদ্র। সবাইকে সাহায্য করত, কিন্তু নিজের কথা কখনো বলত না।”

অনির্বাণের বুকের ভেতর যেন কেউ জোরে দরজা ঠেলে দিল। “সে এখন কোথায়?” তার গলা কেঁপে উঠল।

লোকটা চোখ নামাল। “এখন… সে আর এই শহরে নেই।”

এই কথার মধ্যে এমন একটা ভার ছিল, যে অনির্বাণ মুহূর্তের জন্য কথা বলতে পারল না। তার মাথার ভেতর আবার ডায়েরির শেষ লাইনটা ভেসে উঠল—“আমি চলে যাচ্ছি অনেক দূরে।”

“কোথায় গেছে?” অনির্বাণ প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

লোকটা তার দিকে গভীরভাবে তাকাল, যেন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এই অচেনা মানুষটার কাছে কতটা বলা যায়। তারপর বলল, “যদি সত্যিই জানতে চাও, তাহলে কাল সকালে আমার দোকানে এসো। সব কথা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলা যায় না।”

এই বলে সে ধীরে ধীরে দোকানের ভেতর ঢুকে গেল।

অনির্বাণ অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। চারদিকে সন্ধ্যার আলো, দোকানের সাইনবোর্ড জ্বলছে, মানুষের হাঁটার শব্দ, অথচ তার মনে হচ্ছিল, সময় আবার থেমে গেছে। সে জানত, এই বৃদ্ধ লোকটা শুধু কোনো দোকানদার নয়, এই গল্পের ভেতরের একজন চরিত্র, এমন একজন, যে হয়তো জানে সেই অচেনা মেয়েটার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা।

আর সেই সত্য শোনার জন্য তাকে আর একটা রাত অপেক্ষা করতে হবে।

সেই রাতটা অনির্বাণের কাছে অস্বাভাবিক রকম দীর্ঘ হয়ে উঠল। লজের ছোট ঘরে শুয়ে সে বারবার পাশ ফিরছিল, কিন্তু ঘুম আসছিল না। জানালার বাইরে দিয়ে ট্রেনের দূরের হুইসেল ভেসে আসছিল, মাঝেমধ্যে কুকুরের ডাক, আর পাহাড়ি বাতাসের মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ—সব মিলিয়ে যেন এক অদ্ভুত সঙ্গীত, যার তালে তালে তার মাথার ভেতর ঘুরছিল রিমঝিম নামটা। নামটা সে আগে কখনো শোনেনি, অথচ এখন মনে হচ্ছিল বহুদিনের চেনা।

ভোর হতেই সে উঠে পড়ল। চা খেয়েও গলার ভেতরের অস্বস্তিটা গেল না। বুকের মধ্যে অজানা আশঙ্কা আর উত্তেজনা মিলেমিশে এমন একটা অনুভূতি তৈরি করেছিল, যেন সে কোনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—যেটা খুললে তার জীবনের অনেক হিসাব বদলে যেতে পারে।

নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সে বইয়ের দোকানের সামনে পৌঁছে গেল। দোকানটা তখনো পুরোপুরি খোলা হয়নি। আধখানা শাটার তোলা, ভেতরে ধুলো জমা তাক আর পুরোনো কাগজের গন্ধ। একটু পরেই সেই বৃদ্ধ লোকটা এলেন, আগের দিনের মতোই ধীর পায়ে হাঁটছেন।

“তুমি ঠিক সময়েই এসেছ,” লোকটা বললেন, তালা খুলতে খুলতে।

দুজনেই ভেতরে ঢুকল। দোকানের পেছনে একটা ছোট কাঠের টেবিল, দুটো চেয়ার। বৃদ্ধ লোকটা বসতে ইশারা করলেন। নিজেও ধীরে ধীরে বসলেন, যেন কথা শুরু করার আগে ভেতরে ভেতরে কিছু গুছিয়ে নিচ্ছেন।

“তুমি বলেছিলে, কলকাতা থেকে এসেছ,” তিনি শুরু করলেন। “ডায়েরির কথা বলেছিলে… সবটা বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু তোমার চোখে মিথ্যে নেই।”

অনির্বাণ মাথা নাড়ল। “আমি শুধু জানতে চাই, ও এখন কোথায়… আর কী হয়েছিল ওর সঙ্গে।”

