Romantic
আকাশের রঙটা আজ সকাল থেকেই কেমন যেন ছাইবর্ণ হয়ে আছে। ঢাকার রাজপথে ধুলো আর ধোঁয়ার রাজত্ব চললেও, আজ বাতাসে এক ধরণের ভিজে ভাব। আহিয়ান তার অফিসের বিশ তলার কেবিনে বসে কাঁচের ওপারে শহরটাকে দেখছিল। তার সামনে পড়ে আছে ‘দ্য গ্রিন ভ্যালি’ প্রজেক্টের নকশা, কিন্তু কলমটা হাতে নিয়েও সে কিছু লিখতে পারছে না।
আহিয়ানের বয়স বত্রিশ। দীর্ঘদেহী, ধারালো নাক আর চোখে এক ধরণের গভীর বিষণ্ণতা। এই বিষণ্ণতা তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে। অফিসের সবাই তাকে চেনে এক রোবট হিসেবে—যে শুধু কাজ বোঝে। কিন্তু এই রোবটের আড়ালে যে একটা মানুষ আছে, যে বৃষ্টির শব্দে আনমনা হয়, সেটা কেউ জানে না।
"স্যার, কফি?" পিওন কাশেম দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল।
আহিয়ান মাথা না নেড়েই বলল, "রেখে যাও।"
কফির ধোঁয়া ওঠা কাপটা টেবিলের এক কোণে পড়ে রইল। আহিয়ানের মনে পড়ছিল তার মায়ের কথা। গত রাতেও মা ফোন করে কান্নাকাটি করেছেন, "তোর কি নিজের একটা সংসারের ইচ্ছে নেই আহি? কতদিন আর এভাবে একা থাকবি?"
আহিয়ান উত্তর দেয়নি। উত্তর তার জানা নেই। আসলে সে কাউকে তার জীবনের সেই ব্যক্তিগত পরিসরে জায়গা দিতে ভয় পায়। ভালোবাসা মানেই তো অধিকার, আর অধিকার মানেই হারানোর ভয়।
অফিসের একটা বিশেষ কাজে আহিয়ানকে যেতে হচ্ছে নেত্রকোনার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানে একটা পুরনো জমিদার বাড়ি সংস্কার করে রিসোর্ট বানানো হবে। আহিয়ান নিজেই এই প্রজেক্টের দায়িত্ব নিয়েছে, মূলত শহর থেকে কয়েকটা দিন দূরে থাকার অজুহাতে।
তার কালো রঙের হ্যারিয়ার গাড়িটা যখন ঢাকা ছাড়ল, তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে। আহিয়ান ড্রাইভারকে বলল, "রফিক ভাই, গানটা বন্ধ করুন। বৃষ্টির শব্দ শুনি।"
গাড়ি যত এগোচ্ছে, দুপাশের দৃশ্য তত বদলাচ্ছে। কংক্রিটের জঙ্গল পেরিয়ে এখন শুধু সবুজ আর সবুজ। দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চলার পর যখন তারা মফস্বল শহরের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। অন্ধকার রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলো খুব একটা নেই।
হঠাৎ একটা বিকট শব্দ করে গাড়িটা থেমে গেল।
"কী হলো রফিক ভাই?" আহিয়ান কিছুটা বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল।
রফিক নিচে নেমে বোনট খুলে কিছুক্ষণ দেখে কাঁচুমাচু মুখে বলল, "স্যার, ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গেছে মনে হয়। এই বৃষ্টিতে আর স্টার্ট নেবে না।"
আহিয়ান চারদিকে তাকাল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। বৃষ্টি আরও বাড়ছে। ফোনের নেটওয়ার্কও খুব দুর্বল। ঠিক সেই মুহূর্তেই সে দেখতে পেল দূরে একটা মৃদু আলোর রেখা। কোনো একটা বাড়ি আছে সেখানে।
আহিয়ান একটা ছাতা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। কাদা আর পানির মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে সেই আলোর উৎসের কাছে পৌঁছাল। এটি একটি ছোট দোতলা বাড়ি, যার সামনে লতানো অপরাজিতা ফুলের গাছ।
কলিংবেল চাপার কিছুক্ষণ পর দরজাটা খুলল। দরজার ওপাশে যে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে দেখে আহিয়ান মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল সে কেন এখানে এসেছে।
মেয়েটির পরনে হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি। চুলগুলো পিঠের ওপর ছাড়া, ডগা দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। হয়তো সেও বৃষ্টিতে ভিজেছে। তার বড় বড় টানা চোখে এক ধরণের মায়া মাখানো কৌতূহল।
"কাকে খুঁজছেন?" মেয়েটির কণ্ঠস্বর শরতের সকালের মতো পরিষ্কার।
আহিয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আসলে আমার গাড়িটা একটু দূরে নষ্ট হয়ে গেছে। এই বৃষ্টিতে কোনো মেকানিক বা থাকার জায়গা পাচ্ছি না। আমি স্থপতি আহিয়ান চৌধুরী।"
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভেতরে আসার ইশারা করল। "আমি নীলাঞ্জনা। বাইরে দাঁড়িয়ে ভিজবেন না, ভেতরে আসুন। বাবা লাইব্রেরিতে আছেন, আমি তাকে ডেকে দিচ্ছি।"
আহিয়ান ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল। ঘরটা খুব সাধারণ কিন্তু রুচিশীল। কোণায় একটা পুরনো গ্রামোফোন, দেয়ালজুড়ে প্রচুর বইয়ের র্যাক। ঘরটা থেকে বেলী ফুলের মৃদু সুবাস আসছে।
নীলাঞ্জনা যখন ফিরে এল, তার হাতে একটা তোয়ালে আর এক মগ ধোঁয়া ওঠা চা। সে সেটা আহিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, "আগে একটু মুছে নিন, নাহলে জ্বর আসবে। চা-টা খান, শরীর গরম হবে।"
আহিয়ান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অনুভব করল, এই বৃষ্টির রাতে এক অচেনা মেয়ের হাতের চা তাকে এক অদ্ভূত প্রশান্তি দিচ্ছে। সে খেয়াল করল নীলাঞ্জনা আড়চোখে তাকে দেখছে। তাদের চার চোখের মিল হতেই নীলাঞ্জনা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল, তার ফর্সা গালে এক চিলতে গোলাপী আভা ফুটে উঠল।
বাইরে বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দটা এখন একটা ছান্দিক ড্রাম রোলের মতো শোনাচ্ছে। ড্রয়িংরুমে বসে থাকা আহিয়ান খেয়াল করল, নীলাঞ্জনা যখন হাঁটছে, তার পায়ের রূপোর মল থেকে একটা মৃদু রিমিঝিমি শব্দ হচ্ছে। এই যান্ত্রিক শহরে আহিয়ান ভুলেই গিয়েছিল যে মানুষের পায়ের শব্দও এত সুরেলা হতে পারে।
নীলাঞ্জনার বাবা, অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক জনাব মোস্তাফিজুর রহমান ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। অত্যন্ত অমায়িক মানুষ। তিনি আহিয়ানের পরিচয় জেনে বেশ খুশি হলেন।
"বাবা আহিয়ান, এই অবেলায় তোমার গাড়ি নষ্ট হওয়াটা হয়তো একটা ইঙ্গিত। এই বৃষ্টিতে মেকানিক পাওয়া অসম্ভব। আজ রাতটা আমাদের এখানেই কাটাও। আমাদের ঘর ছোট, কিন্তু মনটা বড়।"
আহিয়ান হাসল। "ধন্যবাদ আঙ্কেল। আপনাদের খুব বিরক্ত করলাম।"
"আরে না না! নীলা মা, আহিয়ানের জন্য গেস্ট রুমটা রেডি করে দাও। আর রফিক সাহেবকে (ড্রাইভার) বলো নিচের ঘরে বিশ্রাম নিতে।"
নীলাঞ্জনা চলে যাওয়ার সময় আবার একবার আহিয়ানের দিকে তাকাল। সেই চোখে কী যেন একটা ছিল—একটু কৌতূহল, একটু মায়া।
রাতের খাবারের টেবিলে আহিয়ান দেখল বাঙালিয়ানার এক অপরূপ দৃশ্য। কাঠের বড় ডাইনিং টেবিল। ভাতের গন্ধে ঘর ম ম করছে। নীলাঞ্জনা নিজের হাতে বেড়ে দিচ্ছে। "আপনি কি সবজি খান?" নীলাঞ্জনা প্রশ্ন করল। আহিয়ান মৃদু স্বরে বলল, "জি, খাই। তবে খুব একটা বেশি না।" নীলাঞ্জনা তার পাতে কিছুটা লাউ-চিংড়ি তুলে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "এটা আমাদের বাগানের লাউ। খেয়ে দেখুন, শহরের মতো তিতকুটে স্বাদ হবে না।"
আহিয়ান প্রথম গ্রাস মুখে দিয়েই চমকে উঠল। এত স্বাদ! সে শহরের দামি রেস্টুরেন্টে খেয়েছে ঠিকই, কিন্তু এমন হাতের ছোঁয়া মাখানো স্বাদের কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। খাওয়ার সময় আহিয়ান লক্ষ্য করল নীলাঞ্জনা খুব কম কথা বলে, কিন্তু তার কাজগুলো খুব গোছানো। সে যখন জল ঢালছে বা গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছে, তার হাতার চুড়ির শব্দ এক অন্যরকম আবহ তৈরি করছে।
খাওয়ার পর আহিয়ানকে গেস্ট রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘরটা বেশ ছিমছাম। এক পাশে একটা বড় জানলা, যার ওপারেই বড় একটা বাগান। জানলা দিয়ে হাশনাহেনার তীব্র সুবাস আসছে।
আহিয়ান ঘুমানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। সে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে অন্ধকার চিরে মাঝে মাঝে বিজলি চমকাচ্ছে। হঠাৎ সে দেখল পাশের ঘরের বারান্দায় নীলাঞ্জনা দাঁড়িয়ে আছে। সেও ঘুমায়নি।
নীলাঞ্জনা রেলিং ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ভেজা চুলগুলো এখন আধশুকনো হয়ে পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। বৃষ্টির ঝাপটা এসে তার মুখে লাগছে, কিন্তু সে যেন এক ঘোরের মধ্যে আছে।
আহিয়ান খুব নিচু স্বরে ডাকল, "নীলাঞ্জনা?"
মেয়েটি চমকে উঠল। পাশের ঘর থেকে আহিয়ানের কণ্ঠ শুনে সে দ্রুত নিজের ওড়নাটা ঠিক করে নিল। "আপনি এখনো ঘুমাননি?" নীলাঞ্জনা লজ্জিত কণ্ঠে বলল। "না, আসলে শহরের এসির শব্দে অভ্যস্ত তো, এই বৃষ্টির শব্দে কেমন যেন নেশা লাগছে।" আহিয়ান একটু হেসে বলল।
নীলাঞ্জনা হাসল। "আমাদের এখানে বৃষ্টির শব্দ নেশা নয়, বৃষ্টির শব্দ প্রার্থনা। এই যে শুনছেন টিনের চালে শব্দ—এটা আমাদের জন্য গান।"
কথার পিঠে কথা বাড়ে। সেই মাঝরাতে জানলার ওপারে দাঁড়িয়ে দুই অচেনা মানুষের মধ্যে কথোপকথন শুরু হলো। জানা গেল, নীলাঞ্জনা আগে ঢাকায় পড়াশোনা করত, কিন্তু তার শান্ত স্বভাবের কারণে সে এই মফস্বলেই ফিরে এসেছে। সে এখন অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং করে আর গ্রামের বাচ্চাদের পড়ায়।
কথার মাঝে নীলাঞ্জনা হঠাৎ বলল, "দাঁড়ান, আপনাকে একটা জিনিস দেখাই।"
সে ভেতরে গিয়ে নীল মলাটের একটা ডায়েরি নিয়ে এল। জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সে ডায়েরিটা আহিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল। "এটা কী?" আহিয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। "এখানে আমি বৃষ্টির দিনের অনুভূতিগুলো লিখি। আপনি তো স্থপতি, বড় বড় দালান বানান। একটু পড়ে দেখবেন, সাধারণ মানুষের অনুভূতিগুলো কেমন হয়?"
আহিয়ান ডায়েরিটা নিল। তার আঙুল যখন নীলাঞ্জনার আঙুল স্পর্শ করল, তখন এক তীব্র বিদ্যুৎ খেলে গেল তার শরীরে। নীলাঞ্জনা দ্রুত হাত সরিয়ে নিল, তার মুখটা অন্ধকারেও যেন লাল হয়ে উঠল।
আহিয়ান ডায়েরিটা নিয়ে নিজের বিছানায় এল। ডায়েরির পাতায় পাতায় শুকনো ফুল আর অসাধারণ হাতের লেখায় ছোট ছোট কবিতা আর গল্প। প্রতিটি ছত্রে নীলাঞ্জনার মনের গভীরতা ফুটে উঠেছে।
একটি পাতায় লেখা ছিল: “কিছু কিছু মানুষ বৃষ্টিতে ভিজে যায়, আর কিছু মানুষ বৃষ্টিকে অনুভব করে। আমি সেই অনুভব করতে পারা মানুষটাকে খুঁজছি।”
আহিয়ান স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সে কি সেই মানুষটা হতে পারবে? এই শহুরে যান্ত্রিকতার মাঝে তার নিজের হৃদয়টা কি মরুভূমি হয়ে যায়নি?