লোকটা জানালার দিকে তাকাল। বাইরের আলো তার মুখের ভাঁজগুলো আরও স্পষ্ট করে তুলল।

“রিমঝিম এখানে এসেছিল পাঁচ বছর আগে,” তিনি ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন। “মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। কলকাতায় চিকিৎসা অসম্ভব রকম খরচের হয়ে উঠেছিল। কোনো আত্মীয় পাশে দাঁড়ায়নি। তখন সে শুনল, এখানে একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষিকার কাজ আছে, আর কাছেই সরকারি হাসপাতাল—চিকিৎসা সস্তা।”

তিনি একটু থামলেন।

“ও খুব সাহসী মেয়ে ছিল। মুখে কখনো অভিযোগ শুনিনি। সকালে স্কুল, দুপুরে হাসপাতালে মা’র কাছে, রাতে আবার ছোট ঘরে ফিরে পড়াশোনা, রান্না, সব নিজে। মাঝে মাঝে দোকানে এসে বই দেখত। তখনই আমার সঙ্গে আলাপ।”

অনির্বাণ চুপ করে শুনছিল। তার বুকের মধ্যে অদ্ভুত ব্যথা হচ্ছিল।

“মা ছয় মাসের মধ্যেই মারা গেলেন,” বৃদ্ধ লোকটা বললেন নিচু গলায়। “সেদিন ও একেবারে ভেঙে পড়েছিল। কলকাতায় ফেরার মতো জায়গা ছিল না, টাকাও না। স্কুলের চাকরিটাই তখন ওর একমাত্র অবলম্বন।”

“তাহলে ও চলে গেল কেন?” অনির্বাণ প্রশ্ন করল।

লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কারণ অতীত কখনো পুরো ছেড়ে যায় না, বাবা। কলকাতায় ওর জীবনে কেউ একজন ছিল।”

এই কথায় অনির্বাণের বুক কেঁপে উঠল।

“একজন ছেলে,” লোকটা বললেন। “ছোটবেলা থেকে চেনা। দুজনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ছেলেটার পরিবার ধনী, বড় ব্যবসায়ী। তারা এই সম্পর্ক মানেনি। খুব অপমান করেছিল রিমঝিমকে।”

অনির্বাণের মাথার ভেতর ডায়েরির কিছু অস্পষ্ট লাইন ভেসে উঠল—অপমান, আত্মসম্মান, ভাঙা স্বপ্ন।

“শেষ পর্যন্ত ছেলেটা পরিবারকে অমান্য করতে পারেনি,” বৃদ্ধ লোকটা বললেন। “সে অন্য মেয়েকে বিয়ে করে। রিমঝিম তখন কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে আসে।”

অনির্বাণের ঠোঁট শুকিয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল, এই গল্পটা কোথাও যেন সে আগে শুনেছে… খুব কাছ থেকে।

“কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়,” লোকটা আবার বলতে শুরু করলেন। “দুই বছর পর, একদিন হঠাৎ সেই ছেলেটা এখানে এসে হাজির।”

অনির্বাণ চমকে উঠল। “এখানে?”

“হ্যাঁ,” লোকটা মাথা নাড়লেন। “সে জানতে পেরেছিল রিমঝিম এখানে আছে। স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছিল, ব্যবসার সঙ্গে ঝামেলা, পরিবার থেকেও দূরত্ব—সব মিলিয়ে একরকম ভেঙে পড়া মানুষ। সে রিমঝিমকে ফেরত চাইছিল।”

অনির্বাণের বুকের ভেতর যেন একটা অদ্ভুত চাপ জমে উঠল।

“রিমঝিম কী করেছিল?” সে প্রশ্ন করল।

“সে রাজি হয়নি,” বৃদ্ধ লোকটা বললেন দৃঢ় গলায়। “বলেছিল, ‘ভালোবাসা যদি তখন শক্ত না হয়, পরে তার কোনো দাম নেই।’”

এই লাইনটা শুনে অনির্বাণের শরীর কেঁপে উঠল। কারণ এই একই কথা সে একবার শুনেছিল… অনেক বছর আগে… এক মেয়ের মুখে।

তার মাথা ঘুরে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “ওই ছেলেটার নাম কী ছিল?”