পরের দিন ভোরে যখন আহিয়ানের ঘুম ভাঙল, তখন রোদ উঠেছে। পাখির ডাকে চারপাশ মুখরিত। সে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামল। দেখল নীলাঞ্জনা বাগানে ফুল তুলছে। শিশিরভেজা ঘাসে তার নগ্ন পা দুটো চিকচিক করছে।
আহিয়ান কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নীলাঞ্জনা ফিরে তাকাল। রোদের আলোয় তাকে আজ আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে। "শুভ সকাল। ঘুম কেমন হলো?" নীলাঞ্জনা হাসিমুখে প্রশ্ন করল। "শুভ সকাল। আমি সারা রাত আপনার ডায়েরি পড়েছি।"
নীলাঞ্জনার হাসিটা একটু ম্লান হলো। সে কিছুটা শঙ্কিত গলায় বলল, "কেমন লাগল? খুব বোরিং, তাই না?" আহিয়ান তার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাতাসের ঝাপটায় নীলাঞ্জনার চুলের সুবাস আহিয়ানের নাকে লাগল। আহিয়ান খুব ধীরে বলল, "না, মোটেও বোরিং নয়। আপনার ডায়েরি পড়ে মনে হলো, আমি গত ৩২ বছর ধরে বেঁচে ছিলাম ঠিকই, কিন্তু জীবনটা দেখা হয়নি।"
নীলাঞ্জনা কথা বলতে পারল না। তার বুকটা ধক করে উঠল। আহিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে সে এক অদ্ভূত টান অনুভব করল। এই টানটা ভয়ের নয়, এই টানটা এক পরম আশ্রয়ের।
ভোরের আলোটা ঠিকঠাক ফোটেনি তখনও। গ্রামবাংলার এই সময়টা অদ্ভূত মায়াবী। কুয়াশার একটা পাতলা স্তর পুকুর পাড়ের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে। আহিয়ান বারান্দায় এসে দাঁড়াল। তার পরনে একটা ধূসর রঙের হুডি। সে দেখল, নীলাঞ্জনা অনেক ভোরেই উঠে পড়েছে। সে একটা বড় কাঁসার থালা নিয়ে শিউলি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে।
আহিয়ান নিচে নেমে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘাসের শিশির তার পায়ে ঠাণ্ডা পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। সে নরম গলায় ডাকল, "নীলাঞ্জনা।"
নীলাঞ্জনা চমকে গিয়ে পেছনে ফিরল। তার হাতে তখন কমলা বোঁটার শুভ্র একগুচ্ছ শিউলি। সে অবাক হয়ে বলল, "আপনি এত ভোরে? শহরের মানুষরা তো এত ভোরে ওঠে না।"
আহিয়ান একটু হাসল। "শহরের মানুষরা ঘুমায় যখন শহরটা কোলাহলে ভরে যায়। আর আমি জেগেছি কারণ এই শান্তিটা আমি মিস করতে চাইনি। ফুলগুলো কি খুব ভোরে ঝরে যায়?"
"হ্যাঁ," নীলাঞ্জনা ডাল থেকে একটা ঝুলে থাকা ফুল তুলে নিতে নিতে বলল, "শিউলি ফুলের আয়ু খুব কম। ভোরের আলো বাড়ার আগেই তারা ঝরে পড়ে মাটির বুকে মিশে যায়। অনেকটা কিছু গল্পের মতো—শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়।"
আহিয়ান তার কথার গভীরতা বোঝার চেষ্টা করল। সে নীলাঞ্জনার হাত থেকে একটা ফুল তুলে নিল। "সব গল্প শেষ হওয়ার জন্য শুরু হয় না নীলাঞ্জনা। কিছু গল্প ঝরে গেলেও তার সুবাস থেকে যায়।"
নীলাঞ্জনা কথাটি শুনে তার চোখের পলক নামিয়ে নিল। এই প্রথম আহিয়ান তাকে শুধু ‘নীলাঞ্জনা’ বলে ডাকল, কোনো উপাধি ছাড়াই। সম্বোধনটা তার কানে মধুর মতো বাজল।চা খেয়ে দুজনে ঠিক করল একটু গ্রামটা ঘুরে দেখবে। আহিয়ানের গাড়িটা সারাতে মেকানিক আসতে দুপুর হবে। তাই এই সময়টুকু সে নীলাঞ্জনার সাথে কাটাতে চায়।
তারা হাঁটতে শুরু করল গ্রামের সরু মেঠো পথ দিয়ে। দুপাশে ধানের ক্ষেত। বাতাসের ঝাপটায় ধানের শিষগুলো যখন দুলছে, মনে হচ্ছে সবুজ সমুদ্রের ঢেউ।
"আপনি যখন শহর থেকে এখানে এলেন, আপনার কি ভয় করেনি?" নীলাঞ্জনা জিজ্ঞেস করল। "ভয় কিসের?" "এই যে এত একা, এত নিস্তব্ধতা। শহরে তো সব সময় মানুষের ভিড়।"
আহিয়ান থামল। সে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল, "ভিড়ের মধ্যে থাকা মানেই একা না থাকা নয়। ঢাকায় আমি প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের মাঝখানে থাকি, কিন্তু নিজেকে বড্ড একা মনে হয়। এখানে এসে মনে হচ্ছে, আমি একাকীত্বের সাথে সন্ধি করেছি।"
নীলাঞ্জনা তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, "আপনি খুব কঠিন করে কথা বলেন আহিয়ান সাহেব। জীবনটা অতটা কঠিন নয় যতটা আপনি মনে করেন। এই যে দেখুন ফড়িংটা উড়ছে—ওর কি কোনো চিন্তা আছে? ও শুধু জানে ওকে উড়তে হবে।"
আহিয়ান দেখল একটা নীল রঙের ফড়িং নীলাঞ্জনার শাড়ির আঁচলের ওপর এসে বসল। নীলাঞ্জনা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন ফড়িংটা উড়ে না যায়। তার মুখে এক অমলিন শিশুসুলভ হাসি। আহিয়ানের মনে হলো, এই হাসির জন্য সে তার সমস্ত সম্পত্তি ত্যাগ করতে পারে।
হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা বাঁশবাগানের কাছে এল। কালকের বৃষ্টির কারণে মাটি কিছুটা পিচ্ছিল হয়ে আছে। নীলাঞ্জনা সাবধানে হাঁটছিল, কিন্তু হঠাৎ তার পায়ের স্যান্ডেলটা পিছলে গেল।
"নীলা!"
আহিয়ান বিদ্যুৎবেগে তার হাতটা বাড়িয়ে দিল। সে নীলাঞ্জনার কোমর জড়িয়ে ধরল যাতে সে পড়ে না যায়। মুহূর্তের মধ্যে নীলাঞ্জনা আহিয়ানের খুব কাছে চলে এল। তার কপাল আহিয়ানের কাঁধে ঠেকেছে।
বনের নিস্তব্ধতার মাঝে এখন শুধু দুজনের হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আহিয়ান অনুভব করতে পারছে নীলাঞ্জনার শরীরের মৃদু কাঁপন। নীলাঞ্জনার চুলের সুবাস—যা ছিল হাশনাহেনা আর বৃষ্টির মিশ্রণ—তা আহিয়ানের মস্তিষ্ক অবশ করে দিচ্ছিল।
"আপনি ঠিক আছেন?" আহিয়ান খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।
নীলাঞ্জনা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে পিছিয়ে দাঁড়াল। তার বুকটা তখন হাপরের মতো ওঠানামা করছে। লজ্জায় সে কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে। সে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, "জি, ঠিক আছি। পা-টা একটু পিছলে গিয়েছিল।"
আহিয়ান তার হাতটা কিন্তু ছাড়ল না। সে নীলাঞ্জনার ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল। "বাকি পথটুকু এভাবেই চলুন। আমি পড়ে যেতে দেব না।"
নীলাঞ্জনা প্রতিবাদ করল না। বরং সে তার হাতের আঙুলগুলো আহিয়ানের আঙুলের ভাঁজে সঁপে দিল। এই প্রথম এক অজানা অনুভূতি তাদের দুজনের মধ্যে বিদ্যুতের মতো সঞ্চারিত হলো। তারা আর কথা বলল না, কিন্তু হাতের স্পর্শ দিয়ে একে অপরকে এক বিশাল ভরসা দিল।
দুপুরের দিকে তারা নদীর ঘাটে গিয়ে বসল। নদীটা খুব বড় নয়, কিন্তু পানির স্রোত খুব স্বচ্ছ। আহিয়ান পাথরের ওপর বসে পানিতে পা ডুবিয়ে দিল।
"নীলাঞ্জনা, আপনি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছেন?" হঠাৎ আহিয়ানের এই প্রশ্নে নীলাঞ্জনা একটু থমকে গেল।
সে দূরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ভালোবাসা মানে কী আহিয়ান সাহেব? যদি ভালোবাসা মানে কাওকে খুব করে চাওয়া হয়, তবে হ্যাঁ, বেসেছি। কিন্তু যদি ভালোবাসা মানে প্রাপ্তি হয়, তবে আমি এখনো শূন্য।"
আহিয়ান তার দিকে ফিরে তাকাল। "আমার ক্ষেত্রেও তাই। আমি যাকে চেয়েছি তাকে পাইনি, আর যা পেয়েছি তা আমার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আজ কেন জানি মনে হচ্ছে, হারানো সবকিছু ফিরে পাওয়ার একটা সুযোগ সামনে দাঁড়িয়ে আছে।"
নীলাঞ্জনা কিছু বলল না, শুধু তার হাতটা ঘাসের ওপর আহিয়ানের হাতের ঠিক পাশে রাখল। তাদের হাতের মধ্যবর্তী দূরত্ব মাত্র এক ইঞ্চির, কিন্তু সেই এক ইঞ্চি দূরত্ব অতিক্রম করতে যেন হাজার বছর সময় লাগে।
গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে দুপুরের মধ্যেই। রফিক ভাই এসে খবর দিয়ে গেছেন যে তারা চাইলে এখনই রওয়ানা হতে পারেন। কিন্তু আহিয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন খামচে ধরল। এই চব্বিশ ঘণ্টায় তার যান্ত্রিক জীবনের খোলসটা খুলে পড়েছে। সে কোনো এক অদ্ভূত অযুহাতে আরও একটা দিন থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
"আঙ্কেল, প্রজেক্টের কিছু সাইট ভিজিট বাকি আছে, আজ রাতটা থেকে কাল ভোরে রওয়ানা দিলে ভালো হতো," আহিয়ান মোস্তাফিজ সাহেবের কাছে অনুমতি চাইল। তিনি হাসিমুখে রাজি হলেন।
বিকেলে রোদের তেজ কমে এলে আহিয়ান নীলাঞ্জনাকে বলল, "চলুন, আপনাদের গ্রামের হাটটা দেখে আসি। আমি কোনোদিন সত্যিকারের গ্রামের হাট দেখিনি।"
নীলাঞ্জনা একটা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে তৈরি হয়ে এল। কপালে ছোট একটা কালো টিপ। তাকে দেখে আহিয়ানের মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য বুঝি এই সাধারণ সাজেই লুকিয়ে আছে। তারা হাঁটতে হাঁটতে হাটে পৌঁছাল। লোকজনের ভিড়, মাটির হাঁড়িপাতিল, আর টাটকা সবজির পসরা—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।
একটা মণিহারী দোকানের সামনে গিয়ে আহিয়ান থমকে দাঁড়াল। থরে থরে সাজানো রেশমি কাঁচের চুড়ি। "নীলাঞ্জনা, আপনার কোন রঙটা পছন্দ?" আহিয়ান জিজ্ঞেস করল।
নীলাঞ্জনা একটু অবাক হয়ে বলল, "কেন?" "কিনব। আপনার জন্য। এই যে আমার গাড়ি নষ্ট হলো, আপনাদের বাড়িতে আমি অতিথি হলাম—তার একটা স্মারক হিসেবে।"
নীলাঞ্জনা লাজুক হেসে নীল রঙের একগুচ্ছ চুড়ি দেখিয়ে বলল, "নীল আমার প্রিয়।" আহিয়ান চুড়িগুলো কিনল। দোকানদার যখন প্যাকেট করে দিচ্ছিল, আহিয়ান বলল, "প্যাকেট করতে হবে না। ও এখনই পরবে।"
দোকানের একপাশে একটু আড়ালে গিয়ে আহিয়ান নীলাঞ্জনার হাতটা ধরল। নীলাঞ্জনা মৃদু কেঁপে উঠল। আহিয়ান খুব সাবধানে, পরম মমতায় একে একে চুড়িগুলো নীলাঞ্জনার ফর্সা কবজিতে পরিয়ে দিতে লাগল। কাঁচের সাথে কাঁচের ঠোকাঠুকিতে যে টুংটাং শব্দ হচ্ছিল, তা যেন এক নতুন প্রেমের সুর তৈরি করছিল।
"খুব সুন্দর লাগছে," আহিয়ান তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। নীলাঞ্জনা দ্রুত তার হাত সরিয়ে নিল, কিন্তু তার চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়া আভা লুকোতে পারল না।
রাত নামার পর গ্রামটা এক অদ্ভূত শান্ত রূপ ধারণ করে। আকাশে আজ আধফালি চাঁদ উঠেছে। রাতের খাবারের পর মোস্তাফিজ সাহেব ঘুমিয়ে পড়েছেন। আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা বাড়ির পেছনের পুরনো দিঘির পাড়ে গিয়ে বসল।
শ্যাওলা ধরা সান বাঁধানো ঘাট। জোনাকিরা ঝোপের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে। অনেক দূরে কোথাও একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠছে।
"আহিয়ান সাহেব," নীলাঞ্জনা নীরবতা ভেঙে ডাকল। "জি বলুন।" "আপনি যখন কাল চলে যাবেন, এই গ্রামের কথা কি মনে থাকবে? নাকি শহরের ধুলোবালিতে সব মুছে যাবে?"