বৃদ্ধ লোকটা সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।

“অনির্বাণ।”

মুহূর্তের মধ্যে দোকানের ভেতরের সব শব্দ যেন মিলিয়ে গেল।

অনির্বাণের কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল।

“কাকু… আপনি কী বলছেন?” তার গলা কাঁপছিল।

“তোমার পুরো নাম?” বৃদ্ধ লোকটা ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন।

“অনির্বাণ সেন,” সে প্রায় অচেতনভাবে বলল।

লোকটা চোখ বন্ধ করলেন এক মুহূর্তের জন্য।

“রিমঝিমের ডায়েরিতে এই নামই লেখা ছিল,” তিনি ফিসফিস করে বললেন।

অনির্বাণ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তার শরীর কাঁপছে, হাত ঘামছে।

“না… এটা অসম্ভব,” সে বলল। “আমি… আমি কখনো এখানে আসিনি… আমি… আমি তো…”

হঠাৎ তার মাথার ভেতর অনেক পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠল—একটা মেয়ে, কলেজের গেট, বৃষ্টির দিন, ঝগড়া, পরিবারের চাপ, এক ভাঙা ফোনকল, আর তারপর… ইচ্ছা করে ভুলে যাওয়া একটা অধ্যায়।

“ও এখন কোথায়?” অনির্বাণের চোখে জল চলে এসেছে।

বৃদ্ধ লোকটা ধীরে বললেন, “তুমি চলে যাওয়ার পর কয়েক মাস এখানে ছিল। তারপর বলল, আর কোনোদিন তোমার সামনে পড়তে চায় না। পাহাড়ের আরও ভেতরের দিকে, একটা ছোট শহরে চলে গেছে—কালিম্পং।”

অনির্বাণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

পাঁচ বছর আগে সে নিজের স্বার্থে, দুর্বলতায়, পরিবারকে খুশি করতে গিয়ে একটুকরো জীবন ভেঙে দিয়েছিল।

আজ সেই ভাঙা জীবনের ডায়েরি তার হাতে এসে পৌঁছেছে।

আর ভাগ্য যেন তাকে শেষবারের মতো একটা সুযোগ দিচ্ছে।

সে ধীরে করে বলল, “আমি ওকে খুঁজে বের করব।”

বৃদ্ধ লোকটা শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “খুঁজে পাওয়াই সব নয়, বাবা। প্রশ্ন হল—ও তোমাকে আবার দেখতে চাইবে তো?”

অনির্বাণ কোনো উত্তর দিল না।

তার চোখের সামনে শুধু একটাই ছবি ভাসছে—রিমঝিম, পাহাড়ের শহরে কোথাও একা দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো এখনও তার ভেতরে জমে আছে পুরোনো ক্ষত, পুরোনো ভালোবাসা, আর অসমাপ্ত প্রশ্ন।

কালিম্পং যাওয়ার বাসটা ভোর পাঁচটায় ছাড়ে। অনির্বাণ সারা রাত প্রায় ঘুমোতে পারেনি। মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল সেই নাম—রিমঝিম। যে নামটা সে বহু বছর ধরে নিজের স্মৃতির গহীনে চেপে রেখেছিল, আজ সেটা আবার বুকের ঠিক মাঝখানে এসে ধাক্কা মারছে।

ভোরের অন্ধকারে সে লজ ছাড়ল। ব্যাগটা হালকা, কিন্তু বুকের ভেতরের ভার যেন কয়েক মণ ওজনের। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হচ্ছিল, সে শুধু একটা শহর বদলাতে যাচ্ছে না—সে এগোচ্ছে নিজের অতীতের দিকে, সেই জায়গায় যেখানে সে একদিন কাপুরুষের মতো পিঠ দেখিয়েছিল।

বাস ছাড়তেই পাহাড়ি রাস্তা শুরু হল। আঁকাবাঁকা পথ, গভীর খাদ, নিচে মেঘের মতো ভাসতে থাকা কুয়াশা। প্রতিটা বাঁকে বাঁকে অনির্বাণের মনে হচ্ছিল, তার ভেতরের স্মৃতিগুলোও ঠিক এই রাস্তার মতোই—জটিল, বিপজ্জনক, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

কলেজের দিনগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

রিমঝিম তখন খুব সাধারণ একটা মেয়ে। বড় বড় স্বপ্ন নয়, কিন্তু চোখে ছিল অদ্ভুত এক স্থিরতা। সে খুব বেশি কথা বলত না, কিন্তু হাসলে মনে হতো, পৃথিবীটা একটু নরম হয়ে যায়। অনির্বাণ তখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত—বাবার ব্যবসা, মা’র সামাজিক স্বপ্ন, বড় বাড়ি, বড় পদ।

ভালোবাসা এসেছিল নিঃশব্দে।

ক্যাম্পাসের বেঞ্চে বসে কথা, লাইব্রেরির পুরোনো বইয়ের গন্ধ, বর্ষার দিনে এক ছাতার নিচে দাঁড়ানো—এই সব ছোট ছোট মুহূর্তে।

কিন্তু বাড়িতে জানাতেই সব বদলে গিয়েছিল।

“ও তোমার লেভেলের মেয়ে নয়।”
“আমাদের সমাজে মানায় না।”
“ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না।”

সে প্রতিবাদ করেছিল, একদিন, দুদিন। তারপর ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।

শেষ ফোনকলটা আজও তার কানে বাজে।

“তুমি কি আমার জন্য একবারও লড়বে না?” রিমঝিম কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।

সে তখন চুপ করে ছিল।

সেই নীরবতাই ছিল সবচেয়ে বড় উত্তর।

বাসটা যখন কালিম্পং শহরে ঢুকল, তখন সকাল প্রায় দশটা। পাহাড়ি শহরটা ছোট, শান্ত, রঙিন বাড়ি আর ফুলে ভরা বারান্দায় সাজানো। কিন্তু অনির্বাণের চোখে কিছুই সুন্দর লাগছিল না। তার বুকের ভেতর শুধু একটা প্রশ্ন—ও আমাকে দেখলে কী করবে?

খুশি হবে?
রাগ করবে?
না কি মুখ ঘুরিয়ে চলে যাবে?

সে প্রথমে বৃদ্ধ দোকানদারের দেওয়া ঠিকানাটা খুঁজে বের করল—একটা ছোট স্কুলের নাম।

“রিমঝিম দত্ত,” সে প্রধান শিক্ষিকাকে জিজ্ঞেস করল।

মাঝবয়সি মহিলা একটু অবাক হলেন। “হ্যাঁ, উনি এখানে পড়ান। তবে আজ স্কুলে নেই।”

অনির্বাণের বুক ধক করে উঠল। “কোথায় থাকেন?”

মহিলাটা একটু ভেবে বললেন, “নিচের বাজারের দিকে, লাল ছাদের ছোট বাড়িটা।”

সে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে সেই দিকে রওনা দিল।

রাস্তাটা ঢালু, দুপাশে কাঠের বাড়ি, ফুলের টব, আর দূরে পাহাড়ের গায়ে মেঘ আটকে আছে। লাল ছাদের বাড়িটা খুঁজে পেতে তার সময় লাগল না।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে হঠাৎ থমকে গেল।

এই তো।

এই দরজার ওপাশেই আছে সেই মেয়ে, যার জন্য সে একদিন নিজের ভালোবাসাকে হত্যা করেছিল।

তার হাত কাঁপছিল। বুকের ভেতর এমন জোরে ধুকপুক করছিল যে, মনে হচ্ছিল রিমঝিম বুঝি ভেতর থেকেই শুনতে পাচ্ছে।

অনেক সাহস করে সে কলিং বেল চাপল।

কয়েক সেকেন্ড।

তারপর দরজা খুলল।

রিমঝিম।

পাঁচ বছরে সে বদলে গেছে। আগের মতো কাঁচা মেয়ে নয়। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, চুলে কয়েকটা পাকাধরা রেখা, কিন্তু চোখ দুটো… এখনো সেই একই গভীর, শান্ত, আহত চোখ।

দুজনেই চুপ করে তাকিয়ে রইল।

অনির্বাণের গলা শুকিয়ে গেল।

“আমি…,” সে কথা শুরু করতে গিয়ে থেমে গেল।

রিমঝিম প্রথম কথা বলল।

“তুমি এখানে কেন?”

তার গলায় রাগ নেই, অভিযোগ নেই।

আছে শুধু গভীর ক্লান্তি।

অনির্বাণ ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমার ডায়েরি পেয়েছি।”

এই কথা শুনে রিমঝিমের মুখ সাদা হয়ে গেল।

“কোন ডায়েরি?”