আহিয়ান পানির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, "কিছু স্মৃতি মোছার জন্য তৈরি হয় না নীলা। আপনি কি জানেন, আমি গত পাঁচ বছরে এক রাতও শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি? কাল রাতে আপনার বাড়ির গেস্টরুমে আমি যে ঘুমটা দিয়েছি, তা আমার কাছে পাঁচ কোটি টাকার চেয়েও দামি। আমি হয়তো চলে যাব, কিন্তু আমার একটা অংশ এখানেই থেকে যাবে।"
নীলাঞ্জনা তার দিকে ফিরে তাকাল। চাঁদের আলোয় আহিয়ানের মুখটা আজ খুব মায়াবী লাগছে। "আমি একটা কথা বলব?" নীলাঞ্জনা প্রশ্ন করল। "বলুন।" "আপনি খুব একা, তাই না?"
আহিয়ান চমকে উঠল। এত সহজে কেউ তার মনের ভেতরটা পড়ে ফেলবে সে ভাবেনি। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "হ্যাঁ। আমার চারপাশ মানুষের ভিড়ে ঠাসা, কিন্তু মনের গহীনে এক বিশাল মরুভূমি।"
নীলাঞ্জনা সাহস করে আহিয়ানের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল। "মরুভূমিতেও তো ওয়েসিস থাকে। আজ থেকে নিজেকে একা ভাববেন না। এই মফস্বলের এক কোণে অন্তত একজন মানুষ থাকবে, যে প্রতিদিন ভোরে আপনার কথা ভাববে।"
আহিয়ান এবার নীলাঞ্জনার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। তাদের মাঝে আর কোনো শব্দ নেই। শুধু হৃদস্পন্দনের তাল লয় এক হয়ে মিলে যাচ্ছে। কুয়াশার চাদর ধীরে ধীরে দিঘির পানিকে ঢেকে দিচ্ছে, আর সেই কুয়াশার আড়ালে তৈরি হচ্ছে এক অজেয় বাঁধন।
ভোরবেলা বিদায়ের সময় চলে এল। রফিক ভাই গাড়ি নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। আহিয়ান তার ব্যাগ গুছিয়ে নিচে নামল। মোস্তাফিজ সাহেব তাকে আশীর্বাদ করলেন।
নীলাঞ্জনা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ দুটো আজ কিছুটা ফোলা, হয়তো সারা রাত ঘুমায়নি। আহিয়ান কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নীলাঞ্জনা একটা ছোট খাম এগিয়ে দিল। "এটা কী?" "খুলে দেখবেন না এখন। ঢাকা গিয়ে দেখবেন।"
আহিয়ান গাড়িতে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করলে সে লুকিং গ্লাসে দেখল নীলাঞ্জনা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতের নীল চুড়িগুলো রোদে চিকচিক করছে।
ঢাকা ফেরার পথে আহিয়ান খামটা খুলল। ভেতরে একটা শুকনো শিউলি ফুল আর ছোট একটা চিরকুট। তাতে লেখা: “অপেক্ষা শব্দটা খুব ছোট, কিন্তু এর ভার অনেক বেশি। আমি জানি আপনি আবার আসবেন।”
আহিয়ান চিরকুটটা বুকের সাথে চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে জানত, এই বিদায় চিরস্থায়ী নয়। এটি একটি দীর্ঘ মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায় মাত্র।
ঢাকা শহরটা আহিয়ানের কাছে চিরকালই যান্ত্রিক মনে হতো, কিন্তু এবারের ফেরাটা একেবারেই ভিন্ন। এয়ারকন্ডিশনড রুমের ঠান্ডা বাতাস এখন তার কাছে অসহ্য লাগছে। সে বার বার জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের ধূসর আকাশ দেখার চেষ্টা করছে, কিন্তু সেই মফস্বলের স্নিগ্ধ নীল আকাশটা কোথাও নেই।
অফিসের টেবিলে বড় বড় সব প্রজেক্টের ফাইল। ক্লায়েন্টরা মিটিংয়ের জন্য বসে আছে। কিন্তু আহিয়ানের কানের ভেতর এখনো নীল চুড়ির টুংটাং শব্দ আর বৃষ্টির রিমঝিম সুর বাজছে।
সে তার ল্যাপটপ খুলল। স্ক্রিনসেভারে সেই গ্রামের দিঘির পাড়ের একটা অস্পষ্ট ছবি। সে পকেট থেকে নীলাঞ্জনার দেওয়া সেই শুকনো শিউলি ফুলটা বের করল। ফুলের ঘ্রাণ চলে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু তার স্পর্শ যেন এখনো সজীব।
"স্যার, আপনার সাথে মিস্টার জামান দেখা করতে এসেছেন," সেক্রেটারি রুম্পার কথায় আহিয়ান বর্তমানে ফিরে এল। "ভেতরে আসতে বলো।"
আহিয়ান কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু অবচেতন মন পড়ে রইল সেই বাঁশবাগানে, যেখানে নীলাঞ্জনার হাতটা সে প্রথম ছুঁয়েছিল। জীবনের প্রথমবার আহিয়ান অনুভব করছে যে, অভাব বলতে শুধু টাকার অভাব বোঝায় না; অভাব মানে হৃদয়ের এক কোণে কাউকে না পাওয়ার হাহাকার।
রাত তখন দুইটা। ঢাকা শহরটা একটু ঝিমিয়ে পড়েছে। আহিয়ান বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে আছে। হাতে ফোন। সে দশবার ফোনটা হাতে নিয়েছে আর রেখেছে। এই সময়ে কল করা কি ঠিক হবে? নীলাঞ্জনা কি ঘুমিয়ে পড়েছে?
হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল: 'নীলাঞ্জনা'। আহিয়ান এক সেকেন্ডও দেরি করল না রিসিভ করতে।
"হ্যালো?" আহিয়ানের কণ্ঠস্বর কিছুটা রুদ্ধ। ওপাশ থেকে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর খুব ক্ষীণ কণ্ঠে নীলাঞ্জনা বলল, "আপনি কি ঘুমিয়েছেন?" "না। আপনি কেন ঘুমাননি?" "এখানে আজ খুব জোছনা উঠেছে আহিয়ান সাহেব। ঘাটের সেই পাথরটা চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে। আপনার কথা খুব মনে পড়ছিল।"
আহিয়ান চোখ বন্ধ করল। সে কল্পনা করতে পারছে নীলাঞ্জনা তার জানালার ধারে বসে আছে, চুলে হয়তো সেই শিউলি ফুলের ঘ্রাণ লেগে আছে।
"নীলাঞ্জনা, ঢাকা শহরটা খুব অন্ধকার," আহিয়ান ফিসফিস করে বলল। "কেন? সেখানে তো কত আলো!" "সেটা কৃত্রিম আলো। আমার মনের ভেতরে যে অন্ধকার, তা দূর করার মতো আলো এখানে নেই।"
নীলাঞ্জনা ওপাশ থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, এই দূরত্বের কষ্টটা দুজনেরই সমান। সে বলল, "একটা কথা শোনাবেন? ঢাকা ফিরে আমাকে নিয়ে আপনার কি একবারও মনে হয়েছে যে সবটা স্বপ্ন ছিল?"
আহিয়ান একটু হাসল। "স্বপ্ন হলে তো ঘুম ভাঙলে সব শেষ হয়ে যেত। কিন্তু আমার তো ঘুমই আসছে না নীলাঞ্জনা। প্রতিটা মুহূর্তে আপনার সেই নীল চুড়ির শব্দ আমার হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের সাথে মিশে আছে।"
পরদিন সকালে আহিয়ানের মা তার রুমে ঢুকলেন। হাতে একটা বিয়ের বায়োডাটা। "আহি, মেয়েটা খুব ভালো। নাম শায়লা, লন্ডনে পড়াশোনা করেছে। তোর বাবার খুব পছন্দ।"
আহিয়ান কোনো কথা না বলে নিজের শার্টের বোতাম আটকাতে লাগল। "মা, আমি এখন এসব নিয়ে ভাবছি না।" "ভাববি কবে? তোর বয়স তো আর কম হলো না। আমরা কি মরে যাওয়ার আগে তোর সংসার দেখে যেতে পারব না?"
মায়ের এই আবেগঘন কথাগুলো আগে আহিয়ানকে দুর্বল করত, কিন্তু আজ তার ভেতরে এক ধরণের জেদ কাজ করছে। সে জানে, তার হৃদয়ে একজনের আসন পাতা হয়ে গেছে, সেখানে শায়লা বা অন্য কারোর ঠাঁই নেই।
এদিকে মফস্বলে নীলাঞ্জনার জীবনেও এক কালো মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে। গ্রামে রটে গেছে যে, এক বিদেশি বড় সাহেবের সাথে নীলাঞ্জনার খুব দহরম-মহরম চলছে। গ্রামের মোড়ল ইদ্রিস মিঞা, যে কিনা নীলাঞ্জনাকে নিজের ছেলের জন্য চেয়েছিল, সে আড়ালে আড়ালে বিষ ছড়াতে শুরু করেছে।
নীলাঞ্জনা বুঝতে পারছে না সে কী করবে। তার বাবা একজন সহজ-সরল মানুষ, তিনি এসব অপবাদ সহ্য করতে পারবেন না। সে একা একা নদীর ঘাটে গিয়ে কাঁদে। আহিয়ানকে সে এসব বলতে চায় না, কারণ সে চায় না আহিয়ান কোনো টেনশন করুক।
নীলাঞ্জনা তার ডায়েরিটা আবার বের করল। সেই নীল মলাটের ডায়েরি যা আহিয়ান একদিন পড়েছিল। সে লিখতে শুরু করল:
“প্রিয় আহিয়ান সাহেব, মানুষ কেন দূরত্ব তৈরি করে জানেন? যাতে সে বুঝতে পারে যে সে কাউকে কতটা ভালোবাসে। এই কয়েকদিন আপনার সাথে কথা বলে মনে হচ্ছে, আমি আপনাকে চিনেছি কয়েক জন্ম ধরে। কিন্তু সমাজ আর মানুষের চোখ বড় বিষাক্ত। আমি ভয় পাচ্ছি, আমাদের এই কাঁচের মতো স্বচ্ছ সম্পর্কটা যদি কেউ পাথর ছুড়ে ভেঙে দেয়?”
সে ডায়েরিটা বন্ধ করে বুকের সাথে চেপে ধরল। জানালার ওপাশে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। ফুলগুলো আজ রক্তবর্ণ হয়ে ফুটে আছে। নীলাঞ্জনার কেন জানি মনে হলো, সামনে বড় কোনো ঝড় আসছে।
ঢাকার অভিজাত পাড়া গুলশানের ড্রয়িংরুমে এক থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। আহিয়ানের বাবা, চৌধুরী আমজাদ সাহেব খবরের কাগজ পড়ছেন, তবে তার তীক্ষ্ণ নজর ছেলের দিকে। আহিয়ান আজ অফিস থেকে একটু আগেই ফিরেছে। তার চোখেমুখে এক ধরণের স্থির সংকল্প।
"আহিয়ান, তোমার মা বলছিলেন তুমি বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে চাও না?" আমজাদ সাহেবের কণ্ঠ গম্ভীর।
আহিয়ান সোফায় বসে শান্ত স্বরে বলল, "বাবা, আমি আমার জীবনের সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিয়েছি। আমি অন্য কাউকে পছন্দ করি।"
পুরো ঘরে যেন এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেল। চা ঢালতে গিয়ে আহিয়ানের মা হাত থামিয়ে দিলেন। "কে সে? কোথাকার মেয়ে? তার পারিবারিক পরিচয় কী?"—মায়ের প্রশ্নে হাজারটা উৎকণ্ঠা।
আহিয়ান জানালার ওপারে শহরের কৃত্রিম আলোর দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল, "সে মফস্বলের এক অতি সাধারণ মেয়ে। কোনো করপোরেট ডিগ্রি নেই তার, কিন্তু তার হৃদয়ের বিশালতা এই পুরো শহরের চেয়েও বড়। আমি তাকেই বিয়ে করতে চাই।"
আমজাদ সাহেব চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। "আহিয়ান, আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। আমাদের স্ট্যাটাস, আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক—সব কি তুমি একটা অখ্যাত গ্রামের মেয়ের জন্য জলাঞ্জলি দেবে?"