“যেটা তুমি কলকাতায় রেখে গিয়েছিলে।”

এক মুহূর্তের জন্য সে চোখ বন্ধ করল। তারপর ধীরে দরজাটা পুরো খুলে বলল, “ভেতরে এসো।”

ঘরের ভেতরটা ছোট, পরিষ্কার। দেয়ালে বইয়ের তাক, জানালায় ফুলের টব। খুব সাধারণ জীবন।

রিমঝিম চেয়ারে বসল, অনির্বাণের দিকে তাকাল না।

“কেন এসেছ?” সে আবার জিজ্ঞেস করল।

অনির্বাণের চোখ ভিজে উঠল।

“ক্ষমা চাইতে,” সে বলল।

রিমঝিম হেসে ফেলল—একটা ছোট, তিক্ত হাসি।

“পাঁচ বছর পরে?”

“আমি কাপুরুষ ছিলাম,” সে বলল। “আজও আছি। কিন্তু তোমাকে না বলে আর পারিনি।”

রিমঝিম জানালার দিকে তাকাল।

“আমি অনেক কষ্টে তোমাকে ভুলেছি, অনির্বাণ। তুমি কেন আবার এসেছ?”

তার এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর ছিল না।

অনির্বাণ শুধু বলল, “কারণ আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।”

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।

শুধু দূরে পাহাড়ি বাতাসের শব্দ।

রিমঝিমের চোখে জল জমল, কিন্তু পড়ল না।

“ভালোবাসা?” সে ফিসফিস করে বলল। “যেটা সময়মতো লড়াই করে না, সেটা ভালোবাসা নয়… সেটা শুধু দুর্বলতা।”

অনির্বাণ মাথা নিচু করল।

এই গল্পের সবচেয়ে কঠিন অংশটা এখন শুরু হতে চলেছে।

ঘরের ভেতরের নীরবতাটা ভারী হয়ে উঠছিল। জানালার বাইরে পাহাড়ি বাতাস বইছে, দূরে কোথাও প্রার্থনার ঘণ্টা বাজছে, অথচ রিমঝিম আর অনির্বাণ—দুজনের মাঝখানে জমে আছে পাঁচ বছরের না বলা কথা, জমে থাকা কষ্ট, আর অসমাপ্ত ভালোবাসা।

অনির্বাণ মাথা নিচু করে বসে ছিল। রিমঝিম ধীরে ধীরে উঠে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। তার পিঠটা অনির্বাণের দিকে, যেন সে নিজের মুখের অনুভূতিগুলো আড়াল করতে চাইছে।

“তুমি জানো,” রিমঝিম ধীরে ধীরে বলল, “কলকাতা ছেড়ে আসার পর আমি প্রতিদিন ভাবতাম, তুমি একদিন আসবে। হয়তো হঠাৎ দরজায় দাঁড়িয়ে বলবে—‘চলো, সব ছেড়ে নতুন করে শুরু করি।’”

তার কণ্ঠে জমে থাকা আবেগ কাঁপতে লাগল।

“প্রথম বছরটা আমি অপেক্ষা করেছি। প্রতিটা অপরিচিত ফোনকল, প্রতিটা দরজার শব্দে বুক কেঁপে উঠত। তারপর ধীরে ধীরে বুঝলাম… তুমি আসবে না।”

অনির্বাণের চোখে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আমি তোমাকে ঘৃণা করতে চেয়েছিলাম,” রিমঝিম বলল। “কিন্তু পারিনি। রাতে ঘুমোতে গেলে তোমার মুখটাই চোখের সামনে ভেসে উঠত। নিজের ওপর রাগ হতো—এত দুর্বল কেন আমি?”