আহিয়ান উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এক অদ্ভূত দীপ্তি। "আমি সারা জীবন আপনার স্ট্যাটাসের জন্য নিজের ইচ্ছাগুলোকে বিসর্জন দিয়েছি বাবা। কিন্তু নীলাঞ্জনা কোনো জেদ নয়, সে আমার বেঁচে থাকার রসদ। আপনাদের আশীর্বাদ থাকলে আমি খুশি হবো, আর না থাকলেও আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।"
সে নিজের রুমে চলে এল। তার হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। আজ সে প্রথমবার তার পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়াল, আর এই শক্তির উৎস সেই দূর মফস্বলের এক জোড়া মায়াবী চোখ।
গ্রামের আকাশটা আজ গুমোট। বিকেলের দিকে ইদ্রিস মিঞা তার দলবল নিয়ে নীলাঞ্জনার বাবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। গ্রামের সালিশি ঢঙে সে বলল, "মোস্তাফিজ সাহেব, আপনার মেয়ের চরিত্র নিয়ে গ্রামে কানাকানি হচ্ছে। ওই শহরের বাবুটার সাথে রাতে একা একা ঘাটে বসে থাকা—এসব তো আমাদের গ্রামের রেওয়াজ না। হয় আপনার মেয়েকে আমার ছেলের সাথে বিয়ে দেন, নাহলে আপনাদের এই গ্রাম ছাড়তে হবে।"
মোস্তাফিজ সাহেব অপমানে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তার একমাত্র আদরের মেয়েকে নিয়ে এমন কুৎসিত কথা তিনি সইতে পারলেন না। সন্ধ্যার পর থেকেই তার বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে।
নীলাঞ্জনা দিশেহারা। ঘরে ওষুধ নেই, বাইরে ঘোর অন্ধকার। সে কাঁপা হাতে আহিয়ানকে ফোন দিল।
"হ্যালো, আহিয়ান সাহেব..." নীলাঞ্জনার কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে পড়ল। "নীলা? কী হয়েছে? তুমি কাঁদছ কেন?" আহিয়ানের কণ্ঠে তীব্র উদ্বেগ। "বাবা... বাবার শরীর খুব খারাপ। ওরা আমাদের অপমান করেছে আহিয়ান সাহেব। আমি জানি না কী করব... আমি খুব ভয় পাচ্ছি।"
আহিয়ান ফোনের ওপাশে নীলাঞ্জনার হাহাকার শুনে পাগলপ্রায় হয়ে গেল। সে ঘড়ির দিকে তাকাল—রাত ১১টা। "নীলা, তুমি একদম ভয় পেয়ো না। আমি আসছি। আমি এখনই রওয়ানা হচ্ছি। তুমি বাবার পাশে থাকো, আমি দুই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছাব।"
আহিয়ান তার গাড়িটা নিয়ে ঝড়ের গতিতে হাইওয়ে ধরে ছুটছে। রফিক ভাইকে আজ সে ছুটি দিয়ে দিয়েছে, নিজেই ড্রাইভ করছে। তার চোখে শুধু নীলাঞ্জনার সেই কান্নাভেজা মুখটা ভাসছে। তার মনে হচ্ছিল, যদি নীলাঞ্জনার কিছু হয়ে যায়, তবে এই পৃথিবীর সমস্ত আলো তার কাছে অর্থহীন হয়ে যাবে।
রাত যখন আড়াইটা, আহিয়ান সেই মফস্বল শহরে পৌঁছাল। চারিদিক নিঝুম। শুধু কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। সে গাড়িটা বাড়ির গেটের সামনে থামিয়েই ভেতরে দৌড়ে গেল।
নীলাঞ্জনা বারান্দায় বসে ছিল মাথা নিচু করে। গাড়ির আলো দেখে সে ছুটে এল। আহিয়ান গাড়ি থেকে নামতেই নীলাঞ্জনা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তার বুকে আছড়ে পড়ল। এতদিনের জমে থাকা সব ভয়, অপমান আর কান্না যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল।
আহিয়ান তাকে নিজের বাহুবন্দি করে নিল। এক হাত দিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে খুব নরম গলায় বলল, "আমি এসেছি তো নীলা। আর কোনো ভয় নেই। কেউ তোমার দিকে আঙুল তোলার সাহস পাবে না।"
নীলাঞ্জনা আহিয়ানের শার্টটা খামচে ধরে কাঁদতে লাগল। "ওরা খুব খারাপ আহিয়ান সাহেব। ওরা আমাকে কলঙ্কিনী বলছে।"
আহিয়ান নীলাঞ্জনার মুখটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। অন্ধকারেও তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। "কলঙ্ক চাঁদেরও থাকে নীলা, তাতে চাঁদের সৌন্দর্য কমে না। আমি তোমাকে এই নরক থেকে নিয়ে যাব। তুমি আমার হবে, সম্মানের সাথে, অধিকারের সাথে।"
সেদিন রাতে আহিয়ান মোস্তাফিজ সাহেবকে শহরের হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করল। সারা রাত সে হাসপাতালের করিডোরে নীলাঞ্জনার হাত ধরে বসে রইল। সেই স্পর্শে ছিল এক অলিখিত অঙ্গীকার—যুগ যুগ ধরে পাশে থাকার।
ভোরের দিকে মোস্তাফিজ সাহেবের অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলো। তাকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। হাসপাতালের জানালার বাইরে তখন ভোরের প্রথম সোনালি আভা ফুটছে।
নীলাঞ্জনা একটা সোফায় ঝিমোচ্ছিল। আহিয়ান তার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে এল। "নীলা, একটু কফি খেয়ে নাও। সারা রাত তো কিছুই মুখে দাওনি।"
নীলাঞ্জনা কফির কাপটা হাতে নিয়ে আহিয়ানের দিকে তাকাল। তার চোখের নিচে কালচে ছোপ পড়েছে, কিন্তু চেহারায় এক অদ্ভূত নির্ভরতা। "আপনি আমার জন্য কেন এত করছেন?" নীলাঞ্জনা নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
আহিয়ান তার খুব কাছে গিয়ে বসল। এবার সে নীলাঞ্জনার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। "আমি স্থপতি নীলা। আমি জানি ভাঙা বাড়ি কীভাবে গড়তে হয়। কিন্তু আমার নিজের ভাঙা মনটা যে কেউ কোনোদিন গড়তে পারবে, সেটা আমি ভাবিনি। তুমি আমার সেই মরুভূমিতে বৃষ্টি হয়ে এসেছ। তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।"
নীলাঞ্জনা এবার আর চোখ সরাল না। সে ধীর গলায় বলল, "আমিও আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। এই কয়েক দিনে আপনি আমার নিঃশ্বাসের চেয়েও জরুরি হয়ে গেছেন।"
হাসপাতালের সেই নিরিবিলি পরিবেশে, দুই হৃদয়ের মিলন ঘটল এক পবিত্র আশ্বাসের মাধ্যমে।
৫ লক্ষ শব্দের এই বিশাল মহাকাব্যিক উপন্যাসের মূল বাঁক এখন শুরু হচ্ছে। আবেগ, অধিকার আর সামাজিক সংঘাতের এক তীব্র মিশ্রণ ফুটে উঠবে এই পর্বে। প্রতিটি অনুভূতিকে আমরা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করব।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর আহিয়ান এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে জানত, মোস্তাফিজ সাহেবকে এই গ্রামে একা রেখে যাওয়া মানে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। ইদ্রিস মিঞার লোকেরা যেকোনো সময় আবার হামলা করতে পারে।
আহিয়ান মোস্তাফিজ সাহেবের হাত ধরে বলল, "আঙ্কেল, আমি আজ আপনাদের সাথে নিয়ে যেতে এসেছি। আপনি আর নীলাঞ্জনা আমার ঢাকার ফ্ল্যাটে থাকবেন। আমি আপনাদের কোনো অসম্মান হতে দেব না।"
মোস্তাফিজ সাহেব প্রথমে রাজি হননি। আত্মসম্মানবোধ তাকে বাধা দিচ্ছিল। কিন্তু নীলাঞ্জনার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি মাথা নাড়লেন। নীলাঞ্জনা তার ছোট একটা ব্যাগে সামান্য কিছু কাপড় আর সেই নীল ডায়েরিটা গুছিয়ে নিল। যাওয়ার সময় সে একবার নিজের বসতভিটার দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে জল, কিন্তু মনে এক অদ্ভূত শক্তি—কারণ তার হাতটা এখন আহিয়ানের শক্ত মুঠোয়।
ঢাকার সেই আলিশান অ্যাপার্টমেন্টের সামনে যখন আহিয়ানের গাড়িটা থামল, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আহিয়ানের বাবা-মা আগে থেকেই জানতেন আহিয়ান ফিরছে, কিন্তু সে যে নীলাঞ্জনাদের সাথে নিয়ে আসবে, তা তারা কল্পনাও করেননি।
লিফটের দরজা খুলতেই আহিয়ানের মা, রেহানা বেগম সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টি নীলাঞ্জনার সুতি শাড়ি আর সাধারণ সাজের ওপর দিয়ে একবার ঘুরে এল। অবজ্ঞা আর আভিজাত্যের লড়াইটা সেখানেই শুরু হয়ে গেল।
"এরা কারা আহিয়ান?" আমজাদ সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ড্রয়িংরুমের দেয়াল ভেদ করে এল।
আহিয়ান নীলাঞ্জনার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। সে সবার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে বলল, "বাবা, মা—পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি মোস্তাফিজ সাহেব, আর এটি নীলাঞ্জনা। আজ থেকে ওরা আমার মেহমান নয়, আমার দায়িত্ব। আর নীলাঞ্জনা হবে এই বাড়ির বড় বউ। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামীকালই আমরা আইনিভাবে বিয়েটা সম্পন্ন করব।"
রেহানা বেগম আর্তনাদ করে উঠলেন, "অসম্ভব! এই রাস্তার মেয়ে হবে আমার বাড়ির বউ? লোকে কী বলবে?"
আহিয়ান শান্ত কিন্তু ধীর গলায় বলল, "লোকেরা কী বলবে সেটা ভেবে আমি ৩২ বছর কাটিয়েছি মা। এবার আমি ভাবব আমার হৃদয় কী বলছে। নীলাঞ্জনা রাস্তা থেকে আসেনি, সে আমার অন্ধকার জীবনে আলো নিয়ে এসেছে।"
সে নীলাঞ্জনাকে নিয়ে গেস্ট রুমের দিকে এগিয়ে গেল। নীলাঞ্জনা পুরোটা সময় নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল সে কোনো যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার একমাত্র ঢাল হলো আহিয়ানের ভালোবাসা।
সেদিন রাতে বাড়ির পরিবেশ ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। ডাইনিং টেবিলে কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। নীলাঞ্জনা আর তার বাবা নিজেদের ঘরেই খাবার খেলেন। রাত একটায় যখন পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, আহিয়ান পা টিপে টিপে গেস্ট রুমের দরজায় নক করল।
নীলাঞ্জনা দরজা খুলল। তার চোখে জল চিকচিক করছে। আহিয়ান ভেতরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে লাগিয়ে দিল। "কাঁদছ কেন নীলা?"