সে ঘুরে তাকাল।

“তুমি জানো, মায়ের মৃত্যুর পর আমি পুরো একা হয়ে গিয়েছিলাম। তখন যদি তুমি পাশে থাকতে… আমি হয়তো এতটা ভাঙতাম না।”

অনির্বাণ কাঁপা গলায় বলল, “আমি জানি। আমি ভুল করেছি। শুধু ভুল না… আমি অপরাধ করেছি।”

রিমঝিম আবার চুপ করে গেল কিছুক্ষণ।

তারপর বলল, “এই পাঁচ বছরে অনেক প্রস্তাব এসেছে। স্কুলের এক সহকর্মী, এক ডাক্তারের ছেলে… সবাই ভালো মানুষ। আমি চাইলে বিয়ে করে সংসার করতে পারতাম।”

অনির্বাণের বুক ধক করে উঠল।

“কিন্তু করিনি,” রিমঝিম বলল শান্ত গলায়। “কারণ প্রতিবার মনে হয়েছে, আমার ভেতরের ঘরটা এখনও দখল করে আছে একজন মানুষ… যে একদিন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।”

এই কথায় অনির্বাণ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে উঠে দাঁড়াল।

“আমি আর কোনো অজুহাত দেব না,” সে বলল। “আমি শুধু জানি, আজ যদি তুমি আমাকে তাড়িয়ে দাও, আমি মেনে নেব। কিন্তু যদি একটুও সুযোগ থাকে… আমি সারাজীবন তোমার কষ্ট মেটাতে চেষ্টা করব।”

রিমঝিম তার দিকে তাকাল।

“তুমি কি নিশ্চিত?” সে জিজ্ঞেস করল। “তোমার পরিবার? তোমার সমাজ? আবার চাপ দেবে না?”

অনির্বাণ দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল।

“এই পাঁচ বছরে আমি বাইরে থেকে সফল হয়েছি,” সে বলল। “বাবার ব্যবসা, বড় বাড়ি, সব পেয়েছি। কিন্তু ভেতরে আমি ফাঁকা। প্রতিদিন মনে হয়েছে, আমি ভুল জীবনে বেঁচে আছি।”

রিমঝিম ধীরে ধীরে এসে চেয়ারে বসল।

“ভালোবাসা শুধু কথা নয়, অনির্বাণ,” সে বলল। “ভালোবাসা মানে লড়াই করা, অপমান সহ্য করা, নিজের সুবিধা ছেড়ে দেওয়া।”

“আমি প্রস্তুত,” অনির্বাণ বলল। “এইবার আর পালাব না।”

রিমঝিম তার চোখের দিকে তাকাল।

“তোমাকে বিশ্বাস করতে আমার ভয় করছে,” সে বলল। “কারণ একবার বিশ্বাস করে আমি সব হারিয়েছি।”

অনির্বাণ ধীরে বলল, “তুমি চাইলে আমাকে সময় দাও। প্রমাণ করতে দাও।”

বাইরে মেঘ জমতে শুরু করেছে। পাহাড় ঢেকে যাচ্ছে কুয়াশায়।

রিমঝিম জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি জানি না, ভবিষ্যতে কী হবে। কিন্তু আজ… আমি তোমাকে তাড়িয়ে দিতে পারছি না।”

এই কথাটুকুই অনির্বাণের কাছে আশীর্বাদের মতো লাগল।

সে ধীরে বলল, “এইটুকুই যথেষ্ট।”

দুজনের মাঝখানে এখনও দূরত্ব আছে, কিন্তু সেই দূরত্বের ভেতর দিয়ে এবার একটা সরু আলো ঢুকতে শুরু করেছে।

ভাঙা বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে ভালোবাসা গড়া কি সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনও সময়ের হাতে।

কালিম্পং-এর ছোট রাস্তাগুলো যেন আরও নীরব হয়ে গেছে। পাহাড়ের কুয়াশা ভেঙে ভেঙে ঘুরছে, গাছের পাতা আছড়ে পড়ছে হাওয়ায়। অনির্বাণ আর রিমঝিম চুপচাপ বসে আছে, দুজনের মধ্যেই এখন অদ্ভুত এক ভার—ভয়, আশঙ্কা, আশা আর প্রেমের মিশ্রণ।

অনির্বাণ কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু গলায় শব্দ আটকে গেল। অবশেষে সে বলল, “আমরা আজ এখানে শুরু করতে পারি। শুধু তুমি চাইলে।”

রিমঝিম তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি চাই… তবে ভয় পাচ্ছি।”

“ভয়? কেন?” অনির্বাণ প্রশ্ন করল, যদিও ভেতরে জানত এই ভয় তাকে শুধু আরও দৃঢ় করবে।

“ভয় আমার নিজের মন থেকে,” রিমঝিম বলল। “ভয়—যদি তুমি আবার চলে যাও, যদি আমাদের জীবন আবার টুকরো হয়ে যায়। আমি আর সেই কষ্ট সহ্য করতে পারব না।”