নীলাঞ্জনা ফুঁপিয়ে উঠল। "আমি জানতাম এমনটাই হবে। আপনার মা আমাকে ঘৃণা করেন। আমি কি পারব এই বিশাল বাড়িতে নিজেকে মানিয়ে নিতে? তার চেয়ে আমাদের গ্রামে ফিরে যেতে দিন আহিয়ান সাহেব।"
আহিয়ান নীলাঞ্জনার কাঁধে হাত রাখল। তারপর খুব ধীরে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে তার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। সেই স্পর্শে ছিল এক গভীর নির্ভরতা। "শোনো নীলা, সমুদ্রের ঢেউ যখন পাড়ে আছড়ে পড়ে, তখন বালু সরে যায় ঠিকই, কিন্তু পাথর নড়ে না। আমি সেই পাথর। আমার মা-বাবা একদিন তোমাকে বুঝবেন। শুধু আমার ওপর বিশ্বাস রাখো।"
নীলাঞ্জনা আহিয়ানের বুকের ওপর মাথা রাখল। সে শুনতে পাচ্ছিল আহিয়ানের হৃদস্পন্দনের শব্দ। সে ফিসফিস করে বলল, "আমি আপনাকে হারাতে ভয় পাই। আমার মনে হচ্ছে এই শহরটা আমাদের আলাদা করে দেবে।"
আহিয়ান তার থুতনি ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরল। অন্ধকারে তাদের নিঃশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছিল। আহিয়ান খুব নিচু স্বরে বলল, "আলাদা করতে হলে আগে আমাদের এক হতে হবে নীলা। আর কালকের পর থেকে এই পৃথিবীর কোনো শক্তি তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।"
পরদিন সকালে কোনো ঢাকঢোল ছাড়াই কাজী অফিসে গিয়ে তাদের বিয়ে হলো। নীলাঞ্জনার পরনে ছিল আহিয়ানের মায়ের একটা পুরনো লাল বেনারসি, যা আহিয়ান আলমারি থেকে লুকিয়ে বের করে এনেছিল। নীলাঞ্জনাকে আজ অপূর্ব লাগছে। তার সিঁথিতে যখন আহিয়ান সিঁদুর পরিয়ে দিল (নীলাঞ্জনার ইচ্ছানুযায়ী একটি প্রতীকী সংস্কার হিসেবে) অথবা যখন কাবিননামায় সই করল, তখন দুজনের চোখেই জল ছিল।
বাসায় ফেরার পর রেহানা বেগম বরণ করতে আসেননি। কিন্তু আহিয়ান দমে গেল না। সে নীলাঞ্জনার হাত ধরে বাড়ির ভেতর ঢুকল।
সেদিন রাতে আহিয়ানের বেডরুমটা সাজানো হয়েছিল বেলী আর রজনীগন্ধা দিয়ে। আহিয়ান যখন ঘরে ঢুকল, সে দেখল নীলাঞ্জনা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
আহিয়ান পেছন থেকে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট নীলাঞ্জনার কানের কাছে নিয়ে বলল, "আজ থেকে তুমি শুধু নীলাঞ্জনা নও, আজ থেকে তুমি আমার স্ত্রী, আমার অর্ধাঙ্গিনী।"
নীলাঞ্জনা ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন ভালোবাসার নেশা। সে আহিয়ানের গলার দুপাশে হাত রেখে জড়িয়ে ধরল। "আমি কোনোদিন ভাবিনি আমার মতো একটা সাধারণ মেয়ের জীবনে এমন একটা রূপকথা আসবে।"
আহিয়ান তাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে তখন টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে—ঠিক সেই দিনটার মতো, যেদিন তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। আজ আর কোনো আড়াল নেই, কোনো দূরত্ব নেই। শুধু আছে দুজন মানুষের একে অপরকে সম্পূর্ণভাবে পাওয়ার ব্যাকুলতা।
বিয়ের পর প্রথম সকাল। আহিয়ানের বিশালাকার বেডরুমে সূর্যের আলো এসে পড়েছে ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে। আহিয়ান যখন চোখ মেলল, দেখল নীলাঞ্জনা পাশে নেই। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। একটা অজানা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করতে চাইল—নীলাঞ্জনা চলে যায়নি তো?
বালিশের পাশে একটা ছোট চিরকুট রাখা। তাতে কাঁচা হাতে লেখা: "আমি রান্নাঘরে আছি। ঘাবড়াবেন না।"
আহিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল। সে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত দৃশ্য। রেহানা বেগম গম্ভীর মুখে সোফায় বসে আছেন, আর নীলাঞ্জনা খুব সাবধানে ট্রে হাতে সবার জন্য চা নিয়ে আসছে। তার পরনে একটা ধানি রঙের সুতি শাড়ি, মাথায় ঘোমটাটা একটু টানা।
"মা, চা নিন," নীলাঞ্জনা খুব নিচু স্বরে বলল। রেহানা বেগম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভ্রু কুঁচকালেন। "চিনি এত বেশি কেন? আহিয়ান কি তোমাকে বলেনি আমি সুগার ফ্রি খাই? এসব গেঁয়ো স্বভাব এখানে চলবে না নীলাঞ্জনা।"
নীলাঞ্জনা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ ভিজে এল। ঠিক তখনই আহিয়ান পেছন থেকে এসে তার কাঁধে হাত রাখল। "মা, ও তো প্রথমদিন রান্নাঘরে ঢুকেছে। ভুল হতেই পারে। আর চিনি বেশি হলে তেতো জীবনটা একটু মিষ্টি হয়, খারাপ কী?"
রেহানা বেগম কটমট করে ছেলের দিকে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। আহিয়ান নীলাঞ্জনাকে চোখের ইশারায় ঘরে যেতে বলল।
সপ্তাহখানেক পর আহিয়ানের অফিসে একটা বড় সাকসেস পার্টি। আহিয়ান চাইল নীলাঞ্জনাকেও সাথে নিয়ে যেতে। "আমি ওখানে গিয়ে কী করব? আমি তো ওদের মতো ইংরেজি বলতে পারি না, ওদের ফ্যাশন বুঝি না," নীলাঞ্জনা শঙ্কা প্রকাশ করল।
আহিয়ান তার গাল আলতো করে টিপে দিয়ে বলল, "তোমাকে ওদের মতো হতে হবে না নীলা। তুমি আমার নীলাঞ্জনা হয়েই থেকো। তোমার এই সাধারণ রূপটাই আমার কাছে সবচেয়ে দামী।"
সেদিন সন্ধ্যায় নীলাঞ্জনা পরল একটা জামদানি শাড়ি। কোনো মেকআপ নেই, শুধু চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি আভা। পার্টিতে ঢোকার পর থেকেই সবার দৃষ্টি তাদের দিকে। আহিয়ানের বন্ধুরা আড়ালে হাসাহাসি করছিল—"আহিয়ান শেষ পর্যন্ত একটা গ্রাম্য মেয়েকে বিয়ে করল?"
ঠিক তখনই আসরে প্রবেশ করল শায়লা। পরনে ওয়েস্টার্ন ড্রেস, উগ্র সুবাস। সে ছিল আহিয়ানের বাবার পছন্দের পাত্রী। শায়লা সরাসরি আহিয়ানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। "অভিনন্দন আহিয়ান! তোমার চয়েস দেখে সত্যি অবাক হলাম। তা, তোমার এই অর্ধাঙ্গিনী কি কথা বলতে পারে, নাকি শুধু মাথা নিচু করে থাকাই ওর কাজ?" শায়লার কথায় একটা বিষাক্ত শ্লেষ ছিল।
আহিয়ান কিছু বলার আগেই নীলাঞ্জনা মাথা তুলে চাইল। সে শান্ত গলায় পরিষ্কার বাংলায় বলল, "কথা বলতে পারাটা বড় কথা নয় শায়লা আপু, কখন চুপ থাকতে হয় সেটা জানাই হলো আসল শিক্ষা। আমার স্বামী আমাকে যেমন গ্রহণ করেছেন, তাতেই আমি পূর্ণ।"
আহিয়ানের বুকটা গর্বে ভরে উঠল। সে শায়লার দিকে তাকিয়ে বলল, "শুনলে তো? আমার নীলাঞ্জনা হীরের টুকরো। তাকে বোঝার মতো জহুরি হওয়া সবার ভাগ্যে থাকে না।"
পার্টি থেকে ফেরার পর আহিয়ানের মেজাজ বেশ চনমনে ছিল, কিন্তু নীলাঞ্জনা কেমন যেন গুম মেরে রইল। রুমে ঢোকার পর আহিয়ান তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতেই সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।
"কী হয়েছে নীলা?" "আপনি কেন আমাকে ওই সমাজে নিয়ে গেলেন? আমি দেখতে পাচ্ছিলাম সবাই আমাকে করুণা করছিল। আমি আপনার সম্মানের উপযুক্ত নই আহিয়ান সাহেব।"
আহিয়ান রেগে গেল। "এই সব ফালতু কথা কে বলেছে তোমাকে? আমি তোমাকে ভালোবাসি, এটাই কি যথেষ্ট নয়?" "না, যথেষ্ট নয়। ভালোবাসা পেটে ভাত দেয় না, আর সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করে না। আপনার মা প্রতিদিন আমাকে কথা শোনান, আর আপনার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে হাসে। আমি আর পারছি না।"
আহিয়ান নীলাঞ্জনার হাতটা জোরে চেপে ধরল। তার চোখে তখন রাগের বদলে এক তীব্র তৃষ্ণা। "তুমি পারবে নীলা। কারণ আমি তোমাকে ছাড়ব না। তুমি আমার অহংকার।"
সে নীলাঞ্জনাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার ঠোঁট নীলাঞ্জনার গলার ভাঁজে বিচরণ করতে লাগল। রাগের মুহূর্তটা দ্রুত কামনায় মোড় নিল। নীলাঞ্জনা প্রথমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও আহিয়ানের তীব্র ভালোবাসার কাছে সে হার মানল। সেই রাতে তাদের মিলন ছিল অনেক বেশি আদিম এবং সত্য। বৃষ্টির শব্দ ছাড়াই সেদিন এক অন্যরকম ঝড় বয়ে গেল তাদের চার দেয়ালের মাঝে।
পরদিন সকালে আহিয়ান অফিসে যাওয়ার পর শায়লা তাদের বাড়িতে এল। সে রেহানা বেগমের খুব ঘনিষ্ঠ। ড্রয়িংরুমে বসে তারা দীর্ঘক্ষণ ফিসফাস করল।
নীলাঞ্জনা যখন তাদের জন্য নাস্তা নিয়ে এল, শায়লা একটা খাম বের করে টেবিলের ওপর রাখল। "নীলাঞ্জনা, দেখ তো এই ছেলেটাকে চিনতে পারো কি না?"
নীলাঞ্জনা ছবিটা হাতে নিয়ে পাথর হয়ে গেল। ছবিতে তার সাথে তার সেই প্রাক্তন বাগদত্তা, যার সাথে তার বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল। ছবিটা এমনভাবে তোলা হয়েছে যেন মনে হচ্ছে তারা খুব ঘনিষ্ঠ।
"এই ছবি আহিয়ান দেখলে কী ভাববে বলো তো?" শায়লা বাঁকা হেসে বলল। "ওর মতো ডিগনিফাইড একটা লোক কি তার স্ত্রীর এমন অতীত মেনে নেবে?"
নীলাঞ্জনার হাত কাঁপতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, তার সাজানো সংসারটা ভাঙার জন্য জাল বিছানো শুরু হয়ে গেছে।
৫ লক্ষ শব্দের এই বিশাল মহাকাব্যের ক্যানভাসে এবার ঘনিয়ে আসছে কালবৈশাখী ঝড়। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচলে একটি পবিত্র সম্পর্ক যখন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, তখন অনুভূতির গভীরতা আরও তীব্রভাবে ফুটে ওঠে। চলুন, আমরা প্রবেশ করি সেই দহনকালে।
আহিয়ান সেদিন অফিস থেকে ফিরেছিল খুব ক্লান্ত হয়ে। হাতে একটা প্রজেক্টের ফাইল, কিন্তু মাথার ভেতরে ঘুরছিল নীলাঞ্জনার জন্য কেনা একটা হীরের লকেট। সে চেয়েছিল আজ সব মান-অভিমান মিটিয়ে ফেলবে। কিন্তু ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই সে দেখল শায়লা বসে আছে, আর তার মায়ের মুখে এক অদ্ভুত বিজয়ের হাসি।
"আহিয়ান, তুই আসলি? এই দেখ তোর আদরের বউয়ের আসল রূপ," রেহানা বেগম ছবিগুলো টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিলেন।
আহিয়ান ধীরস্থিরভাবে ছবিগুলো হাতে নিল। ছবিতে নীলাঞ্জনা আর একটি ছেলে নদীর ঘাটে খুব কাছাকাছি বসে আছে। ছেলেটির হাত নীলাঞ্জনার কাঁধে। আহিয়ানের চোখের সামনে পৃথিবীটা যেন একবার দুলে উঠল। তার মনে পড়ে গেল সেই বৃষ্টির রাত, সেই নীল ডায়েরি। নীলাঞ্জনা কি তবে তাকে সব সত্যি বলেনি?
ঠিক তখনই নীলাঞ্জনা ঘরে ঢুকল। আহিয়ানের হাতের ছবিগুলো দেখেই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "আহিয়ান সাহেব, আমি ব্যাখ্যা করতে পারি..." নীলাঞ্জনার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।
আহিয়ান ছবিগুলো তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে গর্জে উঠল, "ব্যাখ্যা? এই ছবির আর কী ব্যাখ্যা হতে পারে নীলাঞ্জনা? আমি তোমাকে আমার সবটুকু দিয়ে বিশ্বাস করেছিলাম। অথচ তুমি তোমার অতীতের এই নোংরা অধ্যায়টা আমার কাছ থেকে লুকিয়েছ?"