অনির্বাণের বুক ধীরে ধীরে ফেটে যাওয়া অনুভূতির ওপর চাপা লাগল। সে বলল, “আমি আর পালাব না। এবার শেষ।”

তাদের মধ্যকার প্রথম যোগাযোগটা ছিল কেবল চুপচাপ, হাত ছোঁয়া, চোখের মৃদু যোগাযোগ। ছোট ছোট স্পর্শে বোঝাপড়া, বোঝা যেত—পাঁচ বছরের ফাঁকা ছায়া এখন ভরে উঠছে ধীরে ধীরে।

এরপর অনির্বাণ ফোনটা ধরল। বাবা-মাকে জানাতে হবে, শুধু রিমঝিম নয়, নিজের জীবনও কেটে গেছে এতদিন অন্য মানুষের চাপের তলায়।

“বাবা, মা… আমি রিমঝিমকে খুঁজে পেয়েছি,” সে বলল। কণ্ঠ কেঁপে গেল।

কলকাতায় তার বাবা প্রথমে চুপ। তারপর বলল, “অনির্বাণ… তুমি এই পাঁচ বছরে আমাদেরকে ভাবিয়ে রেখেছো। কিন্তু যদি তুমি সত্যিই খুঁজে পেয়েছো… আমরা সমর্থন করব। শুধু বুঝে নাও—আমরা তোমার পাশে আছি।”

মায়ের কণ্ঠেও শান্তি, তবে অবাক হওয়ার লাজ।

“আমরা চাইব সব ঠিকভাবে হোক, কিন্তু এবার নিজেই নাও সিদ্ধান্ত।”

এটা অনির্বাণের জন্য এক অদ্ভুত মুক্তির অনুভূতি নিয়ে এলো। সে বুঝল, এখন আর কোনো চাপ নেই—শুধু রিমঝিমের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার স্বাধীনতা।

পরের কয়েক সপ্তাহ তারা কালিম্পং-এ কাটালো। পাহাড়ের ছোট চা-বাগানে হেঁটে হেঁটে কথোপকথন, স্কুলের কাজ, বাজার, চা-এর দোকান, পাহাড়ের কুয়াশায় একসাথে বসে পুরানো স্মৃতিগুলো আলোচনার মাধ্যমে ভেঙে দেওয়া।

রিমঝিম দেখল, অনির্বাণ শুধু ক্ষমা চাইছে না, সে প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে—ভবিষ্যতে কোনো চাপ আর অপমান ছাড়াই একসাথে থাকা।

একদিন সন্ধ্যায় তারা পাহাড়ের উপরে বসে সূর্যাস্ত দেখছিল। রিমঝিম ধীরে বলল, “আমি ভয় করছিলাম ভালোবাসার জন্য। কিন্তু আজ… আমি মনে করি, সত্যিকারের ভালোবাসা সেই ভয়কে ছাড়িয়ে যায়।”

অনির্বাণ তার হাত ধরল। “আমি জানি, এবার আমরা একসাথে থাকব। আর যা হারিয়েছি, তা আর ফিরে পাব না—কারণ আমরা নতুন শুরু করছি।”

সূর্যাস্তের লাল আলোতে দুই চোখের মধ্যে এখন শুধু ভালোবাসা, কোনো পুরোনো অভিযোগ নেই, কোনো ভাঙা স্মৃতি নেই। শুধু নতুন আশা।

ফাইナル মুহূর্তে তারা দুজন একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়াল। পাহাড়ের হাওয়া হালকা বাতাসের মতো বইছে, আর মনে হচ্ছে, পাঁচ বছরের ফাঁক, কষ্ট, ভুল—সব মিলিয়ে গেছে এক নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত।

শুধু এক কথাই শোনা যাচ্ছে দূরে—ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না।

কালিম্পং-এর ছোট শহরটা ভোরের কুয়াশায় ঢাকা। পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের প্রথম রশ্মি পড়ছে, আর শহরটা ধীরে ধীরে জীবন ফিরে পাচ্ছে। অনির্বাণ আর রিমঝিম আজ সকালে ঘুম থেকে উঠল। বাইরে ঠান্ডা বাতাস, ছোট ছোট পাখির ডাক, আর দূরে হাওয়ার সঙ্গে গাছের পাতা নাচছে।

অনির্বাণ চায়ের কাপে হাত রাখল। রিমঝিম পাশে এসে বসল। দুজনের মধ্যকার দূরত্ব, যা এত বছর ধরে জমে ছিল, এখন নিঃশব্দে মিলেমিশে যাচ্ছে।

“আজ প্রথম দিন,” অনির্বাণ ফিসফিস করে বলল, “যেখানে আমরা শুধু আমরা। পুরানো কষ্ট, ভুল, সব কিছু ছাড়ব।”

রিমঝিম একটু হেসে বলল, “হ্যাঁ… আমি ভাবছিলাম, এই দিন আসবে কি না। কিন্তু তুমি যে সত্যিই এসেছ—এটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

তারপর তারা হাত ধরা অবস্থায় বেরিয়ে পড়ল। শহরের ছোট রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, একে অপরের চোখে চোখ রেখে তারা বুঝল—যে সময় চলে গেছে, তা আর ফিরবে না, কিন্তু এখন থেকে সব সময় তাদের নিজের।

স্কুলে ফিরে যাওয়া হল তাদের প্রতিদিনের শুরু। রিমঝিম আবার তার শিক্ষিকার কাজ শুরু করল। অনির্বাণ শহরের ছোট ব্যবসায় বা সোশ্যাল প্রকল্পে নিয়োজিত হল। তবে প্রতিটি সন্ধ্যা তারা একে অপরের সঙ্গে কাটায়—পাহাড়ের ওপর হেঁটে যাওয়া, চা-বাগান, বাজার, ছোট সিনেমা—সব কিছুই এক নতুন রঙে ভরা।

একদিন দুপুরে রিমঝিম তার ডায়েরি বের করল। পাতাগুলো খুলে, যেখানে পাঁচ বছর আগের লেখা ছিল—দুঃখ, ক্ষোভ, আশা—সবগুলোকে তারা একসাথে পড়ল। অনির্বাণ ধীরে বলল, “এই সব আমরা আর কখনো ভুলব না। সবকিছু আমাদের শেখায়, আমাদেরকে শক্ত করে তোলে।”

রিমঝিম মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ… আর এবার আমরা একে অপরকে ভাঙতে দেব না। কষ্ট, ভুল, সবাইকে পাশে রাখব।”

দিনগুলো যায়, কুয়াশা আসা-যাওয়া করে, বৃষ্টি আসে, সূর্য বের হয়। পাহাড়ের শহরটা ধীরে ধীরে তাদের জন্য নতুন বাড়ি হয়ে ওঠে। অনির্বাণ আর রিমঝিম শুধু ভালোবাসা নয়, একে অপরের জীবনের প্রতিটি দায়িত্ব ও সুখ ভাগাভাগি করা শিখল।

এক বিকেলে, তারা পাহাড়ের চূড়ায় বসে সূর্যাস্ত দেখছিল। রিমঝিম হাতটা অনির্বাণের হাতে দিল।

“যখনও আমি ভাবি, আমরা কতটা দুর্বল ছিলাম, কতটা দূরে চলে গিয়েছিলাম… তখন মনে হয়—যদি কখনও হাল ছাড়তাম, আজকের এই মুহূর্ত কখনও আসতো না।”

অনির্বাণ উত্তর দিল, “সত্যি। ভালোবাসা সবসময় শেষ হয় না, কিন্তু কখনও কখনও খুঁজে পেতে অনেক সময় লাগে। আজ আমরা একসাথে, আর আমাদের গল্পের নতুন অধ্যায় শুরু।”

সূর্য ঢলে গেছে পাহাড়ের গায়ে, রঙিন আলো আর কুয়াশার মধ্যে তাদের দুটি ছায়া এক হয়ে গেছে। পাঁচ বছরের ফাঁক, ভুল, কষ্ট—সব মিলিয়ে গেছে।

শুধু ভালোবাসা রয়ে গেছে।
শুধু নতুন শুরু।
শুধু একসাথে পথ চলা।

এইভাবে, অনির্বাণ আর রিমঝিম তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় শুরু করল—একটা যা পুরানো কষ্টকে সম্মান জানিয়ে, নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন ভালোবাসায় ভরা।