"নোংরা নয় আহিয়ান সাহেব! ওটা একটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল, আমি ওকে কোনোদিন ভালোবাসিনি," নীলাঞ্জনা কাঁদতে কাঁদতে বলল।
কিন্তু আহিয়ান তখন রাগে অন্ধ। সে তার হাতে থাকা হীরের লকেটের বক্সটা মেঝেতে আছড়ে ফেলল। কাঁচের বক্সটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল—ঠিক যেমন তাদের বিশ্বাসটা। আহিয়ান আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সেদিন রাতেও বৃষ্টি নামল। তবে এই বৃষ্টিতে কোনো কাব্য ছিল না, ছিল শুধু হাহাকার। আহিয়ান তার গাড়ি নিয়ে শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরল। সে বুঝতে পারছিল না কেন তার এত কষ্ট হচ্ছে। প্রেম কি তবে এতটাই ঠুনকো যে একটা ছবিতেই সব শেষ হয়ে যায়?
সে একটা বারে গিয়ে বসল। জীবনে কোনোদিন মদ স্পর্শ না করা আহিয়ান আজ গ্লাসের পর গ্লাস পান করে যাচ্ছিল। তার মস্তিষ্কে শুধু নীলাঞ্জনার সেই মায়াবী হাসি আর ছবির সেই ছেলেটির হাতের স্পর্শ বারবার ফিরে আসছিল।
এদিকে বাড়িতে নীলাঞ্জনা দরজায় মাথা কুটে মরছিল। তার বাবা মোস্তাফিজ সাহেব অসুস্থ শরীরে মেয়ের এই অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। "মা রে, আমি কি তোকে ভুল মানুষের হাতে সঁপে দিলাম?"
নীলাঞ্জনা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু ভাবছিল, আহিয়ান কি একবারও তার চোখের দিকে তাকিয়ে সত্যিটা বোঝার চেষ্টা করবে না? সে কি এতটাই পর হয়ে গেল?
ভোরবেলা আহিয়ান যখন ফিরল, তার সারা শরীর থেকে মদের কটু গন্ধ আসছিল। চুলগুলো এলোমেলো, চোখ দুটো রক্তবর্ণ। নীলাঞ্জনা ছুটে গেল তার কাছে। "আপনি ড্রিঙ্ক করেছেন? আহিয়ান সাহেব, আপনি নিজেকে কেন কষ্ট দিচ্ছেন?"
আহিয়ান তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। "আমাকে ছোঁবে না নীলাঞ্জনা। তোমার এই স্পর্শ এখন আমার কাছে বিষ মনে হয়। আমি তোমাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দিতাম, কিন্তু শুধু তোমার বাবার অসুস্থতার কথা ভেবে দিচ্ছি না। আজ থেকে তুমি এই ঘরে থাকবে, কিন্তু আমাদের মাঝে আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তুমি আমার কাছে এখন একজন অচেনা মেহমান মাত্র।"
নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একটা মানুষ রাতারাতি কতটা বদলে যেতে পারে! সেই যে মানুষটা তার কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল 'তুমি আমার আশ্রয়', সে আজ তাকেই 'অচেনা' বলছে।
পরের কয়েক সপ্তাহ তাদের জীবনটা একটা নরকে পরিণত হলো। একই ছাদে থাকে, অথচ কারো সাথে কারো কথা হয় না। টেবিলে খাবার সাজিয়ে নীলাঞ্জনা বসে থাকে, আহিয়ান বাইরে খেয়ে ফেরে। গভীর রাতে আহিয়ান যখন ফিরে আসে, নীলাঞ্জনা ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে। সে অনুভব করে আহিয়ান তার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দায় চলে যায়। সিগারেট পোড়ে, আর সেই ধোঁয়ায় মিশে যায় তাদের অপ্রাপ্তিগুলো।
জীবন তার আপন গতিতে চলে। এর মাঝে একদিন সকালে নীলাঞ্জনা বাথরুমে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল। মোস্তাফিজ সাহেবের চিৎকারে কাজের লোকেরা ছুটে এল। আহিয়ান তখন অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। সে সব রাগ ভুলে নীলাঞ্জনাকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়িতে ছুটল।
হাসপাতালে ডাক্তার যখন বেরিয়ে এলেন, তার মুখে একটা মৃদু হাসি। "কংগ্রাচুলেশনস মিস্টার আহিয়ান। আপনার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট। তবে তার শরীরে প্রচুর স্ট্রেস। এই অবস্থায় তাকে খুব সাবধানে রাখতে হবে।"
আহিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল। বাবা হতে যাচ্ছে সে! তার আর নীলাঞ্জনার একটি অংশ এই পৃথিবীতে আসছে। মুহূর্তের জন্য তার সব রাগ জল হয়ে গেল। সে কেবিনে ঢুকে দেখল নীলাঞ্জনা চোখ খুলে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
আহিয়ান তার শিয়রে গিয়ে বসল। খুব নিচু স্বরে ডাকল, "নীলা..."
নীলাঞ্জনা তাকাল না। তার চোখ দিয়ে শুধু এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল বালিশে। সে বলল, "এই সন্তানকে আপনি স্বীকার করবেন তো আহিয়ান সাহেব? নাকি এর পিতৃপরিচয় নিয়েও ছবি খুঁজবেন?"
আহিয়ানের বুকটা চিরে গেল। সে নীলাঞ্জনার হাতটা ধরতে চাইল, কিন্তু নীলাঞ্জনা হাতটা সরিয়ে নিল। "ভালোবাসা যখন মরে যায়, তখন দায়বদ্ধতা দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। আপনি এখন আসতে পারেন।"
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর বাড়ির আবহাওয়াটা একদম বদলে গেল। আহিয়ান এখন আর রাত করে বাড়ি ফেরে না। অফিস থেকে ফেরার পথে প্রতিদিন সে নীলাঞ্জনার জন্য ফল, ফুল কিংবা পছন্দের কোনো বই নিয়ে আসে। কিন্তু নীলাঞ্জনা সেই আগের মতো নেই। সে যেন এক জ্যান্ত পাথর। আহিয়ান যা আনে, সে তা টেবিলের এক কোণে রেখে দেয়, স্পর্শও করে না।
এক রাতে আহিয়ান আর থাকতে না পেরে নীলাঞ্জনার ঘরে ঢুকল। নীলাঞ্জনা তখন বিছানায় বসে আধো-অন্ধকারে ডায়েরি লিখছিল। আহিয়ানকে দেখে সে ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।
"নীলা, ডাক্তার বলেছে তোমার পুষ্টিকর খাবার খাওয়া খুব দরকার। তুমি আজকেও ডিনার ঠিকমতো করোনি," আহিয়ান খুব নরম গলায় বলল।
নীলাঞ্জনা জানালার ওপারে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার আর আমার সন্তানের জন্য আপনি যা করছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু দয়া করে কথা বলে আমাদের এই দূরত্বটুকু নষ্ট করবেন না। আপনি বলেছিলেন আমি আপনার কাছে 'অচেনা মেহমান'। মেহমানদের সাথে এত কথা বলতে হয় না।"
আহিয়ান দপ করে মেঝেতে বসে পড়ল নীলাঞ্জনার পায়ের কাছে। "নীলা, আমি জানি আমি অপরাধ করেছি। রাগের মাথায় আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে একটা সুযোগ দাও, আমি সব ঠিক করে দেব।"
নীলাঞ্জনা এবার তার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো রাগ নেই, আছে এক গভীর শূন্যতা। সে বলল, "আহিয়ান সাহেব, কাঁচ ভাঙলে জোড়া দেওয়া যায়, কিন্তু সেখানে দাগ থেকে যায়। আপনি আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। যে ভালোবাসায় সম্মান নেই, সেই ভালোবাসা আমি চাই না।"
আহিয়ানের মনে একটা খটকা ছিল শুরু থেকেই। ছবিগুলো এল কোত্থেকে? সে তার এক বন্ধুকে দিয়ে ছবিগুলো ল্যাবে টেস্ট করালো। রিপোর্ট যা এল, তা দেখে আহিয়ানের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। ছবিগুলো 'সুপার ইমপোজ' করা। অর্থাৎ নীলাঞ্জনার ধড় ঠিক রেখে পাশের ছেলেটিকে এডিট করে বসানো হয়েছে। আর এই কাজটির পেছনে যে আইপি অ্যাড্রেস পাওয়া গেল, তা ছিল শায়লার ল্যাপটপের।
আহিয়ান সেদিন বিকেলেই শায়লাকে ফোন করে তার বাসায় ডাকল। রেহানা বেগমও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আহিয়ান ল্যাপটপের স্ক্রিনটা তাদের দিকে ঘুরিয়ে ধরল।
"এই দেখো তোমাদের আভিজাত্যের নমুনা!" আহিয়ানের গলার স্বর কাঁপছিল ঘেন্নায়। "শায়লা, তুমি একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে চেয়েছিলে শুধু নিজের স্বার্থে? আর মা, তুমি? তুমি এই নোংরামিতে ওকে প্রশ্রয় দিলে?"
শায়লা আমতা আমতা করতে লাগল, কিন্তু আহিয়ান তাকে কথা বলতে দিল না। "এক্ষুণি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও শায়লা। আর কোনোদিন যদি তোমাকে আমার আশেপাশে দেখি, আমি পুলিশের কাছে এই এভিডেন্স জমা দেব।"
শায়লা অপমানিত হয়ে বেরিয়ে গেল। রেহানা বেগম তখন ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আভিজাত্যের মোহে তিনি হীরের বদলে পাথর বেছে নিয়েছিলেন।
আহিয়ান হন্তদন্ত হয়ে নীলাঞ্জনার ঘরে গেল। সে গিয়ে নীলাঞ্জনার হাত দুটো জড়িয়ে ধরল। "নীলা, আমাকে ক্ষমা করো। আমি প্রমাণ পেয়েছি, ওই ছবিগুলো সব মিথ্যে। শায়লা এগুলো করেছে। আমি কত বড় নির্বোধ যে তোমার মতো পবিত্র মেয়েকে সন্দেহ করেছি!"
নীলাঞ্জনা হাতটা ছাড়িয়ে নিল না, তবে তার মুখে কোনো স্বস্তির রেখাও দেখা গেল না। সে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আপনি আজ প্রমাণ পেয়েছেন বলে ক্ষমা চাইছেন। কিন্তু কাল যদি আবার কেউ নতুন কোনো প্রমাণ আনে, আপনি কি আবার আমাকে সন্দেহ করবেন? আমার প্রতি কি আপনার নিজের কোনো বিশ্বাস নেই?"
আহিয়ান উত্তর দিতে পারল না। সে বুঝতে পারল, প্রমাণ দিয়ে সংসার বাঁচে না, বিশ্বাস দিয়ে বাঁচে। সে নীলাঞ্জনার কোলজুড়ে মাথা রাখল এবং প্রথমবারের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। "আমাকে ত্যাগ করো না নীলা। আমাদের সন্তানের কসম, আমি আর কোনোদিন তোমাকে কাঁদতে দেব না।"
নীলাঞ্জনা এবার ধীরে ধীরে আহিয়ানের চুলে হাত রাখল। অনেকদিন পর তার হাতের ছোঁয়ায় আহিয়ান অনুভব করল জীবনের স্পন্দন।
কয়েক মাস পর। নীলাঞ্জনার গর্ভাবস্থার ষষ্ঠ মাস চলছে। আহিয়ান সিদ্ধান্ত নিল সে নীলাঞ্জনাকে নিয়ে তাদের সেই গ্রামে যাবে কয়েকদিনের জন্য। শহরের এই দূষিত বাতাস আর তিক্ত স্মৃতি থেকে দূরে থাকাটা তাদের দুজনের জন্যই জরুরি।
গ্রামের সেই পুরনো বাড়ি। অপরাজিতা ফুলগুলো এখন আরও বেশি ফুটেছে। বর্ষা নামার ঠিক আগের সময়টা। তারা দুজনে সেই নদীর ঘাটে গিয়ে বসল যেখানে তাদের প্রথম আলাপ হয়েছিল।
"নীলা, মনে আছে? এই ঘাটে বসে তুমি বলেছিলে মরুভূমিতেও ওয়েসিস থাকে?" আহিয়ান নীলাঞ্জনার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল।
নীলাঞ্জনা একটু হাসল। এই হাসিটা অনেকদিন পর আহিয়ান দেখল। "হ্যাঁ মনে আছে। কিন্তু ওয়েসিস পেতে হলে মরুভূমি পাড়ি দিতে হয়। আমরাও কি পাড়ি দিতে পেরেছি?"
আহিয়ান তার পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল। ভেতরে সেই নীল রঙের একগুচ্ছ কাঁচের চুড়ি, যা সে প্রথমবার কিনে দিয়েছিল। "আমি জানি না আমরা কতটা পাড়ি দিয়েছি, কিন্তু আমি জানি আমাদের গন্তব্য এক। আমি আবার নতুন করে আমাদের গল্পটা শুরু করতে চাই। একদম প্রথম থেকে।"
সে একে একে চুড়িগুলো নীলাঞ্জনার হাতে পরিয়ে দিতে লাগল। চুড়ির টুংটাং শব্দে নদীর বাতাস যেন মুখরিত হয়ে উঠল। নীলাঞ্জনা এবার আহিয়ানের কাঁধে মাথা রাখল। পেটের ভেতর অনাগত সন্তানটি নড়ে উঠল, যেন সেও তার বাবা-মায়ের এই পুনর্মিলনে সায় দিচ্ছে।
মফস্বলের সেই পুরনো বাড়িটা এখন যেন এক শান্তির নীড়। শহরের এসির শব্দ নেই, নেই যান্ত্রিক কোলাহল। আছে শুধু পুবালি বাতাস আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। আষাঢ়ের প্রথম দিনেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। জানালার ধারে বসে নীলাঞ্জনা বৃষ্টির ঝাপটা দেখছিল। গর্ভাবস্থার কারণে তার শরীরে এখন এক অদ্ভুত লাবণ্য—চোখ দুটোতে গভীর তৃপ্তি।
আহিয়ান অফিস থেকে ছুটি নিয়ে পুরো সময়টা নীলাঞ্জনাকে দিচ্ছে। সে ল্যাপটপ নিয়ে বারান্দায় বসে কাজ করছিল, কিন্তু তার নজর বারবার নীলাঞ্জনার দিকে চলে যাচ্ছিল। নীলাঞ্জনা যখন তার স্ফীত উদরে হাত রেখে বিড়বিড় করে অনাগত সন্তানের সাথে কথা বলে, আহিয়ানের মনে হয় পৃথিবীর সব স্থাপত্যকলার চেয়ে এই দৃশ্যটি বেশি সুন্দর।
"নীলা, বাইরে খুব হাওয়া দিচ্ছে, ভেতরে এসো," আহিয়ান চাদরটা হাতে নিয়ে ওর কাছে গেল।
নীলাঞ্জনা হাসল। "এই বৃষ্টিতে না ভিজলে সন্তানের মন বড় হবে না আহিয়ান সাহেব। ও শুনছে, দেখুন ও নড়াচড়া করছে।"
আহিয়ান থমকে দাঁড়াল। সে হাঁটু গেড়ে নীলাঞ্জনার সামনে বসল। খুব সাবধানে, পরম আদরে সে তার হাতটা নীলাঞ্জনার পেটের ওপর রাখল। মুহূর্তের মধ্যে সে এক মৃদু স্পন্দন অনুভব করল। আহিয়ানের চোখে জল চলে এল।
"ও আমাকে চিনেছে নীলা! ও জানে ওর বাবা ওর জন্য কত অস্থির হয়ে আছে।" আহিয়ান নীলাঞ্জনার হাতে একটা চুমু খেল। সেই স্পর্শে কোনো লালসা ছিল না, ছিল এক পবিত্র অঙ্গীকার।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি একটু কমলে আহিয়ান বাগান থেকে কয়েকটা তাজা কদম ফুল তুলে নিয়ে এল। নীলাঞ্জনা তখন বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। আহিয়ান ফুলগুলো ওর বালিশের পাশে ছড়িয়ে দিল।
"আজ থেকে আমাদের নিয়ম হবে প্রতিদিন ভোরে আর সন্ধ্যায় আমি তোমাকে ফুল দেব," আহিয়ান ওর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল।
নীলাঞ্জনা ফুলটা হাতে নিয়ে ঘ্রাণ নিল। "আপনি কি শহরের সেই ব্যস্ত স্থপতি আহিয়ান চৌধুরী? যে শুধু টাকা আর নকশা বুঝত?"
"না নীলা," আহিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি এখন এক ক্লান্ত পথিক, যে তার বাড়ির ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। তোমাকে আর এই অনাগত প্রাণটাকে ঘিরেই আমার নতুন পৃথিবী। বিশ্বাস করো, ঢাকার সেই আলিশান ফ্ল্যাট আমার কাছে এখন জেলখানা মনে হয়।"
নীলাঞ্জনা ওর হাতটা শক্ত করে ধরল। "আপনি শায়লাকে ক্ষমা করেছেন?"
আহিয়ান একটু থমকাল। "ক্ষমা করাটা বড় কথা নয় নীলা, ওর সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ। ঘৃণা করার জন্যও তো মনে জায়গা লাগে, আমার মনে এখন শুধুই তুমি।"
রাত যখন গভীর হলো, বৃষ্টি থেমে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। ঝকঝকে এক ফালি চাঁদ উঠল আকাশে। মোস্তাফিজ সাহেব ঘুমিয়ে পড়েছেন। আহিয়ান নীলাঞ্জনাকে নিয়ে খুব সাবধানে পেছনের দিঘির ঘাটে গেল।
চাঁদের আলো যখন স্থির পানির ওপর পড়ছে, মনে হচ্ছে যেন হাজার হাজার হীরে চিকচিক করছে। আহিয়ান নীলাঞ্জনাকে নিজের গায়ের সাথে জড়িয়ে ধরে বসাল। শীত শীতল হাওয়ায় নীলাঞ্জনা একটু শিউরে উঠল।
"নীলা, একটা কথা বলবে?" "বলুন।" "আমাদের মেয়ে হলে নাম কী রাখব?"
নীলাঞ্জনা একটু ভেবে বলল, "বৃষ্টি। আমাদের প্রথম দেখা বৃষ্টির দিনে, আমাদের মিলনের সাক্ষী এই বৃষ্টি। তাই ওর নাম হোক 'বৃষ্টিরানি'।"
আহিয়ান হাসল। "আর যদি ছেলে হয়?" "তাহলে তার নাম হবে 'মেঘ'।"
আহিয়ান নীলাঞ্জনার কপালে একটা দীর্ঘ গভীর চুমু খেল। তার হাত ধীরে ধীরে নীলাঞ্জনার কাঁধ বেয়ে নিচে নেমে এল। গর্ভাবস্থার এই পর্যায়ে শারীরিক মিলনের চেয়েও মানসিক নৈকট্য তাদের বেশি ব্যাকুল করে তুলছিল। তারা শুধু একে অপরের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে আর চাঁদের আলো গায়ে মেখে সারা রাত কাটিয়ে দিতে চাইল।
ভোরবেলা যখন মফস্বলে পাখির ডাক শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই আহিয়ানের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার বাবার নাম। আহিয়ানের বুকটা ধক করে উঠল। আমজাদ সাহেব সাধারণত তাকে ফোন করেন না।
"হ্যালো বাবা?" "আহিয়ান, তোর মায়ের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। উনি আইসিইউতে। বারবার তোর নাম ধরে ডাকছেন। তুই কি একবার আসবি?"
আহিয়ান ফোনের ওপাশে বাবার কান্নার শব্দ শুনতে পেল। সে নীলাঞ্জনার দিকে তাকাল। নীলাঞ্জনা তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার মুখে এক শান্ত হাসি। আহিয়ান সংকটে পড়ে গেল। একদিকে তার মা, যিনি তাকে জন্ম দিয়েছেন কিন্তু নীলাঞ্জনাকে কষ্ট দিয়েছেন; অন্যদিকে তার স্ত্রী এবং অনাগত সন্তান, যারা তার বর্তমান পৃথিবী।
নীলাঞ্জনা ঘুম ভেঙে চোখ মেলল। সে আহিয়ানের মুখ দেখেই বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে। সে উঠে বসে আহিয়ানের হাত ধরল। "কী হয়েছে আহিয়ান সাহেব?"
আহিয়ান সবটা খুলে বলল। সে ভেবেছিল নীলাঞ্জনা হয়তো যেতে বাধা দেবে বা চুপ থাকবে। কিন্তু নীলাঞ্জনা তাকে অবাক করে দিয়ে বলল, "চলুন আমরা যাই। মা অসুস্থ, এই সময় জেদ করতে নেই। আমি আপনার সাথে যাব।"
আহিয়ান বিস্মিত হয়ে বলল, "তোমার এই শরীর নিয়ে এখন ঢাকা জার্নি করা কি ঠিক হবে?"
নীলাঞ্জনা দৃঢ় স্বরে বলল, "আমার সন্তানের দাদী অসুস্থ, আর আমি ঘরে বসে থাকব? মা হয়তো ভুল করেছিলেন, কিন্তু উনি আপনার মা। চলুন আহিয়ান সাহেব, আমরা আমাদের ভালোবাসা দিয়ে ওনার ঘৃণা মুছে দেব।"
আহিয়ান নীলাঞ্জনাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। সে বুঝতে পারল, সে সত্যিই এক মহীয়সী নারীকে নিজের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছে।
৫ লক্ষ শব্দের এই মহাকাব্যিক উপন্যাসের অষ্টম খণ্ডটি হবে মানব হৃদয়ের জয়গানের গল্প। ঘৃণা কীভাবে ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং একটি পরিবারের ভাঙা টুকরোগুলো কীভাবে আবার জুড়ে যায়, সেই আবেগঘন অধ্যায়ে আমরা এখন প্রবেশ করছি।
ঢাকার সেই অভিজাত হাসপাতালের আইসিইউ-এর সামনে আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা যখন পৌঁছাল, তখন চারদিকে এক নিস্তব্ধ হাহাকার। করিডোরে লাল কার্পেটের ওপর আমজাদ সাহেব মাথা নিচু করে বসে আছেন। তার মতো একজন শক্ত হৃদয়ের মানুষকে এতটা ভেঙে পড়তে আহিয়ান আগে কখনো দেখেনি।
আহিয়ানকে দেখেই আমজাদ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টি যখন নীলাঞ্জনার ওপর পড়ল, তিনি কিছুটা লজ্জিত হলেন। যে মেয়েটিকে তারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বের করে দিয়েছিলেন, সেই মেয়েটিই আজ এই শরীরে তাকে দেখতে ছুটে এসেছে।
"কেমন আছেন মা?" নীলাঞ্জনা খুব নিচু স্বরে আমজাদ সাহেবের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
আমজাদ সাহেব কোনো কথা বলতে পারলেন না, শুধু তার হাতটা নীলাঞ্জনার মাথায় রাখলেন। এক বিন্দু অশ্রু তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। এটি ছিল নীরব ক্ষমা চাওয়ার এক দৃশ্য।
ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন, "পেশেন্ট সেন্স ফিরে পেয়েছেন। উনি বারবার 'আহি' আর 'নীলা' বলে ডাকছেন। আপনারা দুইজন ভেতরে যেতে পারেন, তবে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য।"
আইসিইউ-এর ভেতরে বিচিত্র সব যন্ত্রের শব্দ। রেহানা বেগম অক্সিজেনের মাস্ক পরে শুয়ে আছেন। তার ফর্সা চেহারাটা এখন ফ্যাকাশে কাগজের মতো। আহিয়ান ভেতরে ঢুকে মায়ের হাতটা ধরল।
রেহানা বেগম চোখ মেললেন। আহিয়ানকে দেখে তার চোখে এক ধরণের স্বস্তি এল। তারপর তার দৃষ্টি স্থির হলো আহিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীলাঞ্জনার ওপর। নীলাঞ্জনা ধীর পায়ে বিছানার পাশে গিয়ে বসল। সে কোনো অভিযোগ করল না, কোনো তিক্ততা দেখাল না। বরং পরম মমতায় রেহানা বেগমের কপালে হাত রাখল।
"মা, আমি এসেছি। আপনার কিচ্ছু হবে না," নীলাঞ্জনা শান্ত গলায় বলল।
রেহানা বেগম কাঁপা কাঁপা হাতে নীলাঞ্জনার হাতটা ধরলেন। তার চোখের কোণ দিয়ে জল নামছে। তিনি অক্সিজেন মাস্কটা একটু সরিয়ে কোনোমতে উচ্চারণ করলেন, "ক্ষ... মা... করিস মা। আমি চিনতে ভুল করেছিলাম।"
নীলাঞ্জনা ঝটপট তার মুখে আঙুল দিয়ে বলল, "এসব কথা বলবেন না মা। আপনি সুস্থ হয়ে বাসায় চলুন, আপনার নাতনি বা নাতি আপনার কোলে শোয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।"
আহিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিল। তার মনে হলো, কোনো স্থাপত্যের নকশা নয়, বরং মানুষের ক্ষমা আর মমতা দিয়ে গড়া এই সম্পর্কগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি।
পরের এক মাস ছিল এক বিশাল পরিবর্তনের গল্প। রেহানা বেগম সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেন। কিন্তু এবার তিনি আর সেই উদ্ধত শাশুড়ি নন। তিনি এখন নীলাঞ্জনার ছায়াসঙ্গী। নীলাঞ্জনা কী খাবে, কখন ওষুধ খাবে—সব তিনি নিজে তদারকি করেন।
শায়লা কয়েকবার ফোন করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমজাদ সাহেব কড়া নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন যেন সে আর কোনোদিন এই বাড়ির ত্রিসীমানায় না আসে। শায়লার অধ্যায়টি চিরতরে মুছে গেল।
আহিয়ান এখন যেন এক নতুন জীবন পেয়েছে। অফিস থেকে ফিরে সে আর ল্যাপটপ নিয়ে বসে না। সে নীলাঞ্জনার পাশে বসে তার ডায়েরির নতুন পাতাগুলো পড়ে শোনায়।
এক রাতে আহিয়ান নীলাঞ্জনার চুলে তেল দিয়ে দিচ্ছিল। নীলাঞ্জনা আয়নায় আহিয়ানের প্রতিচ্ছবি দেখে বলল, "জানে আহিয়ান সাহেব, আগে আমার মনে হতো আমি এই বাড়ির বাইরের কেউ। কিন্তু এখন মনে হয়, এই বাড়িটা আসলে আমাদের ভালোবাসার প্রদীপ দিয়ে জ্বালানো।"
আহিয়ান চিরুনিটা রেখে নীলাঞ্জনাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। "তোমার এই ক্ষমা করার ক্ষমতা না থাকলে নীলা, আমি হয়তো কোনোদিন আমার মা-কে ফিরে পেতাম না। তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও, তুমি এই পরিবারের আত্মা।"
৯ মাস ১০ দিন। রাত তখন তিনটা। পুরো ঢাকা শহর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ নীলাঞ্জনার চিৎকারে আহিয়ানের ঘুম ভেঙে গেল।
"আহিয়ান সাহেব! খুব ব্যথা হচ্ছে... আমি আর সহ্য করতে পারছি না!" নীলাঞ্জনার কপালে ঘাম জমেছে, সে ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।
আহিয়ান মুহূর্তের মধ্যে সবাইকে জাগিয়ে তুলল। আমজাদ সাহেব আর রেহানা বেগমও তৈরি হয়ে নিলেন। গাড়িতে নীলাঞ্জনার মাথা আহিয়ানের কোলে। আহিয়ান তার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
"ভয় পেয়ো না নীলা, আমি আছি। আমাদের 'বৃষ্টিরানি' বা 'মেঘ' আসতে চলেছে।" আহিয়ানের নিজের হাতও কাঁপছিল, কিন্তু সে নীলাঞ্জনাকে ভরসা দেওয়ার চেষ্টা করছিল।
হাসপাতালে নেওয়ার সাথে সাথেই নীলাঞ্জনাবে লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। আহিয়ান করিডোরে পায়চারি করছে। প্রতিটা সেকেন্ড যেন একেকটা শতাব্দীর মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে। সে দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে প্রার্থনা করতে লাগল। যে ঈশ্বর তাকে নীলাঞ্জনাকে দিয়েছেন, তিনি যেন আজ কোনো বিপদ না করেন।
ভোরবেলা, যখন পুব আকাশে হালকা আলোর আভা ফুটেছে, ঠিক তখনই লেবার রুম থেকে এক নবজাতকের কান্নার শব্দ ভেসে এল।
নার্স বেরিয়ে এলেন হাস্যোজ্জ্বল মুখে। "অভিনন্দন মিস্টার আহিয়ান! ফুটফুটে এক রাজকন্যা হয়েছে আপনার।"
আহিয়ান সেখানেই মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখের জল বাঁধ মানল না। সে বাবা হয়েছে। তার আর নীলাঞ্জনার ভালোবাসার এক জীবন্ত স্মারক এই পৃথিবীতে পা রেখেছে। সে ভেতরে গিয়ে দেখল নীলাঞ্জনা অত্যন্ত ক্লান্ত কিন্তু তার মুখে এক স্বর্গীয় শান্তি। তার পাশে ছোট্ট এক তোয়ালে জড়ানো পুতুল।
আহিয়ান নীলাঞ্জনার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। "ধন্যবাদ নীলা, আমাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য।"
নীলাঞ্জনা ক্ষীণ স্বরে হাসল। "দেখুন আহিয়ান সাহেব, আমাদের 'বৃষ্টি' এসেছে।"
৫ লক্ষ শব্দের এই মহাকাব্যিক উপন্যাসের নবম খণ্ডে আমরা প্রবেশ করছি। এখন গল্পের প্রতিটি অধ্যায় হবে অত্যন্ত ধীরগতির এবং ডিটেইলড। একটি ছোট্ট প্রাণের আগমনে একটি পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং দম্পতি হিসেবে আহিয়ান ও নীলাঞ্জনার সম্পর্কের নতুন গভীরতা এখানে ফুটে উঠবে।
হাসপাতাল থেকে নীলাঞ্জনা যখন বাড়ি ফিরল, তখন চৌধুরী ম্যানশন যেন এক নতুন উৎসবে মেতে উঠল। যে ড্রয়িংরুমে একসময় শুধু গাম্ভীর্য আর আভিজাত্যের লড়াই চলত, সেখানে এখন রেশমি কাপড়ের ঝিলিক আর জনসন পাউডারের মিষ্টি ঘ্রাণ। ছোট্ট 'বৃষ্টি'—যার গায়ের রঙ নীলাঞ্জনার মতো উজ্জ্বল আর চোখ দুটো আহিয়ানের মতো গভীর।
রেহানা বেগম নিজের হাতে ঘর সাজিয়েছেন। তিনি এখন আর সেই কড়া শাশুড়ি নন, বরং এক আদুরে দাদী। নীলাঞ্জনা ঘরে ঢুকতেই তিনি এগিয়ে এলেন। "বউমা, তুমি আগে বিশ্রাম নাও। ওকে আমার কাছে দাও।"
নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে দেখল, যে রেহানা বেগম তাকে একসময় 'গ্রাম্য মেয়ে' বলে তাচ্ছিল্য করতেন, তিনি আজ পরম মমতায় বৃষ্টির তোয়ালে পাল্টে দিচ্ছেন। আহিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছিল। সে নীলাঞ্জনার কানে ফিসফিস করে বলল, "দেখেছ নীলা? আমাদের বৃষ্টিরানি আসার আগেই সব মেঘ কাটিয়ে দিয়েছে।"
নীলাঞ্জনা হাসল, তবে তার চোখে আনন্দের জল। সে বুঝল, মাতৃত্ব শুধু একটি সন্তানের জন্ম দেয় না, এটি একটি পুরো পরিবারকে নতুন করে জন্ম দেয়।
সন্তান আসার পর আহিয়ান আর নীলাঞ্জনার ব্যক্তিগত জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন এল। এখন আর সেই নির্ভেজাল রোমান্টিক ডিনার বা দীর্ঘ কথোপকথনের সময় পাওয়া যায় না। রাত দুটো বাজলেই বৃষ্টির কান্নায় পুরো ঘর মাথায় ওঠে।
এক রাতে আহিয়ান খুব ক্লান্ত হয়ে অফিস থেকে ফিরেছিল। সারা রাত বৃষ্টির পেট ব্যথায় সে ঘুমাতে পারেনি। তিনটার দিকে যখন বৃষ্টি শান্ত হলো, তখন আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা বিছানায় পিঠ ঠেকানোর সুযোগ পেল।
"আহিয়ান সাহেব, ঘুমিয়ে পড়লেন?" নীলাঞ্জনা আলতো করে ডাকল। আহিয়ান চোখ না খুলেই ওকে জড়িয়ে ধরল। "না নীলা, বৃষ্টির বাবা কি ঘুমানোর অধিকার রাখে?"
নীলাঞ্জনা ওর বুকের ওপর মাথা রেখে বলল, "আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে না? অফিস সামলানো, আবার রাতে ওর জন্য জেগে থাকা..." আহিয়ান এবার চোখ খুলল। নীল ল্যাম্পপোস্টের আলোয় নীলাঞ্জনার মুখটা আজ খুব মায়াবী লাগছে। সে ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, "এই কষ্টটা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর কষ্ট নীলা। জানো, অফিসের মিছিলে আমি যখন খুব টেনশন করি, তখন শুধু ওর এই নরম হাতের স্পর্শটার কথা ভাবি। সব ক্লান্তি ধুয়ে যায়।"
নীলাঞ্জনা একটু চুপ করে থেকে বলল, "আমিও তাই। আপনি যখন ওকে কোলে নিয়ে দোল দেন, তখন আমার মনে হয় আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী নারী। তবে..." "তবে কী?" "আমাদের সেই প্রেমটা কি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে? আমরা তো এখন শুধু বাবা আর মা।"
আহিয়ান এবার পুরোপুরি উঠে বসল। সে নীলাঞ্জনাকে নিজের কোলের কাছে টেনে নিল। "প্রেম হারাবে কেন পাগল? প্রেম এখন আরও গভীর হয়েছে। আগে আমরা ছিলাম দুজন আলাদা মানুষ, এখন আমরা এক হয়ে গেছি আমাদের বৃষ্টির মাঝে। তবে হ্যাঁ, তোমার জন্য আমার সেই ব্যাকুলতা একটুও কমেনি।"
সে নীলাঞ্জনার ঠোঁটে আঙুল বুলিয়ে দিল। তাদের মাঝখানের সেই চিরচেনা বিদ্যুচ্চমক আবার ফিরে এল। বৃষ্টির দোলনাটা পাশে টিমটিম করে জ্বলছে, আর তার পাশেই দুজন মানুষ আবার নতুন করে প্রেমে পড়ছে।
কয়েক মাস পর। নীলাঞ্জনা আবার তার সেই নীল ডায়েরিটা বের করল। তবে এবার আর কোনো কষ্টের কথা নয়। সে লিখতে শুরু করল:
“আজ বৃষ্টি প্রথম 'বাবা' বলে ডেকেছে। আহিয়ান সাহেব খুশিতে সারা বাড়ি মিষ্টি খাইয়েছেন। আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম সেই বৃষ্টির দিনের কথা, যেদিন আমি এই মানুষটাকে প্রথম দেখেছিলাম। জীবন কত অদ্ভুত! যে মানুষটা আমার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা ছিল, সে আজ আমার পুরো পৃথিবী। আমি এখন আর শুধু নীলাঞ্জনা নই, আমি বৃষ্টির মা এবং আহিয়ানের ঘরনী।”
সেদিন বিকেলে আহিয়ান বাড়ি ফিরল একগাদা গিফট নিয়ে। শুধু বৃষ্টির জন্য নয়, নীলাঞ্জনার জন্যও। সে একটা চমৎকার ল্যাপটপ আর কিছু স্থাপত্যের বই নিয়ে এসেছে।
"এসব কী?" নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। "নীলা, আমি চাই তুমি তোমার পড়াশোনা আর তোমার সেই ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার আবার শুরু করো। আমি চাই না তুমি শুধু ঘরের কাজ আর বাচ্চা সামলাতেই জীবন কাটিয়ে দাও। তুমি তো সেই মেয়ে, যে আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলে। এখন আমি তোমার স্বপ্নের সারথি হতে চাই।"
নীলাঞ্জনার দুচোখ ভিজে উঠল। "আপনি পারবেন আমাকে সাপোর্ট দিতে?" "কেন পারব না? কাল থেকেই আমি বৃষ্টির জন্য একজন আয়া ঠিক করে দিচ্ছি, আর মা তো আছেনই। তুমি তোমার সেই 'মফস্বলের স্কুল' গড়ার প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করো। আমি তোমার সেই স্কুলের ড্রয়িং করে দেব।"
এক বছর পর। মফস্বলের সেই গ্রামে এক বিশাল উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা তাদের জমানো টাকা আর আহিয়ানের কোম্পানির সিএসআর ফান্ড দিয়ে গড়ে তুলেছে 'নীলাঞ্জনা শিক্ষালয়'। এটি শুধু একটি স্কুল নয়, এটি গ্রামের অবহেলিত মেয়েদের জন্য একটি স্বপ্নের ঘর।
উদ্বোধনের দিন বৃষ্টির হাতে ফিতা কাটিয়ে স্কুলের যাত্রা শুরু হলো। মোস্তাফিজ সাহেব আজ খুব গর্বিত। তার মেয়ে আর জামাতা মিলে তার স্বপ্ন পূরণ করেছে।
বিকেলের দিকে আহিয়ান আর নীলাঞ্জনা সেই পুরনো দিঘির ঘাটে গিয়ে বসল। এখন আর কোনো গোপন ট্রাজেডি নেই, নেই কোনো ষড়যন্ত্র। "নীলা, ৫ লক্ষ শব্দেও কি আমাদের এই ভালোবাসার বর্ণনা শেষ হবে?" আহিয়ান নীলাঞ্জনার হাতটা মুঠোয় নিয়ে বলল।
নীলাঞ্জনা আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য ডুবছে, চারদিকে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। "ভালোবাসার কোনো শেষ নেই আহিয়ান সাহেব। এটি একটি চলমান নদী। আমরা হয়তো বুড়ো হয়ে যাব, কিন্তু আমাদের এই মায়ার বাঁধন বৃষ্টির মাধ্যমে বেঁচে থাকবে যুগের পর যুগ।"
আহিয়ান নীলাঞ্জনার কাঁধে মাথা রাখল। দূরে কোথাও শাঁখ বাজছে। মফস্বলের স্নিগ্ধ বাতাস তাদের আশীর্বাদ করে দিয়ে গেল।